পটুয়াখালী জেলা

পটুয়াখালী জেলা (বরিশাল বিভাগ)  আয়তন: ৩২২১.৩১ বর্গ কিমি। অবস্থান: ২১°৪৮´ থেকে ২২°৩৬´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯০°০৮´ থেকে ৯০°৪১´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। সীমানা: উত্তরে বরিশাল জেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ভোলা জেলা, পশ্চিমে বরগুনা জেলা। এ জেলা মেঘনা নদীর পললভূমি ও ছোট ছোট কয়েকটি চরাঞ্চল নিয়ে গঠিত।

জনসংখ্যা ১৫৩৫৮৫৪; পুরুষ ৭৫৩৪৪১, মহিলা ৭৮২৪১৩। মুসলিম ১৪২৮৬০১, হিন্দু ১০৫৪৯৬, বৌদ্ধ ১৩৫৫, খ্রিস্টান ৩৪৫ এবং অন্যান্য ৫৭।

জলাশয় আন্ধারমানিক, তেঁতুলিয়া, আগুনমুখা ও গলাচিপা, রাজগঞ্জ নদী; রাবনাবাদ চ্যানেল।

প্রশাসন সাবেক বাকেরগঞ্জ জেলার মহকুমা পটুয়াখালীকে জেলায় উন্নীত করা হয় ১৯৬৯ সালে। জেলার আটটি উপজেলার মধ্যে গলাচিপা উপজেলা সর্ববৃহৎ (৯২৪.৬৮ বর্গ কিমি) এবং সবচেয়ে ছোট উপজেলা দুমকি (৯২.৪১ বর্গ কিমি)।

জেলা
আয়তন (বর্গ কিমি) উপজেলা পৌরসভা ইউনিয়ন মৌজা গ্রাম জনসংখ্যা ঘনত্ব (প্রতি বর্গ কিমি) শিক্ষার হার (%)
শহর গ্রাম
৩২২১.৩১ ৭১ ৫৭১ ৮৭৮ ২০১৮৮২ ১৩৩৩৯৭২ ৪৭৭ ৫১.৬৫
জেলার অন্যান্য তথ্য
উপজেলা নাম আয়তন (বর্গ কিমি) পৌরসভা ইউনিয়ন মৌজা গ্রাম জনসংখ্যা ঘনত্ব (প্রতি বর্গ কিমি) শিক্ষার হার (%)
কলাপাড়া ৪৯১.৮৯ ১১ ৫৭ ২৩৯ ২৩৭৮৩১ ৪৮৪ ৫২.০
গলাচিপা ৯২৪.৬৮ ১২ ৯২ ১৩৩ ২৫৮৫১৫ ২৮০ ৪৫.৪
দশমিনা ৩৫১.৮৭ - ৫০ ৫১ ১২৩৩৮৮ ৩৫১ ৪৮.৭
দুমকি ৯২.৪১ - ২১ ২৪ ৭০৬৫৫ ৭৬৫ ৬৬.৪
পটুয়াখালী সদর ৩৬২.৪৬ ১২ ১০১ ১২৪ ৩১৬৪৬২ ৮৭৩ ৫৯.৫
বাউফল ৪৮৭.১০ ১৪ ১৩৪ ১৪০ ৩০৪২৮৪ ৬২৫ ৫৭.১
মির্জাগঞ্জ ১৬৭.১৮ - ৬৮ ৭৩ ১২১৭১৬ ৭২৮ ৫৯.৪
রাঙ্গাবালী ৩৪৩.৬৯ - ৪৮ ৯৪ ১০৩০০৩ ৩০০ ৩৯.৯

সূত্র আদমশুমারি রিপোর্ট ২০১১, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো।

PatuakhaliDistrict.jpg

মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ সালের ২৬ এপ্রিল পাকসেনারা পটুয়াখালী আক্রমণ করে। মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে মির্জাগঞ্জের দেউলি গ্রামে স্থাপিত মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বহুসংখ্যক তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মির্জাগঞ্জের সীমান্তবর্তী এলাকায় পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ে ৩২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং বহু পাকসেনা হতাহত হয়। ৮ মে গলাচিপার চিকনিকান্দি ও ডাকুয়া গ্রামে পাকসেনারা হামলা চালিয়ে ২৯ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করে এবং বহু ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। ২৫ মে বাউফলের কাবাই নদীতে আসা পাকসেনাদের একটি গানবোট মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পশ্চাদপসরণ করে। ৫ জুন মুক্তিযোদ্ধারা বাউফলের রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ করে কয়েকজন রাজাকারকে হত্যা করে। পাকসেনারা বাউফলের মদনপুরা ও ধুলিয়াতে ৩৫ ব্যক্তিকে হত্যা করে এবং বহু ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। ১৮ নভেম্বর গলাচিপার পানপট্টি গ্রামে পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ে ৩ জন পাকসেনা নিহত হয়। ৬ ডিসেম্বর পটুয়াখালী সদর পাকসেনা মুক্ত হয়। ৭ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা পটুয়াখালী সদরে প্রবেশ করে এবং কলাপাড়ার খেপুপাড়া আক্রমণ করেন। একই দিনে তাঁদের মির্জাগঞ্জ থানা দখল করার সময় কয়েকজন রাজাকার নিহত হয়। ৮ ডিসেম্বর বাউফল শত্রু মুক্ত হয়। উপজেলার ৩টি স্থানে (পটুয়াখালী শহরের পুরাতন জেলখানার অভ্যন্তরে এবং নতুন জেলখানার দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে ও তুলাতলিতে) গণকবর রয়েছে; ৪টি স্থানে (পুরাতন টাউন হলের সামনে, গলাচিপা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ প্রাঙ্গণে, চিকনিকান্দি হাইস্কুল মাঠ ও পানপট্টিতে) স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপিত হয়েছে।

শিক্ষার হার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড় হার ৫৪.১%; পুরুষ ৫৬.২%, মহিলা ৫২.০%। বিশ্ববিদ্যালয় ১, কলেজ ৫৮, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৩২৪, প্রাথমিক বিদ্যালয় ১১৪৩, কিন্ডার গার্টেন ৬, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ২, কারিগরি বিদ্যালয় ৫, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ১, ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট ১, স্যাটেলাইট বিদ্যালয় ১৪, কমিউনিটি বিদ্যালয় ৯, মাদ্রাসা ৩৬৭। উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (২০০১), পটুয়াখালী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ (১৯৫৭), লতিফ মিউনিসিপ্যাল সেমিনারী (১৯১৬), পটুয়াখালী সরকারী মহিলা কলেজ (১৯৬৮), দশমিনা আব্দুর রশিদ তালুকদার ডিগ্রি কলেজ (১৯৭৭), সরকারি মোজাহার উদ্দিন বিশ্বাস কলেজ (১৯৭৭), জনতা কলেজ (১৯৮৫), বাউফল ডিগ্রি কলেজ (১৯৬৬), সুবিদখালী ডিগ্রি কলেজ (১৯৭২), সুবিদখালী মহিলা কলেজ (২০০০), গলাচিপা ডিগ্রি কলেজ (১৯৭২), পাতাবুনিয়া আদর্শ কারিগরি কলেজ (১৯৯৬), বাউফল মাধ্যমিক বিদ্যালয় (১৮৮৫), সরকারি জুবিলী হাইস্কুল (১৮৮৭), শ্রীরামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় (১৯০০), বাউফল হাইস্কুল (১৯১৯), বীরপাশা মাধ্যমিক বিদ্যালয় (১৯২১), মুরাদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় (১৯২৮), কাছিপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় (১৯২৮), খেপুপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় (১৯২৮), সুবিদখালী পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় (১৯৩৪), চিকনিকান্দি মাধ্যমিক বিদ্যালয় (১৯৩০), পটুুয়াখালী সরকারি বালিকা বিদ্যালয় (১৯৪৬), দশমিনা মাধ্যমিক বিদ্যালয় (১৯৫৬), কাঁঠালতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৯২৪), ওয়াজেদাবাদ মোস্তাফাভীয়া ফাজিল মাদ্রাসা (১৯১৩), পাঙ্গাশিয়া নেছারিয়া আলীয়া মাদ্রাসা (১৯১৯), ওবায়দিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা (১৯৩০), লামনা ছালেহিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা (১৯৩৫), চৈতা নেছারিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা (১৯৪০), সুবিদখালী দারুসছুন্নাহ সিনিয়র মাদ্রাসা (১৯৬০), চর হোসনাবাদ সিনিয়র মাদ্রাসা (১৯৬৪), কলাপাড়া নেছারুদ্দিন সিনিয়র মাদ্রাসা (১৯৬৫), আদমপুর ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা (১৯৬৫), দশমিনা ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা (১৯৬৮)।

জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উৎস কৃষি ৫৭.০৫%, অকৃষি শ্রমিক ৫.৩৭%, শিল্প ১.০৩%, ব্যবসা ১৩.৭৯%, পরিবহণ ও যোগাযোগ ২.০৪%, নির্মাণ ২.১৩%, ধর্মীয় সেবা ০.২৬%, চাকরি ৯.২২%, রেন্ট অ্যান্ড রেমিটেন্স ০.৪০% এবং অন্যান্য ৮.৭১%।

পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকী দৈনিক: রূপান্তর, তেঁতুলিয়া, গণদাবী, সাথী; সাপ্তাহিক: পায়রা, পটুয়াখালী, অভিযাত্রী, পটুয়াখালী প্রশিকা; পাক্ষিক: মেঠো বার্তা; অবলুপ্ত সাপ্তাহিক: পল্লীসেবা (১৯৩৪), গ্রামবাংলা, খেলাফত, প্রতিনিধি, জনতা, অভিযাত্রী, তৃষা; পাক্ষিক: আন্ধারমানিক; অবলুপ্ত পাক্ষিক: স্বদেশ দর্পণ, পাক্ষিক সৈকত, প্রিয় কাগজ; অবলুপ্ত  মাসিক: চাবুক; সাময়িকী: পটুয়াখালী সমাচার, এক মুঠো সুরভি, অন্বেষা।

লোকসংস্কৃতি এ জেলায় যাত্রাগান, কবিগান, পুতুল নাচ, বানরনাচ, বয়াতী গান, পালাগান, শ্লোক ভাঙ্গানি বা হেয়ালী ধাঁধাঁ, রয়ানি ইত্যাদির প্রচলন রয়েছে। ঝাড়-ফুঁকের তন্ত্রমন্ত্র, নারীর মন জয় করার মন্ত্র বা তুকতাক ইত্যাদি লোকজ বিশ্বাস এ অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির বিশেষ স্থান দখল করে আছে। হাডুডু, লাটিম ঘোরানো, দাড়িয়াবাঁধা, ডুব-সাঁতার, মল্লযুদ্ধ, ডাংগুলী, কানামাছি, মার্বেল, ক্রিকেট, কুতকুত, চোর-পুলিশ, কুকপালানী, হাড়িভাঙ্গা এ জেলার উল্লেখযোগ্য স্থানীয় লোকক্রীড়া।

গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও দর্শনীয় স্থান কলাপাড়া উপজেলার দক্ষিণে বাংলাদেশের সমুদ্র সৈকত কেন্দ্রিক দ্বিতীয় পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা অবস্থিত। প্রায় ১৮ কিলোমিটার বিস্তৃত কুয়াকাটা থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়। কুয়াকাটা থেকে পশ্চিমে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কুয়াকাটা শুঁটকি পল্লী। এখান থেকে শুঁটকি মাছ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। এছাড়া পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য রয়েছে সি ফিস মিউজিয়াম, বুড়া গৌরাঙ্গ সামুদ্রিক চ্যানেল, কুয়াকাটার সীমা বৌদ্ধ মন্দির, বুদ্ধের ধ্যানমগ্ন মূর্তি, রাখাইন পল্লী, নারিকেল বীথি, ঝাউবন, ফাতরার চর (ম্যানগ্রোভ), গঙ্গামতির চর, রাসমেলা, লেম্বুর চর ইত্যাদি। গলাচিপা উপজেলার সোনার চর থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়। এখানে আরো আছে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের রানী কমলার রাজধানী কালারাজা এবং রাবনাবাদ ও রাঙ্গাবালি চ্যানেল। এছাড়াও বাউফল উপজেলায় রয়েছে  চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের রাজধানী (কচুয়ার বাকলা ও পরবর্তীকালে রাজনগর), শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের পৈত্রিক নিবাস কাজী বাড়ি (বিলবিলাস), কমলা রানীর দীঘি (কালাইয়া), ঘসেটি বেগমের কুঠিবাড়ি (তেঁতুলিয়া নদীর তীরে) ও কানাই বলাই দিঘি (কাছিপাড়া)। [ইফফাত জেরীন]

আরও দেখুন সংশ্লিষ্ট উপজেলা।

তথ্যসূত্র   আদমশুমারি রিপোর্ট ২০০১ ও ২০১১, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো; পটুয়াখালী জেলা সাংস্কৃতিক সমীক্ষা প্রতিবেদন ২০০৭; পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন উপজেলা সমূহের সাংস্কৃতি সমীক্ষা প্রতিবেদন ২০০৭।