ভূতত্ত্ব শিক্ষা

ভূতত্ত্ব শিক্ষা (Geology Education) বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে ভূতত্ত্ব শিক্ষা প্রদান করা হয়। বাংলাদেশের প্রাচীনতম ভূতত্ত্ব বিভাগটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত, যা ১৯৪৯ সালের ২৩ এপ্রিল অধ্যাপক এম. ওসমান গণি-কে বিভাগীয় প্রধান করে যাত্রা শুরু করে। ড. এম. ওসমান গণি, যিনি মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগেরও প্রধান ছিলেন, ১৫ এপ্রিল ১৯৫৬ পর্যন্ত ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে এর মধ্যে ১৯৫০ সালের ২২ জুলাই থেকে ১৯৫১ সালের ১৬ জুলাই পর্যন্ত সিডনি থেকে আসা একজন অস্ট্রেলীয়, জনাব সিডনি জেমস মেইন এই বিভাগের প্রধান ছিলেন।

১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই বছরের বিএসসি (পাস) কোর্সের মাধ্যমে ভূতত্ত্বের পাঠদান শুরু হয়। ১৯৫৭-৫৮ শিক্ষাবর্ষে প্রথমবার ছয়জন ছাত্র নিয়ে দুই বছরের এমএসসি কোর্স চালু করা হয়। আর বিএসসি (অনার্স) কোর্স শুরু হয় ১৯৬৭ সালের জুলাই মাস থেকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৫ সালে ‘ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা’ বিভাগ চালু করে এবং একই বছরের আগস্ট মাস থেকে প্রথম বর্ষ বিএসসি (অনার্স) ক্লাস শুরু হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৮৫ সালে ‘ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান’ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে। প্রথম দুই শিক্ষাবর্ষে বিভাগটি কেবল গৌণ (সাবসিডিয়ারি) কোর্স প্রদান করত এবং ১৯৮৭-৮৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞানে সম্মান (অনার্স) কোর্স চালু করা হয়।

বর্তমানে ভূতত্ত্ব বিভাগ থেকে বিএস (অনার্স), এমএস (মাস্টার্স), এমফিল এবং পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হয়। এছাড়া অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি গৌণ কোর্সও অফার করে। বিএস (অনার্স) হলো চার মেয়াদি সমন্বিত প্রোগ্রাম, যাতে প্রধান বিষয় হিসেবে তাত্ত্বিক, ব্যবহারিক, ফিল্ড ম্যাপিং, প্রজেক্ট এবং মৌখিক পরীক্ষার জন্য ১২৬ ক্রেডিট এবং গৌণ বিষয় হিসেবে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিতের জন্য ২০ ক্রেডিট অন্তর্ভুক্ত থাকে। এমএস ডিগ্রি হলো এক বছরের প্রোগ্রাম যা কেবল কোর্স ওয়ার্ক (গ্রুপ এ) অথবা কোর্স ওয়ার্কের পাশাপাশি গবেষণা (গ্রুপ বি) ভিত্তিক। এমএস পর্যায়ে বর্তমানে পাঁচটি প্রধান শাখা চালু রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের আগ্রহ অনুযায়ী গবেষণার ক্ষেত্র বেছে নিতে পারেন।

ভূতত্ত্ব বিভাগগুলোতে খনিজবিদ্যা (গরহবৎধষড়মু), শিলাতত্ত্ব (চবঃৎড়ষড়মু), জীবাশ্মবিজ্ঞান (চধষধবড়হঃড়ষড়মু), স্তরতত্ত্ব (ঝঃৎধঃরমৎধঢ়যু), পলিবিজ্ঞান (ঝবফরসবহঃড়ষড়মু), ভূ-গাঠনিকতত্ত্ব (ঝঃৎঁপঃঁৎধষ এবড়ষড়মু) ও ভূ-পদার্থবিদ্যার (এবড়ঢ়যুংরপং) মতো মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি ফলিত ভূতত্ত্বের বিভিন্ন শাখা পড়ানো হয়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: পেট্রোলিয়াম জিওলজি (খনিজ তেল ভূতত্ত্ব), জলভূতত্ত্ব (ঐুফৎড়মবড়ষড়মু), ভূ-রসায়ন (এবড়পযবসরংঃৎু), প্রকৌশল ভূতত্ত্ব (ঊহমরহববৎরহম এবড়ষড়মু), পরিবেশ ভূতত্ত্ব (ঊহারৎড়হসবহঃধষ এবড়ষড়মু), রিমোট সেন্সিং ও ফটোজিলজি ইত্যাদি। ভূতত্ত্ব একটি বহুমুখী বিষয়, এর ফলে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, পরিসংখ্যান, রসায়ন ও কম্পিউটিং বিষয়েও পড়াশোনা করতে হয়। ঢাকা, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোর নিজস্ব গবেষণা কার্যক্রম রয়েছে। গবেষণার উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে: চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের পাললিক ভূতত্ত্ব, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূ-কম্পন অনুসন্ধান, বঙ্গীয় অববাহিকার ভূ-গাঠনিক গবেষণা, ভূ-গর্ভস্থ পানির রসায়ন ও আর্সেনিক দূষণ, বাংলাদেশের গোন্ডওয়ানা কয়লা ও মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনির ভূতাত্ত্বিক গবেষণা ইত্যাদি।

তিনটি বিভাগেই পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে ‘জিওলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই সমিতির বার্ষিক প্রকাশনা হলো ‘বাংলাদেশ জার্নাল অব জিওলজি’। এই জার্নালে প্রকাশিত অধিকাংশ নিবন্ধই বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞানের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়। [মনজুর হাসান]