বাণিজ্যিক ভারসাম্য

বাণিজ্যিক ভারসাম্য  একটি নির্দিষ্ট সময়ে, সাধারণত এক বছরে একটি দেশের দৃশ্যমান রপ্তানি ও আমদানিসমূহের মূল্যের পার্থক্য। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের শুরুতে নির্বিচার আমদানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের মাধ্যমে আমদানির বিকল্প পন্থা উদ্ভাবন এবং অনুসরণের নীতি গ্রহণ করে। ১৯৭০-এর দশকে আমদানি ব্যয় নির্বাহ করার জন্য দেশে পর্যাপ্ত তহবিলের সংকট ছিল। কিন্তু কার্যত, কঠোর নিয়ন্ত্রণের বদলে সরকার ক্রমশ উদার বাণিজ্যনীতি গ্রহণ করে এবং দেশে বৈদেশিক সাহায্য প্রবাহ বৃদ্ধির ফলে ৮০-র দশকের শুরুতে আমদানির পরিমাণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৯৯০-এর দশকে বাস্তবায়িত আর্থিক খাত সংস্কার কর্মসূচির ফলে দেশের বাণিজ্য-নীতিতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয়। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গৃহীত সাময়িক ব্যবস্থাবলির মাধ্যমে দেশের রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালিত হতো। ফলে উচ্চতর রপ্তানি সম্ভাবনাময় উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি নিরুৎসাহিত ও বাধাগ্রস্ত হতো। আর্থিক খাত সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকার ১৯৯৩ সালে ২ বছর মেয়াদি রপ্তানি নীতিমালা ঘোষণা করে। এ রপ্তানি নীতিমালায় দেশের রপ্তানি ব্যবসায়কে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে রপ্তানিকারকদের জন্য বেশকিছু সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৭-২০০২ সময়ের জন্য একটি ৫ বছর মেয়াদি রপ্তানি নীতি ঘোষণা করে। এ নতুন নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ব বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দেশে রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প-কারখানা স্থাপন এবং সকল শিল্পের পশ্চাৎ-অন্বয়ী শিল্প স্থাপনে উৎসাহ প্রদান করা। উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রী বহির্বিশ্বে বহুল পরিমাণে রপ্তানির মাধ্যমে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার আন্তঃপ্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানির পার্থক্য তথা বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমিয়ে আনাই ছিল রপ্তানি নীতির লক্ষ্য। নতুন নীতিতে রপ্তানি উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কৌশলগত নীতি এবং পদ্ধতিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে ব্যাপক রপ্তানি উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ এবং নীতিমালা অনুসরণ করা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বাণিজ্যিক ভারসাম্যের চলমান ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারে নি। ১৯৭৫-৭৬ সালে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ঐ বছরের জিডিপির ৮.৫% যা হ্রাস-বৃদ্ধির মাধ্যমে ১৯৮১-৮২ সালে জিডিপির ১৪.১% এবং ১৯৯১-৯২ সালে ৬.৬%-এ দাঁড়ায়। বাণিজ্য ঘাটতি ১৯৯০-এর দশকব্যাপী মোটামুটি সহনশীল পর্যায়ে ছিল। ১৯৯৭-৯৮ সালে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল সে বছরের জিডিপির ৬.৯% এবং ১৯৯৯-২০০০ সালে তা হ্রাস পেয়ে ৫.৫%-এ দাঁড়ায়। ১৯৮৪-৮৫ অপেক্ষা ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে দ্রুত রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে বাণিজ্য ঘাটতির হার ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছর থেকে রপ্তানিমুখী শিল্পসমূহ তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া প্রাথমিক পণ্য থেকে তৈরি পণ্যে স্থানান্তর করে। এছাড়া প্রচলিত পণ্যের চেয়ে অপ্রচলিত পণ্য উৎপাদন এবং রপ্তানির প্রতিও তারা অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করে।

১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে মোট রপ্তানি মূল্যের মধ্যে প্রচলিত পণ্যের আয় ছিল ৯৭.২৭% যা ১৯৮২-৮৩ সালে ৬৮.৯৯% এবং ১৯৯৪-৯৫ সালে মাত্র ১২.১৭% নেমে আসে। অপরদিকে, মোট রপ্তানি মূল্যের মধ্যে ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে উৎপাদিত পণ্যের অংশ ছিল ৫৭.০৩%, যা ১৯৮২-৮৩ সালে ৬৪.৫৮% এবং ১৯৯৪-৯৫ সালে ৮৬.৯৮%-এ উন্নীত হয়। রপ্তানিযোগ্য তৈরি পোশাক শিল্পের দ্রুত উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির কারণেই রপ্তানি আয়ের মধ্যে উৎপাদিত পণ্যের অবদান উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। তবে রপ্তানি আয়ের সাথে দেশের আমদানি ব্যয়ও দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং আমদানি ব্যয়বৃদ্ধির হার রপ্তানি আয়বৃদ্ধি অপেক্ষা অধিক ছিল। ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয় ও আমদানি ব্যয়বৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ৪% ও ৮%, ১৯৮৪-৮৫ সালে ৬.৯% ও ১৯.৭% এবং ১৯৯৪-৯৫ সালে ছিল ১৩.৩% ও ২২.৬%। এ সময়ে দেশের আমদানির ক্ষেত্রে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন সূচিত হয়। প্রাথমিক দ্রব্যাদির আমদানি ব্যয় ১৯৮৪-৮৫ অর্থবছরে ৮৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অপেক্ষা হ্রাস পেয়ে ১৯৮৯-৯০-এ ৫৮৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে তা ছিল ৮৬৮ মিলিয়ন ডলার এবং ১৯৯৮-৯৯-এ ১,৪৪৮ মিলিয়ন ডলার।

অপরদিকে, প্রধান প্রধান মধ্যবর্তী দ্রব্যাদির আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৮৪-৮৫ অর্থবছরে ৪৩৩ মিলিয়ন ডলার থেকে ১৯৮৯-৯০ সালে ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার, ১৯৯৪-৯৫-এ ৯২৪.০০ মিলিয়ন ডলার এবং ১৯৯৮-৯৯-এ ১,১০৪ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়।

মূলধনি দ্রব্য আমদানির ব্যয়ও ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৮৪-৮৫ অর্থবছরে ৬৯১ মিলিয়ন, ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে ১,২৯৬ মিলিয়ন, ১৯৯৪-৯৫ বছরে ১,৬৮৮ মিলিয়ন এবং ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে ১,৬৬৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছিল। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও একইসঙ্গে রপ্তানি আয়ের বৃদ্ধি বাণিজ্য ভারসাম্যের ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে।

রপ্তানি আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারকগণকে নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেছে। এগুলির মধ্যে পরিশোধিত শুল্ক প্রত্যর্পণ সুবিধা, কর রেয়াত, শুল্কাধীন পণ্যাগার, আয়কর রেয়াত, অপেক্ষাকৃত কম সুদহারে রপ্তানিকারকদের ঋণদান, রপ্তানিকারকগণ কর্তৃক অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল পরিচালনা এবং এক্সপোর্ট ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এ সকল উৎসাহব্যঞ্জক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সত্ত্বেও প্রচলিত পণ্যের রপ্তানি আয় ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। পক্ষান্তরে, উৎপাদিত পণ্য খাতে রপ্তানি আয় ১৯৯০-এর দশকব্যাপী বৃদ্ধি পেয়েছে। মোট রপ্তানি আয়ের মধ্যে প্রচলিত পণ্যের আয়ের হার ১৯৯০-৯১ অর্থবছরের ২৫.৫১% থেকে হ্রাস পেয়ে ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে ১২.১৭%, ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে ৮.৪১% এবং ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে ৭.৫৫%-এ হ্রাস পায়। অপরদিকে উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি আয় হার ১৯৯০-৯১ সালে ৮২.১৮% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৯৪-৯৫ সালে ৮৬.৯৮%, ১৯৯৭-৯৮ সালে ৯০.২৭% এবং ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে ৯২.৪৫%-এ উন্নীত হয়েছে। তৈরি পোশাক ব্যতীত চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য, হিমায়িত চিংড়ি ও খাদ্যসামগ্রী এবং অন্যান্য অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে এ পণ্যগুলি বাংলাদেশের রপ্তানি শিল্প ও বাজার উন্নয়নে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করছে।

রপ্তানি আয় অপেক্ষা আমদানি পরিশোধের পরিমাণ বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকেই বাণিজ্য ঘাটতির সম্মুখীন হয়ে আসছে। সরকারের উদার আমদানি নীতি অনুসরণ, বিশ্ব বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি, সময়ে সময়ে খাদ্য ও মধ্যবর্তী দ্রব্য এবং মূলধনি দ্রব্যের আমদানি বৃদ্ধির ফলেই বাংলাদেশের রপ্তানি আয় অপেক্ষা আমদানি ব্যয় পরিশোধের পরিমাণ অত্যধিক যা বাণিজ্য ঘাটতির জন্য দায়ী। উল্লেখ্য, ৮০ ও ৯০-এর দশকে এরূপ বাণিজ্য ভারসাম্যের ঘাটতির পরিমাণ বেশি ছিল।

২০০০ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি গড়ে ১৫%-এর বেশি ছিল যার মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল শতকরা ২০ ভাগের মতো। এমএফএ উত্তর সময়কালে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি সত্ত্বেও বাংলাদেশের রপ্তানি খাত যে যথেষ্ট ভালো করেছে এটি তারই নির্দেশক। বর্তমানে মোট রপ্তানি ঝুড়ির তিন চতুর্থাংশ পোশাক খাত থেকে আসছে। এই সময়ে রপ্তানি/জিডিপি অনুপাতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি পরিলক্ষিত হয় যা অর্থবছর ২০০০-এ ১২.২% থেকে বেড়ে ২০০৯ অর্থবছরে ১৭.৩৩%-এ দাঁড়ায়। ২০০৯ অর্থবছর শেষে নন-ট্রাডিশনাল (অপ্রথাগত) পণ্যের অংশ মোট রপ্তানি আয়ের ৯৭.৩%-এ দাঁড়ায়, যেখানে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে এর পরিমাণ ছিল ৯৬%-এর বেশি। তবে রপ্তানি প্রবাহ ই.ইউ ব্লক এবং নাফটা ব্লকের উপর অধিকতর নির্ভরশীলতা প্রদর্শন করেছে, যার পরিমাণ যথাক্রমে ৪৯% এবং ২৯%। এর পরেই সার্ক দেশগুলির (১৭%) অবস্থান। সরকার রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা দানের জন্য নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রপ্তানিকারক বিশেষ করে নতুন রপ্তানিকারকদের রাজস্ব সহায়তা প্রদান এবং নতুন প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা প্রতিষ্ঠা উল্লেখযোগ্য। এখন পর্যন্ত ৮টি ইপিজেড স্থাপন, off shore ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু এবং ২০০৬-২০০৯ সময়কালের জন্য একটি নতুন রপ্তানি নীতিমালা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত দশকে জিএসপি সংকটের কারণে রপ্তানি খাতে সৃষ্ট কিছুটা অচলবস্থা এবং বিশ্ব আর্থিক সংকট সত্ত্বেও বাংলাদেশের রপ্তানিখাতের সুস্থ প্রবণতা প্রদর্শন করেছে। সম্প্রতি রপ্তানি পণ্য হিসেবে পাট ও পাটজাত পণ্যের পুনঃআবির্ভাব এবং জাহাজ শিল্প রপ্তানিযোগ্য হিসেবে পরিগণিত হওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দেশজ যন্ত্রপাতি ও মূলধনী দ্রব্যের আমদানি বৃদ্ধির কারণে ২০০৩ থেকে ২০০৯ অর্থবছরে বার্ষিক আমদানি প্রবৃদ্ধি গড়ে ২০% লক্ষ্য করা যায়। পাশাপাশি আমদানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এই উচ্চ আমদানি প্রবৃদ্ধির আরেকটি কারণ। আমদানি দৃশ্যের সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো এই সময়কালে দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ভাল হওয়ায় খাদ্যশস্যের আমদানি হ্রাস পায়। ট্যারিফের স্তর এবং শুল্কহারের হ্রাসও এই প্রবৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে। উচ্চ শুল্কহার যা অর্থবছর ২০০৯-এ ছিল ৩৭.৫% তা ২০০৯ অর্থবছরে জিডিপির শতকরা ১৬ ভাগ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৯ অর্থবছরে শতকরা ২২.৬ ভাগে দাঁড়ায়। উচ্চ আমদানি ব্যয়ের তুলনায় নিম্ন রপ্তানি আয়ের কারণে এই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যায়। ২০০০ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল জিডিপির শতকরা ৪.২ ভাগ এবং পরে ২০০৯ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ শতাংশের বেশি। তদুপরি, বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ বৃদ্ধি সত্ত্বেও উচ্চ প্রবাস আয়ের প্রবাহের কারণে দেশের চলতি হিসেবে উদ্বৃত্ত বজায় থাকে। [সৈয়দ আহমেদ খান এবং এ সামাদ সরকার]