পাল বংশ

পাল বংশ আট শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রায় চারশত বছর বাংলা ও বিহারে শাসনকারী রাজবংশ। গোপাল প্রতিষ্ঠিত এ বংশের শাসন চলে নানা ধরনের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে আঠারো পুরুষ ধরে।

ধর্মপাল এবং দেবপাল এর শাসনকাল ছিল বংশের উদীয়মান প্রতিপত্তির যুগ। এ সময়ই বাংলা ও বিহারে এ বংশের শাসন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এ যুগের পাল রাজারা নিজেদেরকে উত্তর ভারতীয় রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হিসেবে গণ্য করেন। ধর্মপাল এবং দেবপাল উভয়েই উত্তর ভারতীয় সাম্রাজ্যের মধ্যদেশ (কনৌজ) অধিকার করার জন্য তৎকালীন অপর দুটি শক্তি পশ্চিম ভারতের গুর্জর-প্রতিহার এবং দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে এক দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। কিছু সময়ের জন্য তাঁরা সফলও হন। ধর্মপাল কনৌজের সিংহাসনে তাঁর অনুগ্রহভাজন ব্যক্তিকে স্থাপনে সফল হয়েছিলেন। দেবপালও প্রতীহারদের বিরুদ্ধে নিজের অস্তিত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হন। প্রশংসামূলক শ্লেলাকেপূর্ণ পাল দলিলপত্রে ধর্মপাল এবং দেবপালকে বিখ্যাত বিজেতা হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। এভাবে বাংলা উত্তর ভারতীয় রাজনীতিতে একটি পরাক্রান্ত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।

দেবপালের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে উদীয়মান প্রতিপত্তির যুগের অবসান ঘটে এবং শুরু হয় স্থবিরতার যুগ। প্রথম মহীপাল কর্তৃক সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার পর্যন্ত স্থবিরতার যুগ চলতে থাকে। এ স্থবিরতা ধীরে ধীরে পাল সাম্রাজ্যকে বিশৃঙ্খলা ও অবনতির দিকে টেনে নিয়ে যায়। খুব সম্ভবত দেবপালের শাসনকালের পর উত্তরাধিকার সংক্রান্ত সমস্যা থেকেই এ স্থবিরতা এবং অবনতি এসেছিল। দেবপালের পর পাল সিংহাসনে কে আরোহণ করেছিলেন এ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। পাল দলিলপত্রে দেবপালের পুত্র ও উত্তরাধিকারী হিসেবে তিনজন রাজার নাম জানা যায়। এঁরা হলেন বাদল স্তম্ভলিপিতে উল্লিখিত দেবপাল ও নারায়ণপালের মধ্যবর্তী অবস্থানে শূরপাল, নারায়ণপালের ভাগলপুর তাম্রশাসনে উল্লিখিত বিগ্রহপাল এবং সম্প্রতি আবিষ্কৃত জগজ্জীবনপুর তাম্রশাসনে উল্লিখিত মহেন্দ্রপাল। বাদল স্তম্ভলিপিতে শূরপাল ও দেবপাল অথবা শূরপাল ও নারায়ণপালের মধ্যকার সম্পর্ক বিষয়ে কোন ধরনের নির্দেশনা নেই। বিগ্রহপাল ছিলেন জয়পালের পুত্র এবং ধর্মপালের ভাই বাকপালের পৌত্র। বিগ্রহপালের পরে পাল সাম্রাজ্য শাসনকারী সকল রাজাই ছিলেন ধর্মপালের ভাই বাকপালের বংশধর। সুতরাং দেবপালের পর প্রায় একই সময়ে শাসনকারী তিনজন রাজার নামের অস্তিত্ব পাল বংশের অভ্যন্তরীণ সংকটেরই ইঙ্গিত দেয়। দেবপালের পর সম্ভবত মহেন্দ্রপালই পাল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। কিন্তু সিংহাসনের অপর দুজন দাবিদার শূরপাল এবং বিগ্রহপাল সাম্রাজ্যের ভিতরেই সম্ভবত বিপুল প্রয়াস দ্বারা নিজেদের স্বাধীন অবস্থান অর্জন করেন। শেষ পর্যন্ত পাল বংশের শাসন সরাসরিভাবে বিগ্রহপালের বংশধরদের হাতে চলে যায়।

Palbansha.jpg

উত্তরাধিকার সংকট থেকে উদ্ভূত স্থবিরতা পাঁচজন রাজার শাসনকালব্যাপী একশ’ বছরেরও অধিককাল অব্যাহত থাকে। এ সময়ে পাল রাজাদের শৌর্য-বীর্য এবং শক্তি হ্রাস পায়, সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের আদৌ কোন চেষ্টা করা তো হয়ই নি বরং বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করা (দশ শতকের শেষ দিকে চন্দেল এবং কলচুরিদের) অথবা অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করার মতো যথেষ্ট শক্তিও পাল রাজাদের ছিল না। দশ শতকের মাঝামাঝিতে পশ্চিম ও উত্তর বাংলার অংশ বিশেষে কম্বোজ গৌড়পতি গণ নিজেদের স্বাধীন অবস্থান অর্জন করেন এবং এখানে তাদের তিন পুরুষ (রাজ্যপাল, নারায়ণপাল এবং নয়পাল) শাসন পরিচালনা করেন। কিছু সময়ের জন্য পাল সাম্রাজ্য বিহারের অংশ বিশেষে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

প্রথম মহীপালএর শাসনকালে পালদের শৌর্য-বীর্য ও জীবনীশক্তি অনেকটা ফিরে আসে এবং পাল সাম্রাজ্যে দ্বিতীয়বারের মতো প্রাণশক্তি সঞ্চারিত হয়। উত্তর এবং পশ্চিম বাংলার হূতরাজ্য পুনরুদ্ধার এবং পাল বংশের শাসন দৃঢ় ভিত্তির উপর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে প্রথম মহীপাল সাফল্য অর্জন করেন। সম্ভবত জনহিতকর কার্যাবলির মাধ্যমেই প্রথম মহীপাল ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত অসংখ্য লোকগাঁথা ও প্রাচীন গল্প কাহিনীতে তাঁর নাম টিকে ছিল। তাঁর চার উত্তরাধিকারীর শাসনকালে (প্রায় ৪০ বছর), অর্থাৎ  রামপালএর সময় পর্যন্ত পাল সাম্রাজ্যের গৌরব সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। পাল শাসনের দুর্বলতা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালেই। এ সময় সামন্তদের বিদ্রোহ (বরেন্দ্র বিদ্রোহ) সংঘটিত হয় এবং উত্তর বাংলায় কৈবর্ত প্রধান দিব্যর স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

দীর্ঘ ৪০ বছরের রাজত্বকালে রামপাল উত্তর বাংলা পুনরুদ্ধার এবং উড়িষ্যা, কামরূপ ও উত্তর ভারতের মধ্যদেশে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে পাল সাম্রাজ্যের গৌরবময় অবস্থান ফিরিয়ে আনেন। নয়পাল এবং তৃতীয় বিগ্রহপালের সময় হতে বিদ্যমান কোন্দল-কলহ সাময়িকভাবে নিবৃত্ত করতে তিনি সক্ষম হন। তিনি ক্ষয়িষ্ণু পাল সাম্রাজ্যকে নবজীবন দান করেন। কিন্তু এই সাফল্য ছিল ক্ষণস্থায়ী এবং তাঁর উত্তরাধিকারিগণ এতই দুর্বল ছিলেন যে সাম্রাজ্যের ক্রমাগত পতন রোধে তাঁরা ব্যর্থ হন। খুব সম্ভবত রামপালের সমসাময়িককালে অথবা তাঁর উত্তরসূরি কুমারপালের সময়ে দক্ষিণ রাঢ়ে স্বাধীন শক্তি হিসেবে সেনদের অস্তিত্ব ছিল। শেষ পাল রাজা হিসেবে পরিচিত মদন পালের রাজত্বের ৮ম বছরের কিছু পরে সেনদের হাতে উত্তর বাংলার পতন ঘটে এবং তাঁর শাসনের শেষ বছরগুলি বিহারের ক্ষুদ্র অংশে সীমাবদ্ধ ছিল। বিহার হতে আবিষ্কৃত শিলালিপিতে ওই অঞ্চলের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশে সাম্রাজ্যবাদী পালদের উত্তরসূরি হিসেবে দুজন পাল রাজার নাম পাওয়া যায়। তাঁরা হলেন গোবিন্দপাল ও পলপাল। কিন্তু পাল বংশের সঙ্গে তাদের কোন প্রকার সম্পর্ক এখন পর্যন্ত প্রমাণিত হয় নি।

পাল যুগের গৌরব  পাল যুগ প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে গৌরবময় অধ্যায়। পাল বংশ প্রায় চারশত বছর বাংলা শাসন করে। একই রাজবংশের এতো দীর্ঘকালের শাসন ইতিহাসে বিরল। এই দীর্ঘ শাসনে বাংলার কৃতিত্ব অবশ্যই পাল যুগের গৌরব। বিস্তৃত সাম্রাজ্য, সাম্রাজ্যে সুষ্ঠু শাসন ব্যবস্থা, প্রজাবৎসল শাসন-নীতি, বিভিন্ন শিল্পকলার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উৎকর্ষ সাধন এবং সাহিত্য ও জ্ঞান চর্চা - এ সবই পাল যুগের কৃতিত্ব ও গৌরব।

পালবংশের শাসন প্রতিষ্ঠার পর উদীয়মান প্রতিপত্তির যুগে পাল সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। সমগ্র উত্তর ভারত তাঁদের শাসনাধীনে না এলেও কনৌজ পর্যন্ত আধিপত্য বিস্তার করে পাল শক্তি উত্তর ভারতের রাজনীতিতে দৃঢ় পদক্ষেপের চিহ্ন রাখতে সমর্থ হয়েছিল নয় শতকের প্রথমার্ধে। পালদের অধীনেই উত্তর ভারতের রাজনীতিতে বাংলার প্রথম সাফল্যজনক বিস্তৃতি ঘটে। বাংলার রাজবংশগুলির মধ্যে এই গৌরবের দাবি কেবল পালরাই করতে পারে। অবশ্য উত্তর ভারতে পালদের প্রতিপত্তি দীর্ঘকাল বজায় থাকেনি। তবে একথা বলতেই হয় যে, পাল শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে যে শক্তি সঞ্চারিত হয়েছিল তা দীর্ঘকাল ধরে পাল সাম্রাজ্যকে উত্তর ভারতীয় শক্তিবলয়ে প্রভাব বিস্তার করতে সামর্থ এবং দশ-এগারো শতকে বিভিন্ন উত্তর ভারতীয় শক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সাফল্যজনক প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো শক্তি দিয়েছিল।

পালদের সামরিক কৃতিত্বের চাইতে অধিকতর প্রশংসনীয় কৃতিত্ব তাঁদের সাম্রাজ্যে বিরাজমান সুষ্ঠু শাসন ব্যবস্থা। পালদের তাম্রশাসনসমূহে সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থার স্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। গ্রাম পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় সরকার পর্যন্ত স্তরীভূত সুবিন্যস্ত শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল পাল সাম্রাজ্যে। গুপ্ত শাসনাধীন বাংলায় এই ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রথম পরিচয় পাওয়া যায়। তবে পালদের কৃতিত্ব এই যে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ব্যবস্থাকে তাঁরা অনেক বেশি কার্যকর করে তুলেছিলেন। যোগ করেছিলেন অনেক নতুন বৈশিষ্ট্য। রাজস্ব ছাড়াও বিভিন্ন কর ও শুল্ক আদায়ের এবং ভূমি প্রশাসনের ছিল সুবিন্যস্ত অবকাঠামো। তাম্রশাসনসমূহে রাজকর্মচারীদের যে দীর্ঘ তালিকা পাওয়া যায় তা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, প্রশাসন ব্যবস্থা ছিল সর্বব্যাপী, খেয়াঘাটের ব্যবস্থা থেকে শুরু করে নদীপথ, স্থলপথ, ব্যবসা-বাণিজ্য, নগর-বন্দর, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা - কোন ক্ষেত্রই প্রশাসন যন্ত্রের আওতাবহির্ভূত ছিল না। এমনকি বন এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দিকেও নজর ছিল প্রশাসনের। পালদের অব্যাহত চার শতককাল শাসনের মূল ভিত্তিই ছিল তাঁদের সুষ্ঠু সুবিন্যস্ত শাসন ব্যবস্থা।

বাংলায় দীর্ঘ পাল শাসনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল দিক তাঁদের প্রজা-বৎসল শাসন নীতি। পাল রাজগণ ছিলেন বৌদ্ধ, কিন্তু সম্ভবত: প্রজাদের অধিকাংশ ছিল হিন্দু। পাল রাজা ধর্মপাল ধর্মীয় সম্প্রীতির নীতি গ্রহণ করেছিলেন রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, তিনি সকল শাস্ত্র সম্বন্ধে জ্ঞাত। তাই, অন্যান্য সকল ধর্ম-বর্ণ যাতে তাদের ধর্মচর্চা নির্বিঘ্নে করতে পারে সেদিকে তিনি তৎপর থাকবেন। প্রজাদের ধর্ম-কর্ম সম্পর্কে সচেতনতার এই ঘোষণা দীর্ঘ পাল শাসনামলে অনুসৃত হয়েছিল বলেই মনে করা হয়। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, পাল রাজগণ বৌদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও হিন্দু দেব-দেবতা বা ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় সম্রাটদের অকুণ্ঠ পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছে। রাজকীয় উচ্চ পদসমূহে অধিষ্ঠিত দেখা যায় ব্রাহ্মণদের। পাল রাজাদের ভূমিদান সংক্রান্ত তাম্রশাসন আজ পর্যন্ত যে কয়টি পাওয়া গিয়েছে তার দু’একটি ছাড়া সবকয়টিতেই দান লাভ করেছে হিন্দু দেব-দেবতার মন্দির বা ব্রাহ্মণ। বাংলার জনজীবনে হিন্দু-বৌদ্ধের মধ্যে কোন ভেদাভেদ ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থান পাল যুগের সমাজ জীবনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

দীর্ঘ শাসনকালে এই সামাজিক সম্প্রীতি পাল যুগকে অন্যান্য ক্ষেত্রে উন্নতি সাধনে অবশ্যই সাহায্য করেছিল। পাল রাজাদের প্রজাহিতৈষণারও দৃষ্টান্ত রয়েছে। পাল রাজা ধর্মপাল বহু সহস্র দ্রম্ম (রৌপ্য মুদ্রা) খরচ করে খনন করিয়েছিলেন কয়েকটি দিঘি। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রথম মহীপালের দিঘি খনন ও নগর প্রতিষ্ঠা সর্বজনবিদিত। বাংলার জনমনে যে তিনি স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তাছাড়া পাল রাজাদের জনস্বার্থে বহু নির্মাণের ধ্বংসাবশেষ তাঁদের কল্যাণমুখী শাসনের পরিচয় বহন করে। বাংলার জনজীবনে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার যে ঐতিহ্য পালযুগে সৃষ্টি হয়েছিল, সেনযুগে তা বিঘ্নিত হওয়ার ফলেই হয়ত পরবর্তীকালে বাংলার সমাজ জীবনে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। বাংলার ধর্মজীবনে হিন্দু-বৌদ্ধ সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ও সমন্বয়ের যে ধারা সুদীর্ঘ পাল শাসনামলে সূচিত হয়েছিল, সৃষ্টি হয়েছিল সহজিয়া ও তান্ত্রিক মতাদর্শের, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব বাংলার জনজীবনে পরিলক্ষিত হয় মধ্যযুগ পেরিয়ে আধুনিক যুগেও। বলা যায়, বাংলার ধর্ম-সমাজ-সংস্কৃতিতে যে সমন্বয়ের ঐতিহ্য পাল যুগে সৃষ্টি হয়েছিল, তা বাংলার এক অর্জন, গর্ব করার মতো অর্জন।

পালযুগে বৌদ্ধ ধর্ম প্রসার লাভ করেছিল তিববত, জাভা, সুমাত্রা ও মালয়েশিয়াতে। বাংলার বৌদ্ধবিহারগুলি থেকে বহু বৌদ্ধ পন্ডিত ঐ সব দেশে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারে এবং প্রসারে ভূমিকা রেখেছিলেন।

পাল যুগের গৌরবের সবচেয়ে উজ্বল দিক শিল্পকলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে। স্থাপত্য, পোড়ামাটির ফলক, ভাস্কর্য আর চিত্রকলায় পাল যুগের বিশেষ কৃতিত্ব পরিলক্ষিত হয়। পাল রাজা ধর্মপালের স্থাপত্য কীর্তির নিদর্শন পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার। বাংলায় উদ্ভাবিত বৌদ্ধ-বিহার স্থাপত্য পরিকল্পনায় নির্মিত এই বিহারটির ধ্বংসাবশেষ সগৌরবে ঘোষণা করছে স্থাপত্যশিল্পে বাংলার উৎকর্ষ অর্জনের কথা। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ বৌদ্ধ বিহার। বিপুলশ্রীমিত্রের নালন্দালিপিতে এটিকে ‘জগতাম্ নেত্রৈকবিশ্রামভূ’ (জগতের চোখে তৃপ্তিদায়ক বা দৃষ্টিনন্দন) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিহারের স্থাপত্য পরিকল্পনা, বিশেষ করে এর কেন্দ্রীয় সৌধটির ক্রমহ্রাসমান ক্রুশাকৃতি অবয়ব, নিকটবর্তী মায়ানমারে ও ইন্দোনেশিয়ায় প্রভাব ফেলেছিল বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। এ পরিকল্পনা অনুসরণ করে তেরো এবং চৌদ্দ শতকে কয়েকটি বৌদ্ধ স্থাপত্য এসব দেশে গড়ে উঠেছিল।

পাহাড়পুরে প্রাপ্ত অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক পাল যুগে এই শিল্পের উৎকর্ষের প্রমাণ বহন করে। দেয়াল গাত্রালংকারে ব্যবহূত এ ফলকসমূহ বাংলার মৃৎশিল্পিদের অনন্য সৃষ্টি বলে স্বীকৃতি পেয়েছে। ধর্মীয় বিষয়বস্ত্ত ছাড়াও এ ফলকসমূহে স্থান পেয়েছে বাংলার জনজীবনের অনেক দৃশ্য। তাই শৈল্পিক মূল্য ছাড়াও ইতিহাসের উপকরণ হিসেবে এদের মূল্য অপরিসীম। বাংলার এ ঐতিহ্যবাহী শিল্প যে পাল যুগে উৎকর্ষের উচ্চ শিখরে উঠেছিল সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। পাহাড়পুর ছাড়াও পাল যুগের অনেক কীর্তি বাংলা-বিহারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। বিক্রমশীলা মহাবিহার (বিহারটি ভাগলপুর জেলায় পাথরঘাটায় অবস্থিত) ও ওদন্তপুর বা ওদন্তপুরী মহাবিহার ধর্মপালের কীর্তি। বৌদ্ধ ধর্মচর্চা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার জন্য সোমপুর মহাবিহার ও বিক্রমশীল বিহার নয় শতক থেকে বারো শতক সময়ের মধ্যে বৌদ্ধবিশ্বে সমাদৃত হয়েছিল। পালযুগের অন্যান্য বিহারের মধ্যে ত্রৈকুটক, দেবিকোট, পন্ডিত, ফুল্লবাড়ি ও জগদ্দল বিহারের নাম উল্লেখযোগ্য। এই সূত্র ধরে এ কথাও বলা যায় পাল সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ ধর্ম চর্চা, বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা বাংলার বিভিন্ন কেন্দ্রে এতো প্রসার লাভ করেছিল যে তদানীন্তন বিশ্বে বাংলার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। নিকটবর্তী ও দূরবর্তী বহু দেশ থেকে বিদ্যার্থীরা বাংলায় আসত। জাভা-সুমাত্রার শৈলেন্দ্রবংশীয় রাজা বালপুত্রদেবের অনুরোধে পাল রাজা দেবপাল পাঁচটি গ্রাম দান করেছিলেন নালন্দায় অধ্যয়নরত ঐ দেশিয় বিদ্যার্থীদের মঠের ব্যয় নির্বাহের জন্য। পাল যুগের বৌদ্ধ বিহারগুলি পার্শ্ববর্তী নেপাল, তিববত, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশে বৌদ্ধধর্ম বিস্তারের ক্ষেত্রেও মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। বাংলার বৌদ্ধপন্ডিতবর্গ দূরদূরান্তে বৌদ্ধ সংস্কৃতির বিস্তার ঘটিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযাগ্য।

পালযুগের কোন হিন্দু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায় নি। তবে বাংলার বিভিন্ন জায়গায় মন্দিরে ব্যবহূত স্তম্ভ বা দ্বারের অংশবিশেষ, ভাস্কর্যে মন্দিরের প্রতিকৃতি প্রভৃতি থেকে অনুমান করা সম্ভব যে পাল যুগে মন্দির স্থাপত্যেরও ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল এবং স্থাপত্যশিল্পের উৎকর্ষ এ ক্ষেত্রেও সাধিত হয়েছিল।

পাল যুগের শিল্পকলার মধ্যে ভাস্কর্য শিল্পের প্রভূত অগ্রগতি ঘটেছিল। গুপ্ত ভাস্কর্যের ধারাবাহিকতায় পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলার ভাস্কর্য শিল্প এ যুগে এক নতুন রূপ পরিগ্রহ করে, যাকে আখ্যায়িত করা হয়েছে ‘পাল স্কুল অব স্কাল্পচারাল আর্ট‘ বলে। বাংলাতে পাল যুগে ভাস্কর্যশিল্প স্থানীয় বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ হয়ে উঠে, যার অগ্রগতি বারো শতক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। পাল যুগের অসংখ্য প্রস্তর মূর্তি বাংলার বিভিন্ন এলাকায় পাওয়া গিয়েছে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জাদুঘরে প্রধান দ্রষ্টব্য বস্ত্তই অসংখ্য মূর্তি। রাজমহলের কালো কষ্টি পাথর ছিল ভাস্কর্যের প্রধান মাধ্যম। ভাস্করের শিল্প সাধনায় প্রস্তর খন্ড যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বাংলার ভাস্কর্য শিল্প স্থান করে নিয়েছিল সর্বভারতীয় শিল্পকলার আসরে। পাল যুগেই যেন পরিপূর্ণতা পেয়েছিল বাংলার দীর্ঘকালের শিল্প-প্রতিভা। প্রস্তর মূর্তির পাশাপাশি ধাতব মূর্তির সংখ্যাও কম নয়। মূর্তি নির্মাণে ব্রোঞ্জও ব্যবহূত হয়েছে। বাংলার ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিল্পরীতিতে প্রভাব ফেলেছিল বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন।

চিত্রকলার ক্ষেত্রেও পাল যুগ পিছিয়ে ছিল না। পালযুগের পূর্বের কোন চিত্রকলার নিদর্শন বাংলাতে পাওয়া যায় নি। মন্দির বা ধর্মীয় স্থাপত্যের অলংকরণে দেয়ালচিত্রেরও কোন নিদর্শন আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নি। ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে রচিত লামা তারনাথের গ্রন্থে পাল রাজা ধর্মপাল ও দেবপালের রাজত্বকালের দুই বিখ্যাত ভাস্কর ও চিত্রশিল্পি, ধীমান ও তাঁর ছেলে বীটপালের উল্লেখ রয়েছে। একাধারে প্রস্তর ও ধাতু নির্মিত ভাস্কর্যে এবং চিত্রশিল্পে তাঁরা ছিলেন পারদর্শী। বজ্রযান ও তন্ত্রযান বৌদ্ধমতের বহু পান্ডুলিপিতে বৌদ্ধ দেব-দেবতার রূপ চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। দশ শতকের শেষভাগ থেকে বারো শতকের শেষভাগ পর্যন্ত সময়ের ২৪টি চিত্রিত বৌদ্ধ পান্ডুলিপি এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে- ‘পঞ্চরক্ষা’,‘অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’, ‘পঞ্চবিংশতিসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’ প্রভৃতি বৌদ্ধ গ্রন্থ সমূহ । আর এসব পান্ডুলিপির চার শতাধিক চিত্রের মধ্যেই বিধৃত রয়েছে পাল যুগের চিত্রকলা। কেবল পান্ডুলিপি চিত্রের মধ্যেই পাল যুগের চিত্রকলার পরিচয় সীমাবদ্ধ হলেও, গুণগত মানে তা শিল্পের উৎকর্ষের কথাই প্রমাণ করে। পরবর্তী কালের, এমনকি চৌদ্দ শতকের, পূর্ব ভারতীয়, নেপালি এবং তিববতি চিত্রকলায় পাল যুগের চিত্রকলার প্রভাব লক্ষ করেছেন চিত্রকলার বিশেষজ্ঞগণ।

সাহিত্য ক্ষেত্রে পাল যুগের কৃতিত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়, কারণ এ যুগের রচনা খুব বেশি সংখ্যায় আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। যে দু’একটি এসে পৌঁছেছে, তা থেকেই বোঝা যায় যে সাহিত্য ক্ষেত্রেও প্রভূত অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল। পাল যুগের প্রাপ্ত অসংখ্য তাম্রশাসনে বিধৃত ‘প্রশস্তি’ অংশে সংস্কৃত ভাষা চর্চার ও শৈল্পিকমান সম্পন্ন কাব্য রচনার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। নয় শতকের কবি অভিনন্দ কর্তৃক বৈদর্ভী রীতিতে রচিত ‘রামচরিতম’ মহাকাব্য সর্ব-ভারতীয় সাহিত্যাসরে সমাদৃত হয়েছিল। শেষ পাল রাজা মদনপালের রাজত্বকালে রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত হয়েছিল বরেন্দ্রের কবি সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিতম্’ কাব্য। ভাষার সৌকর্য, বিশেষ দ্ব্যর্থবোধক শব্দের প্রয়োগ এবং ছন্দের মাধুর্যে সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিতম্’ কাব্যটি সর্বভারতীয় সংস্কৃত সাহিত্যের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে বেশ উপরের সারিতেই। সেন যুগে সংকলিত কাব্য সংকলনগুলির মধ্যে দশ-এগারো শতকের বেশ কয়েকজন কবির রচনা স্থান পেয়েছে। কাব্যিক মানে উচ্চ পর্যায়ের বলেই এই রচনাসমূহ সংকলনে স্থান পেয়েছে। আর এ কাব্য সম্ভার পাল যুগের সাহিত্যের উৎকর্ষেরই প্রমাণ বহন করে।

বিভিন্ন শাস্ত্র সম্বন্ধীয় লেখনীরও প্রমাণ পাওয়া যায়। দর্শন শাস্ত্রের মূল্যবান গ্রন্থ ‘আগমশাস্ত্র‘ নামে বহুল পরিচিত ‘গৌড়পাদকারিকা’ রচনা করেছিলেন গৌড়পাদ, বর্ধমানের ভুরিশ্রেষ্টি গ্রামের শ্রীধর ভট্ট রচনা করেছিলেন ‘ন্যায়কন্দলী’, বীরভূমের সিদ্ধল গ্রামের ভট্ট ভবদেব রচনা করেছিলেন ‘কর্মানুষ্ঠানপদ্ধতি’। স্মৃতিশাস্ত্রেও ভবদেবের খ্যাতি ছিল। পাল রাজা নয়পালের কর্মচারী নারায়ণ দত্তের পুত্র চক্রপাণি দত্ত চিকিৎসা শাস্ত্রের বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেছিলেন - ‘চিকিৎসা সংগ্রহ’, ‘আয়ুর্বেদদীপিকা’, ‘ভানুমতী’, ‘শব্দ চন্দ্রিকা’ ও ‘দ্রব্যগুণসংগ্রহ’। বারো শতকে প্রণীত চিকিৎসা শাস্ত্রের উল্লেলখযোগ্য গ্রন্থ ‘শব্দ প্রদীপ’-এর গ্রন্থকার সুরেশ্বর ছিলেন পাল রাজপরিবারের চিকিৎসক, তাঁর পিতা ভদ্রেশ্বর ছিলেন রাজা রামপালের চিকিৎসক। সুরেশ্বরের অন্যান্য রচনা ‘বৃক্ষায়ুর্বেদ’ এবং ‘লোহপদ্ধতি’ বা ‘লোহসর্বস্ব’। ‘চিকিৎসাসার সংগ্রহ’-এর প্রণয়নকারী বঙ্গসেন ও ‘সুশ্রত’ শাস্ত্রের ব্যাখ্যাদানকারী গদাধর বৈদ্য পাল যুগের বলেই মনে করা হয়। ধর্মশাস্ত্রে অবদান রেখেছিলেন জীমূতবাহন তাঁর ‘দায়ভাগ’, ‘ব্যবহার-মাতৃকা’ ও ‘কালবিবেক’ গ্রন্থত্রয়ের মাধ্যমে। এগারো বা বারো শতকের কোন সময়ে রাঢ়ের পারিভদ্র পরিবারে তাঁর জন্ম। উপরে উল্লিলখিত গ্রন্থরাজি পাল যুগের সাহিত্য ও জ্ঞান চর্চার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

পাল শাসনের দীর্ঘ চার শতককাল বাংলার জন্য বয়ে এনেছিল অনেক কৃতিত্ব। এই কৃতিত্বের গৌরব যেমন একদিকে শাসকগোষ্ঠীর তেমনি অন্যদিকে জনগণের। [আবদুল মমিন চৌধুরী]