পাবনা জেলা

পাবনা জেলা (রাজশাহী বিভাগ)  আয়তন: ২৩৭১.৫০ বর্গ কিমি। অবস্থান: ২৩°৪৮´ থেকে ২৪°২১´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯°০০´ থেকে ৮৯°৪৪´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। সীমানা: উত্তরে নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলা, দক্ষিণে পদ্মা নদী, রাজবাড়ী ও কুষ্টিয়া জেলা, পূর্বে মানিকগঞ্জ ও যমুনা নদী, পশ্চিমে পদ্মা নদী, নাটোর ও কুষ্টিয়া জেলা।

জনসংখ্যা ২১৭৬২৭০; পুরুষ ১১২৬০৮৪, মহিলা ১০৫০১৮৬। মুসলিম ২০৯৯১৬০, হিন্দু ৭৩৮৩৯, বৌদ্ধ ৩০২৩, খ্রিস্টান ৭৮ এবং অন্যান্য ১৭০।

জলাশয় গঙ্গা (পদ্মা), বড়াল, যমুনা, ইছামতি, আত্রাই, হুরাসাগর, চিকনাই নদী  ও চলন বিল উল্লেখযোগ্য।

প্রশাসন পাবনা জেলা গঠিত হয় ১৮৩২ সালে। জেলার  নয়টি উপজেলার মধ্যে পাবনা সদর উপজেলা সর্ববৃহৎ (৪৪৩.৯০ বর্গ কিমি) এবং সবচেয়ে ছোট উপজেলা ভাঙ্গুরা (১৩৬ বর্গ কিমি)।

জেলা
আয়তন(বর্গ কিমি) উপজেলা পৌরসভা ইউনিয়ন মৌজা গ্রাম জনসংখ্যা ঘনত্ব(প্রতি বর্গ কিমি) শিক্ষার হার (%)
শহর গ্রাম
২৩৭১.৫০ ৭২ ১৩২১ ১৫৩৬ ৪৪৯৩৯০ ১৭২৬৮৮০ ৯১৮ ৪২.৪
জেলার অন্যান্য তথ্য
উপজেলার নাম আয়তন(বর্গ কিমি) পৌরসভা ইউনিয়ন মৌজা গ্রাম জনসংখ্যা ঘনত্ব (প্রতি বর্গ কিমি) শিক্ষার হার (%)
আটঘরিয়া ১৮৬.১৫ - ১১১ ১৩২ ১৩৬৪৮০ ৭৩৩ ৪৪.৬
ঈশ্বরদী ২৪৬.৯০ ১২৮ ১২৩ ২৯২৯৩৮ ১১৮৬ ৫০.৭
চাটমোহর ৩০৫.৬৩ ১১ ১৭০ ২৩২ ২৩৯৯৭৩ ৭৮৫ ৩৮.৬
পাবনা সদর ৪৪৩.৯০ ১০ ২৫৯ ২৮৪ ৪৭৬৯৩২ ১০৭৪ ৪৮.২
ফরিদপুর ১৩৮.৩৬ ৫৯ ৮৪ ১২৩৯১৯ ৮৯৬ ৪৭.১
বেড়া ২৪৮.৬০ ১৬৩ ১৫৯ ২৩১৪৩০ ৯৩১ ৩৩.৫
ভাঙ্গুরা ১৩৬.০০ ৬৭ ১১০ ৯৯৪৭৪ ৭৩১ ৩৮.৩
সাঁথিয়া ৩৩১.৫৬ ১০ ১৭৭ ২৩২ ৩২৩৯৩২ ৯৭৭ ৩৮.৩
সুজানগর ৩৩৪.৪০ ১০ ১৯১ ১৮০ ২৫১১৯২ ৭৫১ ৩৬.৭

সূত্র আদমশুমারি রিপোর্ট ২০০১, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো।

PabnaDistrict.jpg

মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ  পাবনা সদর উপজেলার টেলিফোন এক্সচেঞ্জ কম্পাউন্ডে পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ে ২২ জন পাকসেনা নিহত হয়। একই দিনে ঈশ্বরদী উপজেলার মাধবপুর গ্রামে পাকসেনারা ৫ জন যুবককে হত্যা করে। ৩১ মার্চ মুক্তিযোদ্ধারা বেড়া উপজেলার নগরবাড়ি ফেরিঘাটে পাকসেনাদের প্রতিরোধ করে এবং ৯ এপ্রিল নগরবাড়ির প্রতিরোধ ভাঙ্গার জন্য পাকবাহিনীর বিমান থেকে গোলাবর্ষণ করলে কিছু সংখ্যক নিরীহ লোক নিহত হয়। ১৯ এপ্রিল বেড়া-সাঁথিয়ার সংযোগস্থল পাইকরহাটির নগরবাড়ি-বগুড়া মহাসড়কের উপর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকসেনাদের লড়াইয়ে ২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং ১৫০ জন পাকসেনা নিহত হয়। ২২ মে  ফরিদপুর উপজেলার হাদল গ্রামে পাকসেনারা ১৫৬ জন নিরীহ লোককে হত্যা করে। পাকসেনারা এখানে নারী নির্যাতন করে এবং ব্যাপক লুটপাট চালায় এবং ৭০টি ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়। ৩০ বৈশাখ এ উপজেলার ডেমরা গ্রামে পাকসেনা ও রাজাকাররা নির্বিচারে গুলি করে প্রায় ৮০০ জন নিরীহ লোককে হত্যা করে, নারী নির্যাতন চালায় এবং মসজিদ, মন্দির, স্কুল-মাদ্রাসা ও ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়। ৪ ভাদ্র একই উপজেলার গোপালপুর গ্রামে পাকসেনারা ৭০০ জন গ্রামবাসীকে আটক ও ২৬ জনকে হত্যা করে এবং ব্যাপক লুটপাট ও নারী নির্যাতন চালায়। এছাড়া ২৭ রমজান পাকসেনারা এ উপজেলার মাজাট গ্রামের ৮ জন এবং রতনপুর গ্রামের ৩ জন নিরীহ লোককে হত্যা করে। অক্টোবরে চাটমোহর উপজেলার চিকনাই নদীর পাড়ে রেল সেতুর কাছে পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ে ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ২৭ নভেম্বর পাকসেনা ও রাজাকাররা সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়নের ধূলাউড়ি ফকির পাড়ায় নারী নির্যাতন করে এবং এখান থেকে ২২ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে ইছামতি নদীর তীরে নিয়ে বেয়নেট চার্জ করলে ২১ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং ১ জন প্রাণে বেঁচে যান। ১৪ ডিসেম্বর ভারতীয় বিমানের বোমার আঘাতে পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ১২ নং স্প্যান ভেঙ্গে যায় এবং ৯ ও ১৫ নং স্প্যান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৪ ডিসেম্বর সুজানগর উপজেলায় পাকসেনাদের গুলিতে ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন গণকবর ৪ (পাবনা সদর, আটঘরিয়া, বেড়া, সাঁথিয়া); বধ্যভূমি ৭ (বেড়া ২, ফরিদপুর ২, সুজানগর ৩); স্মৃতিস্তম্ভ ৫ (চাটমোহর ১, ঈশ্বরদী ১, পাবনা সদর ১, সাঁথিয়া ২); ভাস্কর্য ১ (পাইকরহাট, বেড়া)।

শিক্ষার হার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড় হার ৪২.৪%; পুরুষ ৪৫.২%, মহিলা ৩৯.৫%। উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ (১৮৯৮), সাঁড়ামাড়োয়ারী স্কুল অ্যান্ড কলেজ (১৯১৭), ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ (১৯৬৩), বেড়া ডিগ্রি কলেজ (১৯৬৪), হাজী জামালউদ্দিন ডিগ্রি কলেজ (১৯৭০), চাটমোহর ডিগ্রি কলেজ (১৯৭০), আটঘরিয়া ডিগ্রি মহাবিদ্যালয় (১৯৭২), ভাঙ্গুরা মহিলা কলেজ (১৯৯৮), সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজ, পাবনা জেলা স্কুল (১৮৫৩), ভারেঙ্গা একাডেমী (১৮৫৮), চাটমোহর আর সি এন এন্ড বি এস এন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (১৮৬১), পাবনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট (১৮৯১), জি সি ইন্সটিটিউশন (১৮৯৪), রাধানগর মজুমদার একাডেমী (১৮৯৯), আর.এম একাডেমী (১৮৯৯), বেড়া বি বি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (১৮৯৯), কৃঞ্চপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯০৩), টাউন গার্লস হাইস্কুল (১৯০৩), বেড়া হাইস্কুল (১৯০৬), পাকুড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয় (১৯০৭), কৃঞ্চপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯০৮), বনওয়ারীনগর সি.বি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১২), ধোবাখোলা করোনেশন উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১২), খলিলপুর উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৭), রূপপুর বালিকা বিদ্যালয় (১৯১৮), বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৮), নাকালিয়া সাঁড়াশিয়া বনিক উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৯), সাতবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয় (১৯২০), সেলিম নাজির উচ্চ বিদ্যালয় (১৯২৪), সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় (১৯২৫), হরিপুর দূর্গাদাস উচ্চ বিদ্যালয় (১৯২৫), সেন্ট্রাল গার্লস হাইস্কুল (১৯২৬), ঈশ্বরদী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯২৯), এম.সি জুবিলি উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৩৬), সাঁথিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৪৩), দেবোত্তর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৬৬), দেবোত্তর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৮৮০), সাঁথিয়া ১ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৯০১), ধুলাউড়ি কাওছারিয়া কামিল মাদ্রাসা (১৯০৭), উলাট সিদ্দিকিয়া ফাজিল মাদ্রাসা (১৯১৫), ধলেশ্বর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা (১৯২২), ত্বাহা ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা (১৯২৩), পাবনা আলীয়া মাদ্রাসা (১৯২৫), শরৎনগর ফাজিল মাদ্রাসা (১৯২৭)।

জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উৎস কৃষি ৫৩.৭৫%, অকৃষি শ্রমিক ৪.৫৭%, শিল্প ৪.৫৮%, ব্যবসা ১৪.৯৭%, পরিবহণ ও যোগাযোগ ৪.১৪%, নির্মাণ ১.৬৪%, ধর্মীয় সেবা ০.১৬%, চাকরি ৭.৪১%, রেন্ট অ্যান্ড রেমিটেন্স ০.৪৯% এবং অন্যান্য ৮.২৯%।

পত্র-পত্রিকা  ও সাময়িকী  দৈনিক: দৈনিক ইছামতি, দৈনিক নির্ভর, দৈনিক উত্তর জনতা (ঈশ্বরদী); সাপ্তাহিক: জ্ঞান বিকাশিনী, পাবনা বার্তা, বিবৃতি, চাটমোহর বার্তা, ফরিদপুর বার্তা, জংশন, জনদাবী (ঈশ্বরদী), আরশী। পাক্ষিক: যমুনা; মাসিক: জ্ঞানপ্রভা, পল্লীদর্পণ, মানসী, আমাদের দেশ, পাবনা; অন্যান্য: সুবোধনী, পরিদর্শক, আশা, তাওহীদ, সচেতন (ভাঙ্গুরা)।

লোকসংস্কৃতি ধুয়া গান, বারাসে গান, জারি গান, সারি গান, যাগ গান, তত্ত্বমূলক গান, মেয়েগান প্রভৃতি লোকসঙ্গীত প্রচলিত রয়েছে। এ অঞ্চলের মানুষ মুখে মুখে ছড়া, ধাঁধাঁ, প্রবাদ-প্রবচন, নানা ধরনের লোকগাথা, উপকথা বলে থাকে। নৌকাবাইচ, তীর-ধনুক খেলা, লড়ি-লাঠি খেলা, ডাংগুলি খেলা, কুস্তি খেলা, কাছি টানাটানি খেলা, জোড়-বিজোড় খেলা, পাঁচগুটি খেলা, সাঁতার খেলা, বাগরজানি খেলা, বাঘ-বন্দী খেলা, গোল্ললাছুট খেলা, হা-ডু-ডু খেলা, কানামাছি খেলা, কুমির-ডাঙ্গা খেলা, সাপ খেলা, বানর খেলা, ঘুড়ি উড়ানো ইত্যাদি পাবনা জেলায় বেশ জনপ্রিয়। পাঁচগুটি খেলা, ডুব-সাঁতার খেলা, কড়ি খেলা, বৌ-ছি খেলা, এক্কা-দোক্কা খেলা, রান্না-বাড়ি খেলা, পুতুল খেলা, ওপেন্টি বাইস্কোপ খেলা, তালকাটি খেলা, ধাঁধার খেলা ইত্যাদি খেলা উল্লেখযোগ।

গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, লালন শাহ সেতু, ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন, এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, ডাল গবেষণা কেন্দ্র, রেশম বীজাগার, এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম এবং দেশের একমাত্র ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র, বিমান বন্দর।  [মো. শরিফুল আলম]

আরও দেখুন সংশ্লিষ্ট উপজেলা।

তথ্যসূত্র  আদমশুমারি রিপোর্ট ২০০১, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো; পাবনা জেলা সাংস্কৃতিক সমীক্ষা প্রতিবেদন ২০০৭; পাবনা জেলার উপজেলাসমূহের  সাংস্কৃতিক সমীক্ষা প্রতিবেদন ২০০৭।