পল্লী বিদ্যুতায়ন

পল্লী বিদ্যুতায়ন (Rural Electrification)  পল্লী অঞ্চলের সামগ্রিক অবকাঠামো এবং বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। দেশের নীতিনির্ধারকগণ পল্লী বিদ্যুতায়নকে গ্রামীণ খাতে একটি প্রধান কর্মসূচি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ২০২০ সালের মধ্যে দেশের সকল নাগরিকের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। দেশের গ্রামাঞ্চল বিদ্যুতায়িত করার লক্ষ্যে এবং সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া দ্রুততর করার প্রয়োজনে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড অধ্যাদেশ নং এল.আই (১৯৭৭) এর অধীনে ১৯৭৮ সালে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আর.ই.বি) প্রতিষ্ঠিত হয়। অধ্যাদেশ অনুযায়ী ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) কর্তৃক বিদ্যুতায়িত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, নরসিংদী জেলার পৌর এলাকাসমূহ, রাজউক-এর অধীন এলাকা, শিল্পাঞ্চল, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট এবং বরিশাল বিভাগীয় শহর এবং অন্যান্য জেলা শহর, সেনানিবাস ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসমূহ ব্যতিরেকে দেশের অন্য অঞ্চল আর.ই.বি-র এখতিয়ারভুক্ত হয়েছে। সমবায়ের সর্বজনীন নীতিমালার ভিত্তিতে গঠিত আর.ই.বি অধীনস্ত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পি.বি.এস)-সমূহ গণতান্ত্রিক, বিকেন্দ্রীকৃত ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গঠিত হয়েছে, যেখানে সদস্য ভোক্তাগণ সমান সুযোগ এবং সমান অধিকার ভোগ করেন। এই কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনসাধারণ, সরকার এবং দাতা সংস্থাসমূহের অব্যাহত সমর্থন এবং তুলনামূলক বিচারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা সমিতিগুলোর সাংগঠনিক কর্মকান্ড পরিচালনায় উচ্চমান অর্জনে সহায়তা করেছে।

RuralElectrificationBoard.jpg

ভোক্তা সদস্যগণ হলেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিসমূহের মালিক এবং পি.বি.এস ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত পরিচালকমন্ডলীর কাছে তাদের কর্মকান্ডের জন্য দায়ী এবং সামগ্রিকভাবে তা আর.ই.বি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়। আর.ই.বি মূলত সরকার এবং উন্নয়ন সহযোগীদের তহবিল সহায়তায় পরিচালিত। কিছু পি.বি.এস-এর অধিকাংশ গ্রাহক এবং ভোক্তা গৃহস্থালি বিদ্যুৎ সংযোগ নির্ভর হওয়ায় এখনও তারা আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হতে পারে নি। ‘পি.বি.এস রিভলভিং ফান্ড’ নামে একটি তহবিল আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পি.বি.এস সমূহের সহায়তায় গড়া হয়েছে, যাতে অস্বচ্ছল পি.বি.এস গুলি সরকার ও উন্নয়ন সহাযোগীদের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। এই তহবিল দুর্বল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলির পরিচালনা ও সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড অব্যাহতভাবে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে তার কর্মসূচিসমূহ বাস্তবায়নে ব্যাপক সমর্থন ও বিপুল পরিমাণ সহায়তা পেয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বিদ্যুৎ সমবায় সংস্থা ১৯৭৮ সালে পল্লী বিদ্যুতায়ন কর্মসূচির জন্য সম্ভাব্যতা জরিপ পরিচালনা করে। এই জরিপের পরই যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউ.এস.এইড) বাংলাদেশের পল্লী বিদ্যুতায়ন কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে ৫৪টি থানা (উপজেলা) বিদ্যুতায়িত করার লক্ষ্যে ১৩টি পি.বি.এস-এর অধীনে বিদ্যুৎ বিতরণ ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে ৭৯.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিল সরবরাহ করে। সেই থেকে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ইউ.এস.এইড এবং দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বিপুল পরিমাণ সহায়তা প্রদান অব্যাহত রয়েছে। দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক তহবিল যোগানদাতাদের মধ্যে ইউ.এস.এইড, কে.এফ.এইড, আই.ডি.এ, জে.ডি.আর.জি (জাপান), ও.ই.সি.এফ (জাপান), আই.ডি.পি, ওপেক, সিডা, এস.এফ.ডি, এডিবি, নোরাড ও ফিনল্যান্ড, সৌদি আরব, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস এবং চীন সরকারের সহায়তা উল্লেখযোগ্য।

১৯৬০-এর দশকের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াট-এ উন্নীত হলেও বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে। দেশে এখন প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন ২,৮০০ মেগাওয়াট (ফেব্রুয়ারি ২০০১ অবধি সর্বোচ্চ উৎপাদিত বিদ্যুৎ-এর রেকর্ড ২,৮২৩ মেগাওয়াট) হলেও এর প্রায় ২০% আর.ই.বি ব্যবহার করে। আর.ই.বি-র বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ার প্রধান উৎস বিউবো। আর.ই.বি-র চাহিদার প্রায় ৩৫% সরবরাহ করে ডেসা (ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষ)। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, বিউবো ও ডেসা-র কাছ থেকে ৩৩ কেভি পর্যায়ে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা যথাক্রমে ১.৮৪ এবং ১.৯৯ টাকা হারে সরবরাহ নেয়। দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ ঘাটতি দেশের অর্থনীতির জন্য ক্রমবর্ধমান হারে মারাত্মক দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। সবচেয়ে বেশি চাহিদার সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ ঘাটতি প্রায় নিয়মিত ঘটনা এবং পল্লী অঞ্চলের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা এ সময় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়। গত এক দশকে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ চাহিদা গড়ে বার্ষিক ১৯% হারে বৃদ্ধি পাওয়া অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ এখন সবচেয়ে বেশি চাহিদার সময় এর পরিমাণ ৭০০ মেগাওয়াট ধরলে ২০০৭ সাল নাগাদ তা বেড়ে প্রায় ১,৬০০ মেগাওয়াট-এ উন্নীত হবে। উপরন্তু আরও শত শত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা এবং হাজার হাজার গ্রাহক বিউবো এবং ডেসা-র এখতিয়ারভুক্ত হবে। বর্তমানে আর.ই.বি পল্লী অঞ্চলে বছরে আরও ১০,০০০ থেকে ১১,০০০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে যাতে আরও অধিক সংখ্যক গ্রাহক তাদের সরবরাহ পেতে পারে।

ফেব্রুয়ারি ২০০১ থেকে দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে ৬৭টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। সরকার আর.ই.বি-র মাধ্যমে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকান্ড সমন্বয় করছে। আর.ই.বি প্রধানত বিউবো এবং ডেসার কাছ থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত মূল্যে (বিভিন্ন পি.বি.এস-এ বিভিন্ন মূল্যে) ৭ (সাত) ধরনের ভোক্তাকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। উল্লিখিত সাত ধরনের গ্রাহকের কাছে আর.ই.বি গড়ে ৩ (তিন) টাকা প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা হারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। আর.ই.বি দেশের ৪২৪টি উপজেলায় ৬৭টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে মোট ১,২২,৫৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন এবং ৩১,০০,০০০ সংযোগের সাহায্যে প্রধানত গ্রাম পর্যায়ে তিন কোটি (৩,০০,০০,০০০) মানুষকে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করেছে।

পি.বি.এস-এর গ্রাহক তালিকায় রয়েছে গৃহস্থালি, ছোট ও বড় শিল্প, বাণিজ্যিক, সেচ, রাস্তা ও স্টেশন আলোকিত করার সুযোগ ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক। পি.বি.এস সমূহের জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং বিউবো-র সরবরাহ ব্যবস্থাকে সহায়তার লক্ষ্যে আর.ই.বি ‘ইনডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস’ বা আইপিপি সমূহের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ১৯৯৮ সালের মে মাসে আর.ই.বি একটি পৃথক বিদ্যুৎ উৎপাদন ডাইরেক্টরেট স্থাপন করেছে। পি.বি.এসসমূহ ও তাদের গ্রাহকবৃন্দের সুবিধার্থে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প উন্নয়নের লক্ষ্যে এই ডাইরেক্টরেট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আর.ই.বি-র রুরাল পাওয়ার কোম্পানি (আর.পি.সি) নামে অধীনস্থ আইপিপি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা এবং ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে ১৪০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার গ্যাস নির্ভর বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করেছে। এই প্রকল্প ১৯৯৯ সালের এপ্রিল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং তা ২.১৫ টাকা প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা হারে বিউবো-র কাছে সরবরাহ করছে। আর.পি.সির শম্ভুগঞ্জ বিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদন ক্ষমতা ২১০ মেগাওয়াট-এ উন্নীত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ও পাঁচটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির যৌথ মালিকানায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আর.পি.সি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আর.ই.বি সাভার, নরসিংদী ও কুমিল্লায় নির্মাণাধীন ৩টি ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন আইপিপি-র (একটি কেন্দ্র ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে) সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আরও ৮টি পিবিএস অঞ্চলে ৮টি অতিরিক্ত ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আইপিপি উৎপাদনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এই সকল আইপিপি ‘নির্মাণ, মালিকানা স্বত্ব ও পরিচালনার’ ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রিত হবে। আইপিপি সমূহের উৎপাদিত বিদ্যুৎশক্তি আর.ই.বি প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা ১.৬১ থেকে ১.৮০ টাকা হারে (বেস লোড) কিনবে।

জাতীয় গ্রীড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ গ্রহণ ছাড়াও নরসিংদী জেলার নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর অধীনে করিমপুর ও নাজিরপুর ইউনিয়নের মতো দূরবর্তী ও বিচ্ছিন্ন মেঘনা নদীর দ্বীপ অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে সৌর ফটোভোল্টাইক সেল-এর সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আর.ই.বি উদ্যোগ নিয়েছে। এই ইউনিয়নগুলি জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রীড থেকে অনেক দূরবর্তী এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় ৬.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ফরাসি অনুদান এবং ২ কোটি ৬৩ লক্ষ টাকার স্থানীয় সহযোগিতার অধীনে গৃহীত পাইলট প্রজেক্টের সৌর ফটোভোল্টাইক সিস্টেমের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এই কর্মসূচির অধীনে বিভিন্ন ধরনের ১,০০০ সদস্যের জন্য সৌর বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

নরসিংদী সৌর ফটোভোল্টাইক পাইলট প্রজেক্ট দেশে প্রথম এই জাতীয় প্রকল্প এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশে সৌর ফটোভোল্টাইক সিস্টেমস-এর আর্থ-সামাজিক ও কারিগরি সম্ভাবনা পরীক্ষা করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যেহেতু গ্রামীণ নেটওয়ার্ক তুলনামূলকভাবে কম গ্রাহক ঘনত্বের হয়, সে কারণে পিবিএস-এর এখতিয়ারভুক্ত এলাকার কিছু কিছু দূরবর্তী অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন সম্প্রসারণ জটিল ও আর্থিক বিবেচনায় অলাভজনক। তদুপরি দুর্গম এবং স্বল্প সংখ্যক গ্রাহকের কিছু দূরবর্তী এলাকার জন্য গ্রীড নেটওয়ার্ক পৌঁছার কথা নয়। এজাতীয় দূরবর্তী এলাকার জন্য, বিশেষত সকল অঞ্চলের ও বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক গ্রুপের মানুষের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিবেচনায় নবায়ণযোগ্য শক্তি সরবরাহ প্রকল্প লাভজনক কারিগরি বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আর.ই.বি সক্রিয়ভাবে সৌর ফটোভোল্টাইক সিস্টেম অর্জন বিবেচনা করছে।

আর.ই.বি-র সরবরাহ এবং রাজস্ব আদায় তৎপরতা এখন অবধি সন্তোষজনক। পি.বি.এস সমূহের রাজস্ব আদায় হার ৯৬% এরও বেশি এবং জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ খাতের ‘সিস্টেম লস’ ৩৫ শতাংশের বিপরীতে পি.বি.এস সমূহের সিস্টেম লস মাত্র ১৬%।  [মুশফিকুর রহমান]