পোল্ট্রি

Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ০৬:৩৫, ১২ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

পোল্ট্রি  মাংস, ডিম, পালক, সার, পশুখাদ্য ও ঔষধ তৈরির উপকরণের মত অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান দ্রব্য উৎপাদনকারী গৃহপালিত পাখি। মুরগি, হাঁস, রাজহাঁস, গিনি মুরগি (guinea fowl), কোয়েল (quail), কবুতর, ফেজেন্ট (pheasants), এবং টার্কি সাধারণত পোল্ট্রি পাখি হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব পাখি আবদ্ধ পরিবেশে প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি করতে পারে। গৃহপালিত মুরগি, Gallus domesticus-এর পূর্ব পুরুষ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উদ্ভুত লাল বুনো মুরগি (red jungle fowl) Gallus gallus বলে মনে করা হয়। ধারণা করা হয় যে, খাদ্যের জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দী বন্য বুনো মুরগি শিকারের পর মানুষ সম্ভবত ৪,০০০ বছরেরও অনেক পূর্বে মুরগিকে গৃহপালিত করে। প্রাচীন ভারতে সূর্য দেবতাকে উৎসর্গকৃত ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও এসব মুরগি ব্যবহূত হতো। সম্ভবত তখন পূর্ব-এশিয়ার মধ্য দিয়ে মুরগি বিস্তার লাভ করে এবং খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১,০০০ বছর আগে পারস্যে পৌঁছায় এবং তাদের প্রাচীন ধর্মে ভূমিকা রাখে।

গৃহপালিত গিনি মুরগির উদ্ভব হয়েছে আফ্রিকার শিরস্ত্রাণযুক্ত (helmeted) গিনি মুরগি (Numida meleagris) থেকে। জানা যায় যে, সুদানের দক্ষিণাঞ্চল ও পশ্চিম-আফ্রিকার দুটি স্থানে এদের প্রথমে গৃহপালিত করা হয়েছিল, তবে সময়কাল সম্পর্কে স্থির হওয়া যায় নি। প্রাচীনকালে গ্রীক ও রোমানদের কাছে গিনি মুরগি খুব পরিচিত ছিল। অবশ্য, প্রায় সকল আধুনিক গিনি মুরগি সম্ভবত পর্তুগিজদের নিয়ে আসা পশ্চিম-আফ্রিকান উপ-প্রজাতি N.m. galeata থেকে উদ্ভুত। মুরগি গৃহপালিত হওয়ার সময় থেকে গিনি মুরগিও গৃহপালিত হয়েছে বলে প্রতিয়মান হয়। প্রাচীনকাল থেকে এটি স্বীকৃত যে, গৃহপালিত হাঁস, বুনো হাঁস (mallard) Anas platyrhynchos থেকে উদ্ভুত। বন্য ও গৃহপালিত হাঁসে খুব কম পার্থক্য দেখা যায়, তারা মুক্তভাবে নিজেদের মধ্যে প্রজনন ঘটায় এবং সংকরগুলি সম্পূর্ণ প্রজননক্ষম। গৃহপালিত টার্কির উদ্ভব হয়েছে একটি ম্যাক্সিকান উপ-প্রজাতি থেকে। গৃহপালিতকরণের কোন নির্দিষ্ট স্থান ও সময় জানা যায় নি।

স্থানীয় জাতের মুরগির মাংস ও ডিমের উৎপাদনশীলতা যথেষ্ট কম হওয়ার কারণে বাংলাদেশে বর্তমানে উন্নতজাতের ছোট বড় হাঁস-মুরগি খামার প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এসব উন্নত জাতের পাখির মধ্যে রয়েছে সাদা লেগহর্ন, রোড আইল্যান্ড রেড, প্লাইমাউথ রক, অ্যাসেল, ওয়াইনডট ইত্যাদি। স্থানীয় জাতের তুলনায় এসব পাখি আকারে বড় এবং ওজনও হয় প্রায় ৪ কেজি। সাদা লেগহর্ন বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এবং এ জাতের একটি মুরগি বছরে প্রায় ২৩০টি ডিম দিতে পারে। বাংলাদেশে কোয়েলের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। এই ছোট পাখি, যার ওজন হয় মাত্র প্রায় ১৫০ গ্রাম, বছরে প্রায় ২০০ ডিম দিয়ে থাকে।

বাংলাদেশে ২০০৫ সালে মোট পোল্ট্রি পাখির সংখ্যা ছিল প্রায় ১৮ কোটি ৮৩ লক্ষ। দেশে বর্তমানে বার্ষিক প্রায় ৫৩৬ কোটি ৯০ লক্ষ ডিম উৎপন্ন হয়।  [শফিউদ্দিন আহমেদ]

রোগ (Poultry diseases) Avian tuberculosis Mycobacterium tuberculosis ঘটিত হাঁস-মুরগির একটি ব্যাক্টেরিয়াজনিত রোগ। রোগটি খুবই ব্যাপক, তবে যেসব সাধারণ খামার ও বাড়িতে দীর্ঘকাল হাঁস-মুরগি প্রতিপালিত হচ্ছে সেখানেই এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। আধুনিক হাঁস-মুরগি খামারে রোগটির প্রকোপ কম, কারণ সেখানে পাখি সাধারণত দু’বছরের বেশি সময় রাখা হয় না। দেশি মোরগ-মুরগি, টার্কি ও গিনি ফাউল এই জীবাণু দ্বারা সহজে আক্রান্ত হয়, কিন্তু হাঁসে সচরাচর সংক্রমণ কম। তিন থেকে ছয় মাস বয়সের বাচ্চাদের মধ্যে এই রোগপ্রবণতা বেশি। রোগটি বাংলাদেশের হাঁস-মুরগি খামারের জন্য তেমন কোন হুমকি নয়। শীতকালে মাঝে মধ্যে যক্ষ্মার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়, রোগ ধীরে ধীরে বাড়ে এবং আক্রমণের অনেকদিন পর মুরগি মারা যায়। কখনও কখনও আক্রান্ত মুরগির দেহের ওজন কমে যায় এবং সেটি খুঁড়িয়ে হাঁটে।

কক্সিডিওসিস (Coccidiosis) Eimeria গণের কতিপয় প্রজাতির প্রোটোজোয়া দ্বারা সংক্রামিত এক রোগ। অন্তত সাতটি প্রজাতির মধ্যে E. tenella প্রধানত বাংলাদেশে কক্সিডিওসিস রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী। এ রোগে পাখিগুলি ঝিমিয়ে পড়ে, খাওয়া বন্ধ করে এবং বিষ্ঠায় রক্ত দেখা যায়। আক্রান্ত পাখির মৃত্যু হার যথেষ্ট বেশি।

মুরগির কলেরা (Fowl cholera) Pasteurella নামের ব্যাকটেরিয়াঘটিত মুরগির মারাত্মক  সংক্রামক রোগ। এটি হিমোরেজিক সেপটিসেমিয়া নামেও পরিচিত। বাংলাদেশে মাঝে মধ্যে এ রোগের মড়ক দেখা দেয়। তিন থেকে ছয় মাস বয়সী মুরগিরাই অধিক আক্রান্ত হয়। রুগ্ন পাখি দ্বারা দূষিত মাটি, খাদ্য ও পানির মাধ্যমে রোগটি ছড়ায়।

মুরগির পক্ষাঘাত (Fowl paralysis) হাঁস-মুরগির ভাইরাস ঘটিত রোগ। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। বাংলাদেশে ৩-৮ মাস বয়সী পাখিদেরই পক্ষাঘাতে অধিক আক্রান্ত হতে দেখা যায়। কিন্তু তিন সপ্তাহের বেশি, এমনকি এক বছর বয়সী ব্রয়লারও এতে আক্রান্ত হয়ে থাকে। স্থানীয় জাতের মুরগির এই রোগপ্রবণতা কম। আক্রান্ত পাখিকে এক বা দু’পায়ে খোঁড়াতে দেখা যায়। কখনও কখনও একটি বা দুটি ডানা ঝুলে পড়ে। মৃত্যুহার বিভিন্ন, কিন্তু  ৬-৮ মাস বয়সীদের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশের বেশি হতে পারে। শীতকালেই এ রোগের প্রাদুর্ভাব অধিক।

পাখির বসন্ত (Fowl pox) মুরগির ভাইরাসজনিত ব্যাধি। এর লক্ষণ অাঁচিলের মতো গন্ডিকা বা নড্যুল, যা নানা আকারের হতে পারে। কোনটি শিমের দানা আবার কোনটি এর চেয়ে অপেক্ষাকৃত কিছুটা বড় হয়ে থাকে। গন্ডিকাগুলি মুরগির ঝুঁটি, চোখের পাতা এবং নাকের ও কানের ছিদ্রের প্রবেশ পথে বা মাথার অন্যান্য অংশে তৈরি হয়। বাংলাদেশে সচরাচর শীতকালে রোগটির প্রাদুর্ভাব ঘটে। অপেক্ষাকৃত বয়স্ক পাখির তুলনায় কম বয়সী পাখি এই রোগে বেশি ভুগে। মৃত্যুহার খুব একটা উল্লেখ করার মতো নয়।

পাখির টাইফয়েড '(Fowl typhoid) গৃহপালিত পাখির রক্তদূষণজনিত ব্যাধি। এর আক্রমণ তীব্র এবং এতে মৃত্যুহার অধিক। রোগের কারণ Bacillus (= Salmonella) gallinarum ব্যাকটেরিয়া। আক্রান্ত পাখির মল দ্বারা দূষিত খাদ্য ও পানির মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে এ রোগের সংক্রমণ ঘটে। বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে এর প্রাদুর্ভাব বেশি। মৃত্যুর হার শতকরা ২০-৮০ ভাগ।

গেপ রোগ (Gapes)  Syngamous trachea নামের ক্ষুদে গোল কৃমিঘটিত মুরগিছানার রোগ। কৃমিটি হাঁস-মুরগির শ্বাসনালী, ক্লোমনালী ও ক্লোমনালিকায় থাকে। এই কৃমির কর্মকান্ডের ফলে শ্লেষ্মা উৎপাদনসহ শ্বাসনালীর স্ফীতি ঘটে আর বাতাস ঢোকার দরুন শ্লেষ্মা ফেনায় পরিণত হয়। আক্রান্ত পাখি মুখ হাঁ করে থাকে, হিস হিস শব্দে শ্বাস ফেলে, মাথা ঝাঁকায় এবং গলা লম্বা করে রাখে। বাংলাদেশে খামারের হাঁস-মুরগির বাচ্চাদের মধ্যে গেপ রোগ বহুদৃষ্ট হলেও মৃত্যুহার খুব বেশি নয়।

গামবোরো রোগ (Gumboro disease) খামারে হাঁস-মুরগির ভাইরাসঘটিত একটি মারাত্মক রোগ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেলওয়ারের একটি শহরের নামানুসারে এই রোগের নাম, যেখানে রোগটি প্রথম ধরা পড়ে। সাধারণত ৩-৪ সপ্তাহের ব্রয়লার মুরগি এতে আক্রান্ত হয়। বর্তমানে পৃথিবীর সব দেশেই রোগটির প্রাদুর্ভাব ঘটে। ঢাকা ও শহরতলিতে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিপুল সংখ্যক মুরগিছানা সম্ভবত গামবোরো রোগেই মারা গেছে। সংক্রমণ একবার শুরু হলে ৪-৭ দিন বয়সী প্রায় ৭০% বাচ্চাই আক্রান্ত হতে পারে। মৃত্যুহার ৫০ শতাংশের অধিক। সংক্রমিত খাদ্যের মাধ্যমে রোগটি দ্রুত ছড়ায়। রোগের প্রধান লক্ষণ এবড়োখেবড়ো পালকসহ মারাত্মক ডায়রিয়া।

রানিখেত (Newcastle disease)  মুরগির একটি তীব্র ভাইরাসরোগ। দৃশ্যত মুরগির প্লেগের মতো হলেও এটি পৃথক ও অনাক্রম্যতানুসারে (immunologically) সুচিহ্নিত আরেকটি ভাইরাসজনিত রোগ। ১৯২৬ সালে ইংল্যান্ডের নিউক্যাসে্লস্ অঞ্চলে প্রথম শনাক্ত হওয়ার জন্যই এই নামকরণ। রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হাঁচি, কাঁশি, জবুথবু অবস্থা, অতঃপর কাঁপুনি, পাক-খাওয়া, পড়ে-যাওয়া, মাথা ও গলা মোরানো বা সম্পূর্ণ পক্ষাঘাত। সকল ব্রয়লার মোরগ এই রোগপ্রবণ হলেও ৩-৮ সপ্তাহ বয়সীরাই বেশি আক্রান্ত হয়। মৃত্যুহার ৮০-১০০%। প্রধান লক্ষণ হলুদ-সাদা রঙের চুনের মতো দুর্গন্ধযুক্ত উদরাময়। আরেকটি বিশিষ্ট লক্ষণ মুখে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস নেওয়া।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এই রোগের প্রকোপ অত্যধিক এবং মোরগমড়কের প্রধান হেতু। আক্রান্ত ডিম-পাড়া মুরগির ডিমের সংখ্যা ও মান দ্রুত হ্রাস পায়। চিকিৎসার জন্য এখন টীকা পাওয়া যায়।  [শফিউদ্দিন আহমেদ এবং মো. জহিরুল করিম]

পরজীবী (Poultry parasites)  বাংলাদেশের হাঁস-মুরগির প্রচুর পরজীবী শনাক্ত করা হয়েছে, আর এগুলির বেশির ভাগই সন্ধিপদ ও চ্যাপ্টা-কৃমির দলভুক্ত। Argus persicus এক জাতের এঁটেল, থাকে মুরগির খোয়ার ও খামারঘরের চিড় ও ফাটলে। এ পরজীবী হাঁস-মুরগির অনিদ্রা ও রক্তাল্পতা ঘটায়, উৎপাদন ক্ষমতা কমায় এবং এদের মধ্যে  স্পাইরোকিটোসিস ও রিকেটসিয়ার মতো রোগ ছড়ায়।

Goniodes dissimilis, Goniocotes gallinae, Lipeurus caponis, L. lawrensis, Menopon gallinae, Menacanthus stramineus, M. pellidulus উকুনরা হাঁস-মুরগির ত্বকের উপরিভাগে বাস করে এবং চুলকানি, ওজন-হ্রাস, দুর্বলতা, ডিম-পাড়ার ক্ষমতাহানি, এমনকি ছানাদের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।

বাংলাদেশে হাঁস-মুরগির প্রধানত ১২ প্রজাতির কৃমির (Ascaridia galli, Heterakis gallinarum, Capillaria annulata, C. columbae, Acuaris spiralis, Amoebotaenia sphenoides, Hymenolepis carioca, Raillietina tetragona, R. echinobothrida, R. cesticillus, Echinostoma revolutum এবং Catatropis verrucosa) মধ্যে A. galli ও Raillietina প্রজাতিগুলি আর্থিক দিক থেকে ক্ষতিকর রোগ ঘটায়।

Raillietina গণের তিনটি প্রজাতির মধ্যে R. echinobothrida সর্বাধিক মারাত্মক। এতে সংক্রমণের স্থান অত্যধিক ফুলে ওঠে। গ্রামীণ পরিবেশে এই পরজীবী বেশি দেখা যায়। [মো. জহিরুল করিম]