আতিকুল্লাহ, খাজা

Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ০৭:০০, ১৫ জুন ২০১৪ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

আতিকুল্লাহ, খাজা (১৮৭৬-১৯৪৫)  একজন জনহিতৈষী ও ইহজাগতিকতাবাদী ব্যক্তি। তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সমুন্নত রাখেন এবং উদার ও প্রগতিশীল ভাবধারায় পরিপুষ্ট ছিলেন। নওয়াব খাজা আহসানুল্লাহ এর (১৮৪৬-১৯০১) তৃতীয় পুত্র আতিকুল্লাহ ১৮৭৬ সালের ২৬ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন এবং ইংরেজ শিক্ষকদের নিকট উদারনৈতিক শিক্ষাগ্রহণ করেন। ইংরেজির পাশাপাশি তিনি ফারসি ও উর্দু ভাষায়ও বেশ ব্যুৎপত্তি লাভ করেন।

খাজা আতিকুল্লাহ

খাজা আতিকুল্লাহ তাঁর জনহিতৈষী কাজের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। দেশে শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতির জন্য তিনি মুক্তহস্তে দান করেন। তিনি ১৯১১ সালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ডে এক হাজার টাকা দান করেন। তিনি তাঁর পরহিতকর কাজের জন্য প্রায়ই ঋণ করতেন। তাঁর পিতা অসংখ্য জনপ্রিয় জনহিতৈষীমূলক কাজ করেন এবং তাঁর নামও এরূপ একটির সঙ্গে যুক্ত। আতিকুল্লাহর বিবাহ অনুষ্ঠানকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য নওয়াব ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর ঢাকা শহরকে বিদ্যুতায়িত করতে চার লক্ষ টাকা দান করেন।

খেলাধুলা, শিকার, কবিতা এবং সংগীত প্রিয় আতিকুল্লাহ তাঁর নামানুসারে প্রতিষ্ঠিত হকি টুর্নামেন্টকে সংগঠিত করার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। তাঁর জীবিতকালে এ টুর্নামেন্ট নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হতো, এমন কি তাঁর মৃত্যুর পরও তা বেশ কয়েক বছর অব্যাহত থাকে। তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বেহালা বাজাতে পারতেন। সমাজপ্রিয় ও অমায়িক প্রকৃতির আতিকুল্লাহ প্রায়ই তাঁর দিলকুশা গার্ডেনস্থ বাসভবনে গানের আসর জমাতেন এবং লক্ষ্ণৌ ও অন্যান্য স্থান থেকে কাওয়াল ও সংগীত শিল্পীদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসতেন। ঢাকার বিখ্যাত ব্যক্তিগণ এসব সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন।

এসব অনুষ্ঠান ঢাকার অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ, তৎকালীন নানা প্রকার সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে পারস্পরিক আলাপ আলোচনা ও ভাববিনিময়ের বড় সুযোগ করে দেয়।

তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, তিনি উদার ও প্রগতিশীল ভাবধারা অনুসরণ করতেন। তিনি দৃষ্টিভঙ্গিতে ছিলেন ইহজাগতিক এবং সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে। ঢাকার নওয়াব পরিবারের অল্প যে কজন সদস্য ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ নীতিসমূহ সমর্থন করতেন তাদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি এ সংগঠনের সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেন। তাঁর ভাই নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহ অবশ্য প্রবল আবেগে ও জোরালোভাবে বঙ্গভঙ্গ সমর্থন করেন।


খাজা আতিকুল্লাহ ঢাকা এবং প্রদেশের অন্যান্য স্থানে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী সভায় সভাপতিত্ব করেন। তিনি ১৯০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভারত সরকারের নিকট বঙ্গভঙ্গ পুনর্বিবেচনার জন্য স্মারকপত্র প্রদান করেন।

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের (১৯০৬) কলকাতা অধিবেশনে আতিকুল্লাহ বঙ্গভঙ্গ বাতিলের প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেন যে, পূর্ববাংলার মুসলমানদের সকলেই বঙ্গভঙ্গের পক্ষে নয়। হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে তিনি সৈয়দ আহমদ খানের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, মুসলমান এবং হিন্দুসম্প্রদায় ভারতের দুটি চোখের মতো।

বঙ্গভঙ্গ রদ (১২ ডিসেম্বর ১৯১১) ভারতের মুসলমানদের প্রচন্ডভাবে হতাশ করে এবং সলিমুল্লাহ বিষয়টি বিবেচনা এবং তাদের অনুভূতি প্রচারার্থে ১৯১১ সালের ৩০ ডিসেম্বর বাংলার নেতৃস্থানীয় মুসলমানদের এক সভা আহবান করেন। অন্যান্যদের মধ্যে ব্যারিস্টার আবদুর রসুল এবং খাজা আতিকুল্লাহ এ সভায় যোগদান করেন। এ দুজন বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করলেও তাঁরা পরবর্তীসময়ে উপলব্ধি করেন যে, বঙ্গভঙ্গ পূর্ববঙ্গ এবং আসামের মুসলমানদের এমন কিছু বিরল সুযোগ, বিশেষ করে, শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রদান করে যা পূর্বে অস্বীকার করা হয়েছিল। এ সভায় খাজা আতিকুল্লাহ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে সিলেটের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করেন। এ প্রস্তাব সিলেটের ভাষা, ভূমিব্যবস্থা ইত্যাদির বিবেচনায় সম্পূর্ণভাবে বাস্তবসম্মত ছিল।

খাজা আতিকুল্লাহ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কংগ্রেসের একজন বিশ্বস্ত ও একনিষ্ঠ অনুসারীই ছিলেন।

১৯৪৫ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে খাজা আতিকুল্লাহর ঘটনাবহুল জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।  [সুফিয়া আহমেদ]