হেপাটাইটিস


হেপাটাইটিস  অভিধানিক অর্থে যকৃতের সবধরনের প্রদাহ বুঝালেও সাধারনভাবে ভাইরাসজনিত যকৃতের প্রদাহ বুঝাতেই এ শব্দটি ব্যবহূত হয়ে থাকে। এ ধরনের ভাইরাসের কয়েকটির সংক্রমণের মূল কেন্দ্র যকৃৎ। এগুলি প্রাথমিক হেপাটাইটিস ভাইরাস, আর এগুলিই প্রায় ৯৫% ক্লিনিক্যাল হেপাটাইটিসের কারণ। দেহের অন্য কোন অঙ্গতন্ত্রে সংক্রমণের ফল হিসেবে যেসব ভাইরাসে লিভার আক্রান্ত হয় সেগুলিকে দ্বিতীয় পর্যায়ের হেপাটাইটিস ভাইরাস বলে, যেমন ইয়োলো ফিভার  ভাইরাস, সাইটোমেগালোভাইরাস, এপস্টিন-বার ভাইরাস, হার্পেস সিমপে­ক্স ভাইরাস, ভেরিসেলা-জোস্টার ভাইরাস ও হাম ভাইরাস, রুবেলা কক্সস্যাকি বি ভাইরাস, রক্তক্ষরা ভাইরাস (ডেঙ্গু) এবং অ্যাডিনো ভাইরাস।

পৃথিবীতে প্রতি বছর কোটি কোটি লোক হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়। জন্ডিসের লক্ষণ হলো রক্তে অত্যধিক বিলিরুবিনসহ শরীরের পাংশু বা হলদে আভা, কিছু লিভার উৎসেচকের অধিক সক্রিয়তা ও সেসঙ্গে বমি, ক্ষুধামন্দা ও জ্বর। কিন্তু অনেকগুলি হেপাটাইটিসে এসব লক্ষণ দেখা যায় না এবং যেগুলি শনাক্তির জন্য নির্দিষ্ট পরীক্ষা আবশ্যক। এই ধরনের লক্ষণহীন ভাইরাস আক্রান্ত লোকের সংখ্যাও যথেষ্ট এবং তারা এই রোগ বিস্তারের একটা বড় উৎস।

হপাটাইটিস সি ভাইরাস

কয়েক ধরনের হেপাটাইটিস ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলি হলো হেপাটাইটিস এ ভাইরাস (HAV), হেপাটাইটিস বি ভাইরাস (HBV), হেপাটাইটিস সি ভাইরাস (HCV), হেপাটাইটিস ডি ভাইরাস (HDV), হেপাটাইটিস ই ভাইরাস (HEV), হেপাটাইটিস জি ভাইরাস (HGV) ও হেপাটাইটিস এফ ভাইরাস (HFV)। তবে, হেপাটাইটিসে হেপাটাইটিস এফ ভাইরাসের ভূমিকা এখনও নিদানিকভাবে প্রমাণিত হয় নি। এসব ভাইরাসের মধ্যে হেপাটাইটিস এ ভাইরাস, হেপাটাইটিস ই ভাইরাস ও হেপাটাইটিস এফ ভাইরাস খাদ্যনালি (মুখ) পথে, আর অন্যগুলি প্রধানত সংক্রমিত রক্ত, অশোধিত ও সংক্রমিত সিরিঞ্জ ও অন্যান্য চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ব্যবহার ও অরক্ষিত যৌনসঙ্গমে দেহে প্রবেশ করে। তাই যারা শিরার মধ্য (intravenous) দিয়ে নিয়মিত ঔষধ গ্রহণ করেন তাদের মধ্যে এসব ভাইরাস সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ও হেপাটাইটিস সি ভাইরাস জীবাণু যকৃতের দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণ এবং এসব রোগীর লিভারের ক্যানসার হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কাও থাকে।

হেপাটাইটিস বি ভাইরাস সংক্রমণ একটি মারাত্মক রোগ এবং এ রোগসমস্যা বিশ্বব্যাপী। একটি পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে যে পৃথিবীতে এই ভাইরাসে অতীতে ও বর্তমানে আক্রান্ত লোকের সংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি এবং প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ তাদের রক্ত ও যকৃতে এগুলির স্থায়ী বাহক। সারা বিশ্বে ৬০-৮০% প্রাথমিক লিভার ক্যানসারের জন্য এই ভাইরাসটিই দায়ী।

বাংলাদেশে কতক ভাইরাসঘটিত, বিশেষত হেপাটাইটিস বি ভাইরাসজনিত হেপাটাইটিস রোগীর নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৭.৫%, অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি মানুষ বি ভাইরাসের বাহক। এদের মধ্যে একাংশের কোন রোগলক্ষণ থাকে না, কেউ কেউ দীর্ঘস্থায়ী রোগের শিকার হয়। অনেকেই অজ্ঞাত কারণে ভাইরাসের নিয়ন্ত্রিত বংশবৃদ্ধির দরুন আজীবন সুস্থ থাকে। আক্রান্ত প্রায় ৭৫ শতাংশের হেপাটাইটিস বি ভাইরাস তেমন উপসর্গ প্রদর্শন করে না এবং ২৫% লোকের মধ্যে জন্ডিস দেখা দেয়। লিভারের আকস্মিক নিষ্ক্রিয়তার দরুন প্রায় ১% রোগীর ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস আরও জটিল হয়ে ওঠে। কোন কোন ক্ষেত্রে তীব্র পর্যায়েও রোগটি ধীরে ধীরে দীর্ঘস্থায়ী পর্যায়ে রূপ নেয়।

হেপাটাইটিসে আক্রান্ত যকৃত

বাংলাদেশে প্রায় ৫০% শিশুর রক্তে হেপাটাইটিস এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি রয়েছে, অর্থাৎ তারা ইতিপূর্বে একবার সংক্রমিত হয়েছে। দেশে ভাইরাসঘটিত তীব্র হেপাটাইটিসের প্রধান কারণ হলো হেপাটাইটিস ই ভাইরাস। সংক্রমিত খাদ্য ও পানির মাধ্যমে এই দুটি ভাইরাস মুখের মধ্য দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে।

বিশ্ব সমস্যা হিসেবে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের পরেই হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের স্থান। গোটা পৃথিবীতে আনুমানিক প্রায় ১৮০ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস সি ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত এবং প্রায় ১৭ কোটি মানুষ এই ভাইরাসের স্থায়ী বাহক, যাদের লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি রয়েছে। এসব তথ্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে রোগটির গুরুত্ব প্রকাশ করে। বাংলাদেশে হেপাটাইটিস রোগের প্রায় ৩% হেপাটাইটিস সি ভাইরাস সংক্রমিত।

পর্যবেক্ষণের সুযোগ না থাকায় অন্যান্য হেপাটাইটিস ভাইরাস সংক্রমণ বাংলাদেশে নিয়মিতভাবে শনাক্ত করা হয় না, তবে এসব রোগের ঘটনাও গুরুত্বহীন তা বলা যাবে না। তীব্র হেপাটাইটিসসহ যেসব রোগী জন্ডিসে আক্রান্ত তাদের ভাইরাস সময় সময় বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। গত ২০০০ সালে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে সংক্রমণে রয়েছে সর্বাধিক হেপাটাইটিস ই ভাইরাস, তারপর হেপাটাইটিস বি ভাইরাস, হেপাটাইটিস এ ভাইরাস ও হেপাটাইটিস সি ভাইরাস।

বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ও হেপাটাইটিস সি ভাইরাস সংক্রমণে রক্তসংভরণ (blood transfusion) ও অস্ত্রোপচারের উলে­খযোগ্য ভূমিকা রয়েছে আর তা ঘটে রক্ত সঠিকভাবে স্ক্রিনিং না করার কারণে ও অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি নির্বীজনের অভাবে।  [জিয়া উদ্দিন আহমেদ]