হেজেস, স্যার উইলিয়ম


হেজেস, স্যার উইলিয়ম (১৬৩২-১৭০১)  বাংলায়  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যকুঠির প্রথম গভর্নর। ১৬৮১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলায় কোম্পানির বিনিয়োগ মাদ্রাজ থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। কোম্পানির ব্যবসা বাণিজ্যের অব্যাহত অগ্রগতি এবং কোম্পানি বিষয়ক ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে  কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স বাংলার জন্য ফোর্ট সেন্ট জর্জ-এর নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি আলাদা সংস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে ১৬৮২ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ছয় সদস্যবিশিষ্ট ‘Council of Bay’ নামে একটি নির্বাহী কমিটি গঠন এবং উইলিয়ম হেজেস-কে বেঙ্গল এজেন্সির প্রথম গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। বাংলার প্রধান বন্দর হুগলি থেকে Council of Bay এর কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়। তবে কোম্পানির উপসাগরীয় বিষয়ে হেজেস কোন প্রকার অগ্রগতি দেখাতে ব্যর্থ হন। কারণ তিনি ইংল্যান্ড থেকে আগত প্রাইভেট ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে প্রচন্ড বাধার সম্মুখীন হন। তিনি মুগল সরকারকেও এসকল অবৈধ ব্যবসায়ীদের বাংলায় ব্যবসায়ের সুযোগ না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। যেহেতু অবৈধ ব্যবসায়ীরা সরকারকে উচ্চহারে শুল্ক দিত, কাজেই গভর্নরের অনুরোধে তাদের বহিষ্কার করার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ মুগল সরকারের নিকট ছিল না।  শাহ সুজা কর্তৃক জারিকৃত  নিশানএর (১৬৫১) মাধ্যমে কোম্পানিকে যে সকল সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয়েছিল তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য মুগল সরকারকে প্রভাবিত করতেও তিনি ব্যর্থ হন। শাহ সুজার নিশানে যে সকল কর মওকুফ করা হয়েছিল সেসবের দাবিতেও সরকারি কর্মকর্তারা কোম্পানির ব্যবসায়ে প্রায়শ বাধার সৃষ্টি করত।

উইলিয়ম হেজেস-এর ডায়েরীর প্রচ্ছদ

সরকারি কাজ পরিচালনায় উইলিয়ম হেজেস একজন কুশলী প্রশাসকের পরিচয় দিতে পারেন নি। অচিরেই তিনি Council of Bay এর সদস্যদের বৈরী করে তোলেন। তাঁরা সকলে পৃথকভাবে হেজেস সম্পর্কে কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স-এর নিকট লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। কোর্ট শেষ পর্যন্ত তাঁকে বরখাস্ত করে এবং ১৬৮৩ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে Council of Bay এর বিলুপ্ত ঘোষণার মাধ্যমে বাংলায় কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব আবার মাদ্রাজের ফোর্ট সেন্ট জর্জ-এর অধীনে ন্যস্ত করে। এভাবেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেঙ্গল এজেন্সির স্বাধীন মর্যাদার অবসান ঘটে। হেজেস অবশ্য কোর্টকে তাঁর একটি পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করেন যা কোম্পানির পরবর্তী উন্নয়নে দীর্ঘস্থায়ী অবদান রেখেছিল। তিনি বাংলায় ইংরেজ বসতি হুগলি থেকে আরও সুবিধাজনক স্থানে সরিয়ে নিয়ে একটি সুরক্ষিত বসতি স্থাপন করে কোম্পানির বিনিয়োগ শত্রুদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য পরামর্শ দেন। কোর্ট হেজেসের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে হুগলি থেকে কলকাতায় বসতি স্থানান্তর এবং ১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে সেই বসতিকে দুর্গ দ্বারা সুরক্ষিত করা হয়। বস্ত্তত এই পদক্ষেপই বাংলায় কোম্পানির শাসনের ভিত্তি স্থাপন করে।

কোম্পানির গভর্নর হিসেবে ব্যর্থ হলেও স্যার উইলিয়ম হেজেস তাঁর বিখ্যাত ডায়েরির জন্য ইতিহাসে একজন খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিগণিত। তিনি অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে ভারতে তাঁর জীবন কাহিনী ও অভিজ্ঞতা ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করেন। তাঁর ডায়েরি পরবর্তী সময়ে হেনরি ইউল কর্তৃক সম্পাদিত হয়ে ‘Diary of William Hedges’ শিরোনামে তিন খন্ডে প্রকাশিত হয় (১৮৭৭-৭৯)। এই ডায়েরি থেকে মুগল আমলে বাংলার ইতিহাস এবং ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রাথমিক ইতিহাস পুনঃনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তাঁর ভারতীয় জীবনের ব্যর্থতা ভালোভাবেই পুষিয়ে যায় ইংল্যান্ডে তাঁর সাফল্যের মাধ্যমে। ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘নাইট’ উপাধিতে সম্মানিত হন, ১৬৯৩ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনের শেরিফ এবং ১৬৯৪ খিস্টাব্দে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড-এর পরিচালক নিযুক্ত হন। ৬ আগস্ট ১৭০১ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়ম হেজেসের মৃত্যু হয়।  [সিরাজুল ইসলাম]