হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন


হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এইচডিএফ)  বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। এটি কোম্পানি আইনের আওতায় জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক ১৯৯৩ সালের ২৯ নভেম্বর তারিখে নিবন্ধন লাভ করে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এইচডিএফ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সমাজকল্যাণমূলক বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছে। এইচডিএফ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং মননশীলতার উন্নয়নসহ যে কোনো ধরনের মানবীয় উদ্যোগে অংশগ্রহণ করে থাকে। এই সংস্থা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দারিদ্র্য দূরীকরণ, গবেষণা, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের প্রশিক্ষণ প্রদান, পুনর্বাসন এবং প্রকাশনা ইত্যাদি বিষয়গুলিকে এর উন্নয়ন কর্মকান্ডের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে।

১৯৮৩ সালে আন্তর্জাতিক ব্যাংক বিসিসিআই (ব্যাংক অব কমার্স অ্যান্ড ক্রেডিট ইন্টারন্যাশনাল)-এর বাংলাদেশ শাখা এদেশ থেকে অর্জিত মুনাফার কিছু অংশ সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার উদ্দেশ্যে বিসিসি ফাউন্ডেশন নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। দেশের কয়েকজন বরেণ্য সমাজসেবী ও শিক্ষাবিদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততায় বিসিসি ফাউন্ডেশন ধীরে ধীরে তার সমাজসেবামূলক কর্মকান্ড প্রসারিত করে। ওই সব কর্মকান্ডের অন্যতম ছিল ‘মেধালালন প্রকল্প’। কিন্তু ১৯৯১ সালে এদেশে বিসিসিআই ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে এই প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। আইনগত জটিলতার কারণে গভীর অর্থ সংকটে পড়ে বিসিসি ফাউন্ডেশন। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মেধালালন প্রকল্পে সম্পৃক্ত অনেক দরিদ্র মেধাবী ছাত্রছাত্রীর লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় এবং ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কর্মকান্ডের সুবিধাভোগী কিছু উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীরও প্রাপ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।

এমতাবস্থায়, ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আলমগীর এম.এ কবির, ড. আবদুল্লহ আল-মুতী শরফুদ্দিন প্রমুখ ফাউন্ডেশনের কর্মকান্ড টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে যোগাযোগ শুরু করেন। অতঃপর কতিপয় অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী ব্যক্তির সক্রিয় সহযোগিতা ও সহায়তায় ১৯৯৪ সালের জুলাই মাসে যাত্রা শুরু করে হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন। তাঁরা বিসিসি ফাউন্ডেশনের স্থগিতপ্রায় কার্যক্রমগুলি এই নতুন সংস্থার তত্ত্বাবধানে সক্রিয় করে তোলেন। বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় এতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে।

হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কার্যক্রমকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমভাগে রয়েছে নিজস্ব কিছু কার্যক্রম, আর অপর ভাগে রয়েছে যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত কার্যক্রমসমূহ। নিজস্ব কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ‘মেধালালন প্রকল্প’ ও ‘পল্লী স্কুল পাঠাগার উন্নয়ন প্রকল্প’। যৌথ উদ্যোগের ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগী নির্বাচনের মাধ্যমে কর্মকান্ড পরিচালনা করা হয়। যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত কার্যক্রম নির্বাচনের ক্ষেত্রে ফাউন্ডেশন সাধারণত অবহেলিত অথচ দেশ ও সমাজের জন্য কল্যাণকর বিষয়গুলিকেই প্রাধান্য দেয়। যেমন বিসিএসআইআর উদ্ভাবিত ‘উন্নত চুলা’ জনপ্রিয়করণ বিষয়ক কার্যক্রম, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বৃক্ষ-প্রেম সৃষ্টি তথা সার্বিকভাবে গাছপালা পরিচর্যার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ‘নার্সারি প্রকল্প’, অবহেলিত কিংবা পরিত্যক্ত বৃদ্ধ পিতা-মাতাদের সহায়তা সংশ্লিষ্ট প্রকল্প, সৌরশক্তির প্রয়োজনীয়তা এবং ব্যবহার সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, দৃষ্টিহীন এবং পঙ্গু ব্যক্তিদের পুনর্বাসন সংক্রান্ত প্রকল্প, প্রাক-প্রাথমিক শিশু শিক্ষা, অন্ত্যজ জনগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তাদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা, নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিবার ও সমাজে তাদের নীতিনির্ধারণী ভূমিকাকে জোরদার করা। এছাড়াও প্রয়োজনীয় বিষয়ভিত্তিক ব্যবহারিক শিক্ষা সংক্রান্ত প্রকল্পসহ নানাবিধ প্রকল্প এই ফাউন্ডেশন বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে আসছে।

মেধালালন প্রকল্প এইচডিএফ পরিচালিত সমাজসেবামূলক প্রকল্পগুলির অন্যতম হলো মেধালালন প্রকল্প (Talent Assistance Scheme (TAS)। প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আর্থিক দিক দিয়ে অস্বচ্ছল, মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের সুদমুক্ত ঋণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে সহায়তা করা এবং কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের পথ সুগম করা। প্রতিবছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় নির্দিষ্ট মান নিয়ে উত্তীর্ণ আর্থিকভাবে অসচ্ছল কিছুসংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে এই প্রকল্পের অধীনে স্নাতক ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত পড়াশোনা অব্যাহত রাখার জন্য ‘সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ’ প্রদান করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সুদূর পল্লী অঞ্চল থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। এ ঋণ শিক্ষা সমাপ্তির পর সহজ কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য। শিক্ষাঋণ প্রদানের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের ফাউন্ডেশন থেকে বই, খাতা এবং অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ কেনার জন্য প্রতিবছর অফেরতযোগ্য অর্থ অনুদান হিসেবে প্রদান করা হয়ে থাকে। ছাত্রছাত্রীদের সুপ্ত সুকুমার বৃত্তির এবং সমাজ ও দেশের প্রতি তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলার জন্য প্রকল্পটির আওতায় পাঠক্রম বহির্ভূত কার্যক্রম চালু আছে। ‘দেশ আমাকে কি দিয়েছে’, এ কথাটি না ভেবে, ‘আমি দেশকে কি দিয়েছি’, ছাত্রছাত্রীদের মনে এ কথাটিই গ্রোথিত করার চেষ্টা প্রকল্পটির সকল কর্মকান্ডের মাধ্যমে নেয়া হয়ে থাকে। ১৯৮৫ সাল থেকে চালু হওয়া এ প্রকল্পের মাধ্যমে এ পর্যন্ত মোট ৮৯৮ জন ছাত্রছাত্রীকে শিক্ষাঋণ দেয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই এখন সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভে সক্ষম হয়েছে।

পল্লী স্কুল পাঠাগার উন্নয়ন প্রকল্প পল্লী অঞ্চলে অবস্থিত স্কুলগুলির ছাত্রছাত্রীদের মাঝে পাঠক্রম বহির্ভূত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলে তাদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে এবং ওই সকল স্কুলে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার গড়ে তুলতে তৎকালীন বিসিসি ফাউন্ডেশন ১৯৮৬ সালে প্রকল্পটি চালু করে। পরবর্তীকালে এইচডিএফ প্রতিষ্ঠার পরও এটি অব্যাহত রয়েছে এবং সম্প্রসারিত হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ফাউন্ডেশন পল্লী অঞ্চলের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলিতে নিয়মিত বই সরবরাহ করা ছাড়াও এসব স্কুলের লাইব্রেরির দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের জন্য লাইব্রেরিয়ানশিপের মৌলিক ধারণা দেয়ার জন্য সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। এ প্রকল্পের অধীনে প্রতি বছর ১০০টি গ্রামীণ স্কুল সহায়তা পেয়ে থাকে। প্রতিটি স্কুলকে ৫ বছরের জন্য প্রকল্পভুক্ত করা হয়। একবার প্রকল্পভুক্ত হবার পর একটি স্কুল একটানা ৫ বছর সহায়তা পেয়ে থাকে। প্রতি বছর যে কয়টি স্কুল তাদের ৫ বছর মেয়াদ শেষ করে তাদের প্রকল্প থেকে বাদ দেয়া হয় এবং সমসংখ্যক নতুন স্কুল কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় যাতে ১০০টি স্কুল লাইব্রেরি অবিরতভাবে এ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। প্রকল্পটি ১৯৮৬ সালে শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৩৫২টি স্কুল সহায়তা পেয়েছে।

ফাউন্ডেশনের আর্থিক কর্মকান্ড পরিচালিত হয় নিজস্ব তহবিল থেকে যা বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তায় গঠিত। উক্ত ফান্ড বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মেয়াদি জামানত হিসেবে গচ্ছিত থাকে। এসব জামানত থেকে মুনাফা হিসেবে প্রাপ্ত অর্থ দিয়েই এইচডিএফ দীর্ঘদিন ধরে এর কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

সংগঠনের যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালিত হয় একটি সাধারণ পরিষদ ও একটি নির্বাহী পরিষদের মাধ্যমে। গঠনতন্ত্র অনুসারে সংগঠনের সাধারণ পরিষদের সদস্যদের মধ্য থেকে একটি নির্বাহী পরিষদ গঠিত হয় যার সর্বোচ্চ সদস্য সংখ্যা ১১ জন। বর্তমানে ফাউন্ডেশনে ২২ সদস্যবিশিষ্ট একটি সাধারণ পরিষদ এবং ৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি নির্বাহী পরিষদ কার্যকর রয়েছে। নির্বাহী পরিষদের মেয়াদকাল ২ বছর।

ফাউন্ডেশনের কর্মকান্ড সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য কয়েকটি সাব কমিটি রয়েছে। এসব কমিটির প্রধান ও সদস্য নির্বাচিত হন সাধারণ ও কার্যকরী পরিষদের সদস্যদের মধ্য থেকে। এসব কমিটির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে TAS Committee, Project Appraisal Committee (PAC), Pay & Services Committee, Purchase Committee। এসব কমিটির গৃহীত সিদ্ধান্ত নির্বাহী পরিষদের সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে।  [তাসনিম হাসান হাই]