হাশেমী, সৈয়দ জালালউদ্দিন


হাশেমী, সৈয়দ জালালউদ্দিন (১৮৯৪-১৯৪৭)  রাজনীতিক, কৃষক নেতা। জালালউদ্দিন হাশেমী ১৮৯৪ সালে খুলনা জেলার সাতক্ষীরা মহকুমার তেতুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। একজন স্ব-শিক্ষিত ব্যক্তি হাশেমী বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তাঁর একটা দৈহিক অসুবিধা ছিল। যৌবনে দুর্ঘটনায় তাঁর একটি পা খোয়া যায়। ফলে তিনি কাঠের পায়ের সাহায্যে হাঁটাচলা করতেন।

হাশেমী কয়েক বছর বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সদস্য ছিলেন। একজন রাজনীতিক হিসেবে তিনি কৃষকশ্রেণীর স্বার্থ রক্ষায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি কৃষকশ্রেণীর অধিকার আদায় ও কল্যাণের লক্ষ্যে সংগ্রাম করেন এবং কৃষকদের একজন অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। তিনি অসহযোগ এবং আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং একাধিকবার কারাবরণ করেন। রাজনৈতিক মতাদর্শে জালালউদ্দিন হাশেমী হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে বিশ্বাসী ছিলেন এবং পৃথক নির্বাচন পদ্ধতির মধ্যেই তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যকার অনৈক্যের বীজ দেখতে পান।

১৯২৯ সালে খুলনার মুসলিম নির্বাচনী এলাকা থেকে স্বরাজ্য দলের সমর্থনে হাশেমী বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি আইনসভার ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। ১৯৩১ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি সুভাষ বসুর উপর লাঠি চার্জের বিরোধিতা করে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৪১ সালে হলওয়েল মনুমেন্ট ধ্বংসের জন্য সুভাষ বসু যে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন হাশেমী সে আন্দোলন সমর্থন করেন। ভগবৎ সিং, রাজগুরু এবং সুখদেবের মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে হাশেমী মূলতবী প্রস্তাব আনয়ন করেন।

১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে সাতক্ষীরা পল্লী মুসলিম নির্বাচনী এলাকা থেকে কৃষক প্রজা পার্টির প্রার্থী হিসেবে জালালউদ্দিন হাশেমী নির্বাচনে জয়লাভ করেন। তিনি কৃষক প্রজা পার্টির জন্মলগ্ন থেকেই এ দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। কংগ্রেস এবং কৃষক প্রজা পার্টির একটি সমঝোতায় পৌঁছানো এবং নির্বাচনের পর সরকার গঠনের ব্যর্থতায় জালালউদ্দিন চরমভাবে হতাশাগ্রস্ত হন।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিলুপ্তি এবং কৃষকদের অধিকার পুনরুদ্ধারের একজন দৃঢ় প্রবক্তা ছিলেন হাশেমী। তিনি ১৯৩৮ সালে বঙ্গীয় আইনসভায় জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি দাবি করে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। আইনসভায় জমিদারদের স্বার্থের অনুকূল সমর্থকের প্রাধান্যের কারণে তাঁর প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়।

১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জালালউদ্দিন হাশেমী প্রগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টির প্রার্থী হিসেবে এবং কংগ্রেসের সমর্থনে বঙ্গীয় আইনসভার ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন।

স্যার আজিজুল হক ব্রিটেনে ভারতীয় হাইকমিশনার পদে নিযুক্তি লাভের পর ১৯৪২ সালের ২৭ এপ্রিল স্পিকার পদ থেকে পদত্যাগ করলে জালালউদ্দিনকে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার নিয়োগ করা হয়। তিনি এক বছর এ পদে নিয়োজিত ছিলেন।

মহাত্মা গান্ধী ১৯৪৩ সালে কারাগারে অনশন শুরু করলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় গান্ধীকে অনশন ভঙ্গের অনুরোধ করে আইনসভায় একটি প্রস্তাব আনয়ন করেন। আইনসভায় ইউরোপীয় সদস্যদের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে জালালউদ্দিন এ প্রস্তাবের ওপর আলোচনার সুযোগ দেন। ১৯৪৩ সালের ৫ জুলাই হাশেমী প্রবল চাপ অগ্রাহ্য করে ভূতপূর্ব মুখ্যমন্ত্রী .কে ফজলুল হক এবং মন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ, সন্তোষ কুমার বসু, প্রমথনাথ ব্যানার্জী ও শামসুদ্দীন আহমদকে তাদের পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করে আইনসভায় বক্তব্য দেয়ার অনুমতি প্রদান করেন।

১৯৩৬-৩৭ এবং ১৯৩৯-৪০ সালে জালালউদ্দিন হাশেমী কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচিত কাউন্সিলর ছিলেন। একজন কাউন্সিলর রূপে এখানেও তিনি তুখোড় বক্তা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন এবং সাম্প্র্দায়িকতাবাদের প্রবল বিরোধিতা করে যৌথ নির্বাচনের সপক্ষে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন।

১৯৪৬ সালে যখন সারা বাংলায় মুসলিম লীগের প্রতি সমর্থনের ঢেউ বয়ে যাচ্ছিল, তখনও তিনি তাঁর নিজ নির্বাচনী এলাকা সাতক্ষীরা থেকে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং হেরে যান। তিনি কলকাতার করায়া রোডে নিজ বাসভবনে ১৯৪৭ সালের ৯ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।  [দিলীপ ব্যানার্জী]