হার্ডিঞ্জ সেতু


হার্ডিঞ্জ সেতু (Hardinge Bridge)  রেলপথ সংযোজিত একটি ইস্পাত নির্মিত সেতু। সেতুটির ইস্পাত নির্মিত কাঠামো পূর্বে নির্মিত হয়ে পরে মূল সেতুটি সংযোজিত হয়েছে এবং তৎকালীন ভারতের ভাইসরয় মহামান্য লর্ড হার্ডিঞ্জ-এর নামে সেতুটির নামকরণ করা হয়। সেতুটি পাকশি ও ভেড়ামারা স্টেশনের মধ্যবর্তী সারা নামক স্থানে গঙ্গার নিম্নতম প্রবাহের উপর নির্মিত। এটি খুলনা থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথকে সংযুক্ত করেছে।

হার্ডিঞ্জ সেতু

হার্ডিঞ্জ সেতু নির্মাণের প্রস্তাব উঠা ও এ সংক্রান্ত আলোচনাই চলেছে বিশ বছরের অধিক সময় ধরে। সেতুটি নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রাপ্তি ঘটে ১৯০৮ সালে। ১৮৮৯ সালে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ রাজ্য রেলপথ সেতুটি নির্মাণের প্রস্তাব করে। প্রস্তাবটির কার্যকারিতা ও বাস্তবায়ন যোগ্যতা সরেজমিনে বিচার বিবেচনা করে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। ১৯০২ সালে স্যার এফজেই স্প্রিং সেতুর উপর একটি বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্ত্তত করেন। এসময়ে অনেক আলোচনাই হয়েছিল সেতুটির স্থান নির্বাচন নিয়ে এবং ১৯০৭ সালে একটি কমিটি সারাহ নামক এলাকায় বাণিজ্যিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে সেতু নির্মাণের প্রস্তাব করে, যা স্যার স্প্রিং-এর আনুকূল্য লাভ করে।

১৯০৮ সালে একটি কারিগরি কমিটি নিয়োগ করা হয়। এই কমিটি সেতুর বর্তমান স্থান সারার সন্নিকটে সেতু নির্মাণ করা যেতে পারে বলে মতামত পেশ করে। সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয় ১৯১০ সালে এবং ১৯১২ সালে নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়। এখানে উলে­খ করা প্রয়োজন যে, ব্রিটিশ প্রকৌশলী স্যার রবার্ট জেইলস সেতু নির্মাণকালে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন। ১৯১৫ সালের ১ জানুয়ারি পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম ট্রেনটি নিম্নমুখে (অর্থাৎ খুলনা অভিমুখে) সেতুটি অতিক্রম করে এবং একই বৎসরের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঊর্ধ্বমুখে (অর্থাৎ পার্বতীপুর অভিমুখে) দ্বিতীয় পরীক্ষামূলক ট্রেনটি সেতু অতিক্রম করে। শেষাবধি ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ লর্ড হার্ডিঞ্জ সেতুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। সেতুটির নির্মাণ কর্মকান্ডে সর্বমোট ২৪,০০০ লোক নিয়োগ করা হয়েছিল।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সেতুর বারতম স্প্যানটি মর্টারের আঘাতে ভেঙ্গে নদীতে পতিত হয়। স্প্যানটির এক প্রান্ত ভিত্তি স্তম্ভের সাথে বিপজ্জনকভাবে ঝুলছিল এবং অপর প্রান্তের ১২.১৯ মিটার দীর্ঘ অংশ ধ্বংস হয়েছিল। ১৫তম স্প্যানের একটি ক্রুজগার্ডার এবং দুটি স্ট্রিগার এবং দ্বিতীয় ভিত্তিস্তম্ভের উপরে ইস্পাত ট্যাসেলও মর্টারের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর সেতুটি পুনরায় চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়। সেতুটি মেরামতের কাজ বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং ভারতের ইস্টার্ন ইন্ডিয়া রেলওয়ে যৌথভাবে সম্পন্ন করে। তবে সে সময় সেতুর কিছু অংশের পরিবর্তন এবং আধুনিকায়ন প্রয়োজন ছিল। সেতুটির ক্ষেত্রে সর্বমোট ব্যয় হয়েছিল ৩ কোটি ৫১ লক্ষ ৩২ হাজার ১ শত ৬৫ টাকা।

সেতুটি গঠিত হয়েছে ১৫টি ইস্পাত কাঠামো ভিত্তিক স্প্যান নিয়ে, যার প্রতিটির কেন্দ্র থেকে অপরটির কেন্দ্রের দৈর্ঘ্য ৩৪৫ ফুট ১১/২ ইঞ্চি (৩০৮ ফুট-১১/২ ইঞ্চি স্প্যানের দৈর্ঘ্য)। হার্ডিঞ্জ সেতুতে ব্যবহূত মূল ইস্পাতের ধরনটি নমনীয় ইস্পাত, যা বিএস ৪৩৬০-এর গ্রেড ৪৩-এর সমতুল্য চাপ ধারণ ক্ষমতা ২০.৮ টন/বর্গইঞ্চি। চূড়ান্ত প্রসারণ ক্ষমতা ৩০.৬ টন/বর্গ ইঞ্চি ২৩% সম্প্রসারণে। এর রাসায়নিক গঠন কার্বন- ০.১০%, সিলিকন- ০.১১%, Mr/০.৭১%, সালফার- ০৯.০৪১% এবং p- ০.০১৩%। মূল নকশা অনুসারে সেতুটির ভার বহন ক্ষমতা ১,৯২৭ টন।

সেতুর সর্বমোট দৈর্ঘ্য ১.৮ কিমি। castioar ধরনের ১৬টি সেতুধারক স্তম্ভ রয়েছে, যা কনক্রিট কিউব দিয়ে তৈরি। সেতু স্তম্ভের পানির স্তরের উপরের একটি অংশ ইস্পাতের তৈরি। পাশাপাশি দুটি ব্রডগেজ লাইন সেতুর উপর সংযুক্ত হয়েছে এবং সেতুর ভাটির দিকে রয়েছে একটি আলাদা পায়ে চলা পথ। উচ্চ বিদ্যুৎ ভোল্টেজ বাহী বৈদ্যুতিক তার চলে গেছে সেতুর উজান পার্শ্ব দিয়ে। সেতুর head roomটি কাঠামোগত বিন্যাসে মেঝে স্তর থেকে ৬.৭১ মিটার উচ্চে। যমুনা বহুমুখী সেতু কর্তৃপক্ষের (জেএমবিএ) সেতুটির নবায়নের একটি পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ভারি ও হালকা যানবাহন  সেতুটি দিয়ে চলাচল করতে পারে।  [সিফাতুল কাদের চৌধুরী]