হাবিবুল্লাহ, খাজা


হাবিবুল্লাহ, খাজা (১৮৯৫-১৯৫৮)  ঢাকার নওয়াব, রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবী। ১৮৯৫ সালের ২৬ এপ্রিল ঢাকার নওয়াব বাড়িতে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতা এবং পিতামহের নাম যথাক্রমে নওয়াব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ ও নওয়াব স্যার খাজা আহসানুল্লাহ। খাজা হাবিবুল্লাহ বাল্যকালে দার্জিলিং-এর সেন্ট পল স্কুলে এবং পরে ইংল্যান্ডের সেন্ট ভিন্সেন্ট ও ইস্টবোর্ণে শিক্ষালাভ করেন।

খাজা হাবিবুল্লাহ

১৯১৫ সালে পিতার মৃত্যুর পর জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে তিনি ঢাকার খাজা পরিবারের কর্তৃত্ব ও নওয়াব উপাধি লাভ করেন। ১৯১৮ সালে তিনি ব্রিটিশদের পক্ষে বিশ্বযুদ্ধে বাঙালি পল্টনে যোগ দেন এবং অবৈতনিক লেফটেন্যান্ট হিসেবে মেসোপটেমিয়ার যুদ্ধাঞ্চলে গমন করেন। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোর্ট, ঢাকা জেলা বোর্ড ও মিউনিসিপ্যালিটির সদস্য। ১৯১৮ সালের এপ্রিল মাসে তাঁর সভাপতিত্বে ঢাকায় ‘আঞ্জুমান-ই-ইসলামিয়া’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকার পঞ্চায়েত প্রধানরূপে মহল্লার সর্দারদের ওপর তাঁর ব্যাপক প্রভাব ছিল। ১৯২৬ ও ১৯৩০ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকালে ঢাকার শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার্থে তিনি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের লোকদের নিয়ে শান্তি কমিটি গঠন করেন এবং অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন। নওয়াব হাবিবুল্লাহ  খিলাফত আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯১৯ সালের ২০ ডিসেম্বর  আহসান মঞ্জিল এ তাঁকে সভাপতি করে প্রথম ঢাকা খিলাফত কমিটি গঠিত হয়। ১৯২০ সালের ২ মার্চ তিনি আহসান মঞ্জিলে মওলানা শওকত আলী এবং  আবুল কালাম আজাদকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। ওই মাসেই তিনি মিরাটে অনুষ্ঠিত খিলাফত কমিটির সভায় সভাপতিত্ব করেন। খিলাফত আন্দোলন সমর্থন করলেও নওয়াব হাবিবুল্লাহ ব্রিটিশদের বিরোধিতা করতে চাননি।

এ ছাড়া শিক্ষায় মুসলিমদের পশ্চাৎপদতার কথা বিবেচনা করে তিনিও ফজলুল হকের ন্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পক্ষপাতি ছিলেন না। নওয়াব হাবিবুল্লাহ ১৯১৮-১৯ সালে সংস্কারকৃত প্রথম কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ছিলেন এবং ১৯২৪ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত ঢাকা শহর থেকে নির্বাচিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ছিলেন।

ভারত শাসনে বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার মানসে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩২ সালে কম্যুনাল অ্যাওয়ার্ড প্রস্তাব পাস করে। হিন্দু মহাসভা এর বিরোধিতা করে কিন্তু খাজা হাবিবুল্লাহ এবং মুসলিম নেতৃবৃন্দ একে স্বাগত জানান। কম্যুনাল অ্যাওয়ার্ডকে সমর্থন করে ১৯৩৫ সালের ২৪ মার্চ দিল্লিতে মুসলিমদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় নওয়াব হাবিবুল্লাহ সভাপতিত্ব করেন।

তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সভাপতি এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের কার্যনির্বাহি কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৩৬ সালের ২৫ মে নওয়াব হাবিবুল্লাহর নেতৃত্বে কলকাতায় ইউনাইটেড মুসলিম লীগ গঠিত হয়। পরে এটি অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের অঙ্গীভূত হয়। তিনি ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি থেকে মুসলিম লীগের প্রার্থীরূপে ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ছিলেন। ১৯৩৬ সালে তিনি  মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি বোর্ডের সভাপতি মনোনীত হন। ১৯৩৭ সালে  এ.কে ফজলুল হকের মন্ত্রিসভার সদস্য নওয়াব হাবিবুল্লাহ কৃষি ও শিল্প মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি উক্ত কেবিনেটে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ও শিল্প দপ্তরের মন্ত্রী এবং ১৯৪০-৪১ সালে জনস্বাস্থ্য ও শিল্পদপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৪০ সালের ডিসেম্বরে জিন্নাহর নির্দেশে মুসলিম লীগ সদস্যগণ মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলে ফজলুল হক অন্যান্য সদস্যের সহায়তায় দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা গঠন করেন। নওয়াব হাবিবুল্লাহ লীগ নেতার নির্দেশ অমান্য করে কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রীরূপে উক্ত মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। ফলে তিনি ৫ বছরের জন্য লীগ থেকে বহিষ্কৃত হন এবং ১৯৪৬ সালে পুনরায় লীগে যোগ দেন। ১৯৪৬ সালে  হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রিসভা ক্ষমতায় থাকাকালেও তিনি ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ছিলেন।

জিন্নাহর নির্দেশ অমান্য করে ফজলুল হকের কোয়ালিশন মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ায় নওয়াব হাবিবুল্লাহর জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়। ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি ঢাকার মুসলিম আসন থেকে প্রাদেশিক পরিষদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে লীগ প্রার্থী খাজা খায়রুদ্দীনের নিকট পরাজিত হন এবং ব্রাহ্মণবাড়ীয়া নির্বাচনী এলাকায় তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। তবে  পাকিস্তান গণপরিষদ বাতিল হওয়ার আগে তিনি এর সদস্য নিযুক্ত হয়েছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হন।

নওয়াব হাবিবুল্লাহ তাঁর পূর্ব পুরুষদের ন্যায় বিচক্ষণ ও অধ্যবসায়ী ছিলেন না। তাঁর আমলে ঢাকা নওয়াব এস্টেট সরকারের কোর্ট অব ওয়ার্ডসের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং নওয়াব একটি সাক্ষিগোপালে পরিণত হন। তাঁর অযোগ্যতার দরুন এস্টেটের ওয়াকফ্কৃত ও খাস জমিগুলিও অব্যবস্থায় পতিত হয়। ফলে আহসান মঞ্জিলের বিলাস বৈভবে ভাটা পড়ে। ইন্দ্রিয়পরায়ণ হাবিবুল্লাহ একাধিক বিয়ে করেন এবং এ কারণে তিনি অনেকের বিরাগভাজন হন।

শেষজীবনে ভগ্নস্বাস্থ্যের দরুন তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেন এবং পৈত্রিক প্রাসাদ আহসান মঞ্জিল ত্যাগ করে পরীবাগে ’গ্রিন হাউসে’ বাস করতে থাকেন। এখানেই ১৯৫৮ সালের ২১ নভেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। বেগম বাজারে নওয়াবদের পারিবারিক গোরস্তানে পিতার কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।  [মোহাম্মদ আলমগীর]