হাইমেনোপটেরান


হাইমেনোপটেরান  Hymenoptera বর্গের সদস্যদের সাধারণ নাম। এ দলে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে অতি পরিচিত হর্নেট (hornet), স-ফ্লাই (saw fly), বোলতা, মৌমাছি, পিঁপড়া এবং তাদের জ্ঞাতি। প্রায় এক লক্ষ প্রজাতির হাইমেনোপটেরানের বর্ণনা হয়েছে, তবে বহু প্রজাতি এখনও শনাক্ত হয় নি।

মানুষের কাছে হাইমেনোপটেরানদের গুরুত্ব অপরিসীম। স-ফ্লাই, ক্যালসিড এবং অধিকাংশ সাইনিপিড (cynipid) লার্ভা অবস্থায় বিভিন্ন উদ্ভিদের পাতা বা অন্যান্য অংশ খেলেও ইকনিউমোন (ichneumon), বোলতা, ব্রাকোনিডসহ অসংখ্য সদস্য অন্যান্য ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের পরভুক অথবা পরজীবী। তাই ফসলের পেস্ট নিয়ন্ত্রণে এরা জীবজ দমনে (biological control) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া বহু প্রজাতির হাইমেনোপটেরান নানা প্রকার শাকসবজি, ফলমূল ও শস্যের পরাগায়ণে সহায়তা করে।

পৃথিবীর সব উপমহাদেশেই Hymenoptera-এর বাস। তবে এদের বেশি দেখা যায় গ্রীষ্মমন্ডল ও উপগ্রীষ্মমন্ডলীয় দেশসমূহে। স্পষ্ট শিরাবিন্যাসসহ এদের দুজোড়া স্বচ্ছ ডানা থাকে। মুখোপাঙ্গ লেহন অথবা চোষণ-লেহন উপযোগী।

উপবর্গ Apocrita-এর সদস্যে উদরের গোড়ার দিক সংকীর্ণ। এদের সব স্ত্রী পতঙ্গে ডিম্বস্খালক উপস্থিত, যা অনেক সময় হুল হিসেবে কাজ করে। পিঁপড়া এবং মৌমাছিসহ অনেক হাইমনোপটেরান সমাজবদ্ধ জীবন কাটায়। [এস.এম হুমায়ুন কবির]

হাইমেনোপটেরান পরজীবী (Parasitic hymenopteran)  Hymenoptera বর্গভুক্ত পরজীবীর যে-কোন সদস্য। এরা সচরাচর লার্ভা পর্যায়ে পরজীবী এবং প্রাপ্তবয়সে মুক্তজীবী। এরা সর্বদাই তাদের পোষককে মেরে ফেলে, কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে পোষক মৃত্যুর আগে কিছুকাল বেঁচেও থাকে। পরজীবী হাইমেনোপটেরান অন্যতম সুবৃহৎ পতঙ্গদল হলেও সম্ভবত এদের শতকরা প্রায় ৭৭ ভাগ এখনও বর্ণিত হয় নি। এরা ৪৮টি গোত্রে ও ১০টি অধিগোত্রে বিভক্ত। Evanoidea অধিগোত্রে ৩টি গোত্র ও প্রায় ১,০৫০টি প্রজাতি রয়েছে এবং Evaniidae গোত্রের কতক সদস্য আরশোলার ডিমের ক্যাপসুলের পরজীবী। এ গোত্রের ৪০০ প্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে Evania appendigaster শনাক্ত করা হয়েছে। Ceraphronoidea অধিগোত্রের ২টি গোত্রে ৮০০ প্রজাতির পতঙ্গ রয়েছে। বাংলাদেশে ধান ও তুলার একটি করে এ জাতীয় ক্ষতিকর পতঙ্গ নথিভুক্ত হয়েছে। Proctotrupoidea অধিগোত্রের সদস্যরা খুব ছোট, ৩-৬ মিমি; এদের আছে প্রায় ২,৫০০ প্রজাতি। বাংলাদেশের আমবাগানে এদের ১টি প্রজাতি রয়েছে। এরা প্রধানত মাটির গাদা ও পচাকাঠের বাসিন্দা বিভিন্ন বিট্লের উপর পরজীবী, কোনটিকে পিঁপড়ার বাসায়ও দেখা যায়, এরা পিঁপড়া ও মাছির শত্রু।

Platygastroidea অধিগোত্রের বাংলাদেশে ধান, তুলা ও গুদামজাত দানাশস্যের ক্ষতিকর পতঙ্গ থেকে যথাক্রমে ১১টি,  ১টি ও ১টি প্রজাতি শনাক্ত করা গেছে। Cynipoidea অধিগোত্রে আছে প্রায় ৩,০০০ প্রজাতি। বাংলাদেশের আমবাগানে এদের ১টি পরজীবী পতঙ্গ আছে। Chalcidoidea অধিগোত্রভুক্ত পতঙ্গগুলি Chalcid মাছি হিসেবে পরিচিত। সাধারণত এরা আকারে অতি-ক্ষুদ্র এবং এদের আছে ২০ গোত্রে প্রায় ২২,৫০০ প্রজাতি। পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম পতঙ্গ Megaphragma (Trichogrammatidae) এই দলের সদস্য। প্রাপ্তবয়স্ক পতঙ্গটি মাত্র ০.১৮ মিমি লম্বা এবং Thrips-এর ডিমের পরজীবী। বাংলাদেশে ধান, পাট, তুলা, আখ ও দানাশস্যের ক্ষতিকর পতঙ্গ হিসেবে যথাক্রমে ২০টির বেশি, ৬টি, ১৮টি,  ৬টি ও ১৩টি Chalcid প্রজাতির পরজীবী পতঙ্গ শনাক্ত করা হয়েছে। Hymenoptera বর্গের বৃহত্তম গোত্র Ichneumonidae (অধিগোত্র Ichneumonoidea) সাধারণত Ichneumon মাছি হিসেবে পরিচিত। এই গোত্রে পৃথিবী ব্যাপী আনুমানিক ৬০,০০০ প্রজাতির পতঙ্গের মধ্যে ইন্দো-অস্ট্রেলীয় অঞ্চলে আছে প্রায় ২০,০০০ প্রজাতি। Ichneumonidae-এর সাধারণ পোষক হলো শুঁয়াপোকা। বাংলাদেশে ধান, তুলা, আখ ও গুদামজাত দানাশস্যের ক্ষতিকর পতঙ্গ থেকে এদের ২০টি প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে।

Hymenoptera বর্গের দ্বিতীয় বৃহৎ গোত্র Braconidae-র সদস্যরা Braconid মাছি হিসেবে পরিচিত। পৃথিবী ব্যাপী এই গোত্রের ৪০ হাজারেরও বেশি প্রজাতির পতঙ্গ রয়েছে। বাংলাদেশে ধান, পাট, তুলা ও আখের ক্ষতিকর পতঙ্গ থেকে এদের ৩৫টি প্রজাতি নথিভুক্ত করা হয়েছে। কোকিল বোলতা (Cuckoo wasp) নামে পরিচিত Chrysidoidea অধিগোত্রে আছে ৪,৮৯৯টি পরজীবী পতঙ্গ, যারা সবাই নিঃসঙ্গ বোলতা, নিঃসঙ্গ ভ্রমর, স-ফ্লাই ও মথের উপর পরজীবী। বাংলাদেশে ধান, আখ ও গুদামজাত দানাশস্যের ক্ষতিকর পতঙ্গ থেকে যথাক্রমে এদের ৫টি প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। Vespoidea অধিগোত্রের ৫টি গোত্রের সদস্য Coleoptera বর্গের বা মাটিতে বাসা নির্মাণকারী মৌমাছি ও বোলতার উপর পরজীবী হিসেবে থাকে। Sphecidae গোত্রের একটি এবং Pompilidae গোত্রের একটি প্রজাতিকে বাংলাদেশের আখের ক্ষতিকর পতঙ্গের শূককীটের পরজীবী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। ১৯৯২ সালে গাপুদ (Gapud) বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলির পরজীবী হাইমেনোপটেরানদের ১৮২টি প্রজাতির একটি তালিকা তৈরি করেছেন। ভুঁইয়া (১৯৯৯) তাঁর টিকাযুক্ত তালিকায় বাংলাদেশের তিন শতাধিক প্রজাতির পরজীবী হাইমেনোপটেরান অন্তর্ভুক্ত করেছেন।  [মোঃ ইসমাইল মিয়া]

গ্রন্থপঞ্জি VP Gapud, ‘Insect and mite pests of plant crops in Bangladesh and their enemies: a compendium’, USAID/BARC/CHECCI and Co Consulting Inc, 1992; BA Bhuiya (ed), An annotated catalogue of parasitic hymenopteran from Bangladesh, Green Leaf Publishers, London, Dhaka, Chittagong, 1999.