হাইকোর্ট


হাইকোর্ট  ১৮৬১ সালের হাইকোর্টস অ্যাক্ট বলে প্রথম হাইকোর্ট গঠিত হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে কলকাতায় ব্রিটিশরাজের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সুপ্রিম কোর্ট ছিল। বাংলায় বসবাসকারী সব ইউরোপীয় নাগরিক এবং কলকাতার সকল দেশীয় নাগরিক এই সুপ্রিম কোর্টের আওতাভুক্ত ছিল। কোম্পানির বাংলা রাজ্যে সর্বোচ্চ আদালত ছিল সদর আদালত। এর দুটি বিভাগ ছিল সদর দেওয়ানি আদালত ও সদর নিজামত আদালত। সদর আদালত কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব করত। এর বিচারকরা ছিলেন সনদী সিভিল সার্ভিসের সদস্য। এ আদালতের বিচারকরা ইউরোপীয় হলেও যে আইনে বিচারকার্য সম্পন্ন হতো তা অপরিহার্যভাবেই ছিল ভারতীয়। ইউরোপীয়রা সদর আদালতের এখতিয়ার বহির্ভূত ছিল। কলকাতার বাইরের দেশীয় লোকদের ওপরও সুপ্রিম কোর্টের কোন এখতিয়ার ছিল না। ১৮৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে আদালতের এধরনের দ্বৈত এখতিয়ারের অবসান ঘটে এবং ব্রিটিশরাজ ব্রিটিশ ভারতের শাসনভার সরাসরি গ্রহণ করেন।

হাইকোর্ট ভবন, ঢাকা

১৮৬১ সালের হাইকোর্টস অ্যাক্টে ব্রিটিশ ভারতের প্রতিটি প্রেসিডেন্সিতে একটি করে হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা রাখা হয়। সাবেক সুপ্রিম কোর্ট ও সদর আদালতের স্থলে প্রতিষ্ঠিত হয় হাইকোর্ট। এ হাইকোর্টে দেওয়ানি কার্যবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি ও দন্ডবিধি অনুসারে অভিন্ন পদ্ধতিতে বিচারকার্য সম্পন্ন হতো। সমগ্র বাংলা কলকাতা হাইকোর্টের এখতিয়ারভুক্ত ছিল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পরও এ ব্যবস্থা বহাল ছিল। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে প্রত্যেক প্রদেশে একটি হাইকোর্ট এবং কেন্দ্রে একটি ফেডারেল কোর্ট প্রতিষ্ঠার বিধান ছিল।

ভারত বিভাগের পর (১৯৪৭) পাকিস্তান (প্রভিশনাল সংবিধান) আদেশ ১৯৪৭ বলে ঢাকায় একটি হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারত শাসন আইনে (১৯৩৫) ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইনসভার উপর অর্পিত ক্ষমতা ও কার্যাবলি অতঃপর ভারতীয় স্বাধীনতা আইনের অধীনে পাকিস্তান গণপরিষদের ওপর ন্যস্ত হয়। ১৯৩৫ সালের আইনে ব্রিটিশ ভারতের প্রতিটি প্রদেশে একটি হাইকোর্ট স্থাপনের বিধান ছিল। এ আইনই পাকিস্তান (প্রভিশনাল সংবিধান) আদেশে পরিণত হয়। পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায় একটি হাইকোর্ট স্থাপিত হয়। ১৯৫৪ সালে গণপরিষদে ১৯৩৫ সালের আইন সংশোধন করা হয়। সংশোধনীতে বলা হয় যে, প্রত্যেকটি হাইকোর্ট এর আওতাধীন এলাকায় এর এখতিয়ারভুক্ত বিষয়ে যেকোন ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ, এবং প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে প্রদেশের যেকোন সরকারের ওপর হেবিয়াস কর্পাস ধরনের রিটসহ যেকোন রিট, নিম্ন আদালতের প্রতি হুকুমনামা, নিষেধাজ্ঞা, সমন জারিকরণসহ উচ্চ আদালতে রেকর্ডের আবেদন অথবা অনুরূপ যেকোন বিষয়ে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে (ধারা ২২৩এ)। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে প্রদত্ত হাইকোর্টের এখতিয়ার, ক্ষমতা ও কার্যাবলি ১৯৬২ সালে প্রণীত সংবিধানে ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে পাকিস্তানের ফেডারেল ব্যবস্থার অনুরূপ দেশের অন্য কোথাও কোন পৃথক হাইকোর্টের বিধান নেই। বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে যে, আপীল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের সমন্বয়ে বাংলাদেশের জন্য একটি সুপ্রিম কোর্ট (বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট নামে পরিচিত) থাকবে। হাইকোর্ট বিভাগ মূল মামলা, আপীল ও অন্যান্য বিচারকার্য সম্পাদন করবে এবং বাংলাদেশের সংবিধান কর্তৃক এর ওপর অর্পিত বা সময়ে সময়ে অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগ ও কার্যক্রম সম্পন্ন করবে।  [সিরাজুল ইসলাম]