হরকরা, গগন


হরকরা, গগন  বাউল কবি, গায়ক। তাঁর পূর্ণ নাম গগনচন্দ্র দাস; তিনি শিলাইদহের আড়পাড়া গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। তিনি শিলাইদহের পোস্ট-অফিসে ডাক-হরকরার কাজ করতেন। এ পেশার সুবাদেই তিনি লোকের কাছে ‘গগন হরকরা’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।

গগন হরকরা বাউল ধর্মমতের অনুসারী ছিলেন; উদাসী বাউলের মতো চলার পথে আপন মনে গান করতেন। তিনি গীতিকার ও সুকণ্ঠ গায়ক ছিলেন। তাঁর রচিত ‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে।/হারায়ে সেই মানুষে, তার উদ্দেশে দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে \’ কুঠিবাড়িতে গগনের কণ্ঠে এ গানটি শুনে রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ হন।

পরিচয়ের সূত্র ধরে পরে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কণ্ঠে লালনসহ অন্য বাউলের গানও শ্রবণ করেন এবং বাউল সাধনা ও গানের বিষয় নিয়ে গগনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আলোচনা হয়। চিঠি বিলি করার জন্য গগন প্রায়ই রবীন্দ্রনাথের কাছে যেতেন। রবীন্দ্রনাথ আগ্রহের সঙ্গে গগনের কাছে বাউল গান সম্পর্কে জানতে চাইতেন। অনেক দিন সন্ধ্যার পর নির্জনে বোটের ছাদে বসে রবীন্দ্রনাথ গগনের গান গাইতেন। রবীন্দ্র-মানসে এর ফল সুদূরপ্রসারী হয়। তিনি নানা রচনায় এবং দেশে-বিদেশে প্রদত্ত ভাষণে বাউলের উদার ধর্মমতের এবং লালন-গগনের গানের উল্লেখ করেন। বিশেষ করে, ‘মানবধর্ম’ (১৯৩০) প্রবন্ধে তিনি বাউলের মানবতাবাদী দর্শনের ওপর আলোকপাত করেন। রবীন্দ্রনাথ ফ্রান্সে প্রদত্ত An Indian Folk Religion শীর্ষক বক্তৃতায় গগনের উক্ত গানের উদ্ধৃতি দিয়ে  মন্তব্য করেন, ‘The first Baul song, which I chanced to hear with any attention, profoundly stirred my mind.’ পরে মনসুরউদ্দীনের সম্পাদিত হারামণি (১৯৩৬) গ্রন্থের ভূমিকায় গানটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ভূয়সী প্রশংসা করেন। স্বদেশী আন্দোলনের যুগে রচিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ সংগীতের সুরে গগন হরকরার উক্ত গানের প্রভাবে আছে বলে ধারণা করা হয়।

উল্লিখিত গানটি ছাড়াও গগন হরকরার অপর একটি গান, ‘(ও মন) অসার মায়ায় ভুলে রবে/কতকাল এমনিভাবে। এসব ভোজবাজির প্রায়, (মন রে) কেউ কারো নয়/দেখতে দেখতে কোথায় যাবে \’ এ গান দুটিতে গগন হরকরার অন্তর্মুখী চেতনার ও কবি-মনের পরিচয় পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর ও অন্যান্য নাটকে অন্তরচারী ও মুক্তিকামী বাউলের যে পরিচয় পাওয়া যায়, তাতে গগন চরিত্রের ছাপ আছে বলে পন্ডিতগণ মনে করেন। [ওয়াকিল আহমদ]