হক, জিকরুল


হক, জিকরুল (১৯১৪-১৯৭১)  চিকিৎসক, রাজনীতিক, শহীদ বুদ্ধিজীবী। জন্ম ১৯১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে। পিতা ডা. শেখ জেয়ারতউল্লাহ আহম্মদ এবং মাতা খমিউননেসা চৌধুরাণী। জিকরুল হক সৈয়দপুর উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে ১৯৩৩ সালে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৩৯ সালে কলকাতা ক্যাম্বেল মেডিকেল স্কুল থেকে এল.এম.এফ পাস করেন।

জিকরুল হক

জিকরুল হক সৈয়দপুরের দারওয়ারি হাসপাতালের হাজারীহাট দাতব্য চিকিৎসালয়ে অবৈতনিক মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ডাঙ্গারহাট শাহ আব্দুল গফুর চ্যারিট্যাবল ডিসপেনসারীতেও অবৈতনিক মেডিকেল অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে পিতার প্রতিষ্ঠিত জেয়ারতউল্লাহ মেডিকেল হলে চিকিৎসাকর্মে আত্মনিয়োগ করেন।

কলকাতা ক্যাম্বেল মেডিকেল স্কুলে অধ্যয়নকালে তিনি এ.কে ফজলুল হক এবং হোসেন সোহরাওয়ার্দীর সাহচর্যে আসেন এবং দেশ বিভাগের পর তাঁদেরই অনুপ্রেরণায় সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেন। তিনি ১৯৩০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এরপর তিনি মুসলিম লীগে যোগ দেন। জিকরুল হক থানা মুসলিম লীগের সেক্রেটারি ও পরে সভাপতি এবং জেলা মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। ১৯৫৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি যুক্তফ্রন্ট মনোনীত মোহাজের প্রার্থীকে পরাজিত করে আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ষাটের দশকে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনে সৈয়দপুরে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেন।

জিকরুল হক চিকিৎসার পাশাপাশি এলাকায় শিক্ষার উন্নয়ন এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তিনি সৈয়দপুরের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘শিল্প-সাহিত্য সংসদ’-এর সভাপতি ছিলেন। তিনি দীর্ঘকাল সৈয়দপুর উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য এবং স্থানীয় কমার্শিয়াল ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন। সৈয়দপুর মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, ৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ এবং হাজারীহাট পোস্ট অফিস স্থাপনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯৫৮ সালে তিনি সৈয়দপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তানি পতাকা উত্তোলন নিয়ে সৈয়দপুরে বাঙালি ও অবাঙালিদের মধ্যে সংঘষের্র সময় বাঙালিদের অনেকেই জিকরুল হকের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। ২৫ মার্চ কালরাতেই পাক-সেনারা তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। ১২ এপ্রিল পর্যন্ত তাঁকে রংপুর ক্যান্টনমেন্টে অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে আটক রেখে পাক-সেনারা অমানুষিক নির্যাতন চালায়। ওই দিনই সকলকে রংপুর ক্যান্টনমেন্টের কাছে গুলি করে হত্যা করা হয়।

১৯৯৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে বাংলাদেশ সরকারের ডাকবিভাগ ডা. জিকরুল হকের নামে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০০১ সালে ডা. জিকরুল হককে মরনোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।  [তানিয়া রুবাইয়া]