হক, ওবায়েদ-উল


হক, ওবায়েদ-উল (১৯১১-২০০৭) সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক। জন্ম ফেনী শহরে ৩১ অক্টোবর ১৯১১। পিতা বজলুল হক খান ফেনীর আইনজীবী ও বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য। মাতা আঞ্জুমান নেসা।

ওবায়েদ-উল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৪ সালে দর্শন ও মনোবিজ্ঞানে এম এ পাস করেন। ১৯৩৬ সালে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন।

বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে ওবায়েদ-উল হক সার্কেল অফিসার হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।  পরে তিনি কুমিল্লায় ঋণ সালিশি বোর্ড-এর সেটেলমেন্ট অফিসার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক কর্মকান্ডের সঙ্গে তাঁর বিরোধ হওয়ায় তিনি ১৯৪৪ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে লেখালেখিতে মনোযোগ দেন।

ইতোমধ্যে ওবায়েদ-উল হকের গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা, রম্যরচনা প্রভৃতি সওগাত (১৯১৮) মোহাম্মদী (১৯১০) বুলবুল, ছায়াবীথি প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হলে বিদ্বৎসমাজে তিনি পরিচিতি লাভ করেন।

সাহিত্য ছাড়াও চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর একটা স্বাভাবিক আগ্রহ ছিল। কোনো বাঙালি মুসলমান কর্তৃক রচিত তাঁর প্রথম ছবি দুঃখে যাদের জীবন গড়া (১৯৪৬)। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ও মহাযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়। দুঃখে যাদের জীবন গড়া ছবিটির বাণিজ্যিক সাফল্যের জন্য ওবায়েদ-উল হক ‘হিমাদ্রি চৌধুরী’ নাম গ্রহণ করেন। তাঁর অপর ছবি দুই দিগন্ত।

১৯৪৭ সালে তিনি কলকাতা ছেড়ে ফেনীতে চলে আসেন। ১৯৪৯ সালে দি পাকিস্তান অবজারভার প্রকাশিত হয় এবং ওবায়েদ-উল হক পত্রিকাটিতে নিয়মিত কলাম লেখেন। ১৯৫১ সালে তিনি এ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক নিযুক্ত হন। সাংবাদিকতার এ পর্যায়ে এ পত্রিকার তিনি উপসম্পাদক (১৯৫৮-১৯৬২), যুগ্মসম্পাদক (১৯৬২-১৯৭১) এবং স্বাধীনতাত্তোর পর্বে এ পত্রিকার সম্পাদক হন। ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে এ পত্রিকার নামকরণ হয় প্রথমে দি অবজারভার, পরে দি বাংলাদেশ অবজারভার। ১৯৮৪ সালে এ পত্রিকার নাম পরিবর্তন বিষয়ে বিতর্কের সূচনা হলে তিনি পদত্যাগ করেন এবং ১৯৮৬ সালে ডেইলি নিউজ-এর সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৭ সালে এ পত্রিকার সম্পাদনা ছেড়ে দিয়ে তিনি দৈনিক বাংলা ও বাংলাদেশ টাইমস (১৯৭৪)-এর ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ওবায়েদ-উল হক বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট গঠন কমিটির সভাপতি ছিলেন। এ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (১৯৭৬) স্থাপিত হলে তিনি এ প্রতিষ্ঠানের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এডিটরস কাউন্সিলেরও চেয়ারম্যান ছিলেন এবং তার প্রতিনিধি হিসেবে তিনি তিন দফায় প্রেস কাউন্সিল অব বাংলাদেশের সদস্য ছিলেন।

এ ছাড়াও ওবায়েদ-উল হক বাংলাদেশ সংবাদপত্র পরিষদ (বিএসপি)-এর সভাপতি, প্রেস কমিশনের সদস্য এবং জাতীয় চলচ্চিত্র নীতিমালা কমিটির আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর রচিত নাটক—এই পার্কে, দিগ্বিজয়ী চোরাবাজার (১৯৫০), ব্যতিক্রম, রুগ্না পৃথিবী (১৯৬৮), যুগসন্ধি ও সমাচার এই; কাব্যগ্রন্থ—দ্বিধার ফসল, সায়াহ্নের সংলাপ, গরীব হতে চাই ও পথের পদাবলী; উপন্যাস—সংগ্রাম, দ্বৈত সঙ্গীত ও ঢল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তাঁর এই সংগ্রাম উপন্যাস অবলম্বনে পাকিস্তান আমলে ঢাকায় ফজলুল হকের পরিচালনায় ‘আজান’ নামে একটি ছবি নির্মিত হয়। তাঁর ইংরেজি গ্রন্থ Voice of Thunder শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে রচিত। পরে এটি A Leader with a Difference নামে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়।

সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য ওবায়েদ-উল হক বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৪), একুশে পদক (১৯৮৩), ইউনিসেফ স্বর্ণপদক (১৯৮৩), কাজী মাহবুবউল্লাহ ও বেগম জেবুন্নিসা পুরস্কার, জহুর হোসেন চৌধুরী, অতীশ দীপঙ্কর পুরস্কার, মিলেনিয়াম অ্যাওয়ার্ড (২০০২), হীরালাল সেন সম্মাননা পুরস্কার (২০০৩) লাভ করেন। মৃত্যু ঢাকায়, ১৩ অক্টোবর ২০০৭। [শেখ আবদুস সালাম]