হক, আ.ন.ম গাজীউল


হক, আ.ন.ম গাজীউল (১৯২৯-২০০৯)  ১৯৫২-র ভাষা-আন্দোলনের নেতা, মুক্তিযোদ্ধা, আইনজীবী। তাঁর প্রকৃত নাম আবু নছর মোহাম্মদ গাজীউল হক। জন্ম নোয়াখালী জেলার ছাগলনাইয়া থানার নিচিন্তপুর গ্রামে, ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯২৯। পিতা সিরাজুল হক ছিলেন কংগ্রেস ও খেলাফত আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। মাতা নূরজাহান বেগম।

গাজীউল হকের শিক্ষাজীবন শুরু হয় কাশিপুর স্কুলে। তিনি বগুড়া জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন (১৯৪৬), বগুড়া আজিজুল হক কলেজ থেকে আই.এ (১৯৪৮) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস নিয়ে বি এ অনার্স (১৯৫১) ও এম এ (১৯৫২) ডিগ্রি লাভ করেন। এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এল এল বি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি ১৯৫৬ সালে।

গাজীউল হক স্কুলজীবন থেকে বিভিন্ন প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৪২ সালে, ব্রিটিশ বিরোধী মিছিলে থাকা অবস্থায় রমনার নিকটবর্তী একটি সরকারি ভবনের ব্রিটিশ পতাকা নামিয়ে সেখানে মুসলিম লীগের পতাকা উঠানোর জন্য তিনি কারারুদ্ধ হন। তিনি ১৯৪৪ সালে ‘বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্রলীগ’ বগুড়া জেলা শাখার যুগ্ম সম্পাদক নিযুক্ত হন এবং এ বছর কুষ্টিয়ায় ‘নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ’ সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পরিচিত হন।

গাজীউল হক ১৯৪৮ সালে পূর্ব-পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় প্রধানমন্ত্রি খাজা নাজিমুদ্দিন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রৃভাষা করার ঘোষণা দিলে, প্রতিবাদ মিছিলে গাজীউল হক নেতৃত্ব দেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে আহবানকৃত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আমতলা সভায় তিনি সভাপতিত্ব করেন। এ সভা থেকেই ফৌজদারী কার্যবিধির ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে, বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্রজনতা মিছিল করলে পুলিশের গুলিতে আবুল বরকত, রফিক উদ্দিন আহমেদ, আব্দুল জববার ও আবদুস সালাম শহীদ হন। তখন থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস, বর্তমানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।

আ.ন.ম গাজীউল হক

ভাষা-আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক গাজীউল হকের নেতৃত্বে ৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হলে, সরকারের চাপের মুখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর এমএ ডিগ্রি বাতিল করে দেয়, কিন্তু পরে তাঁর ডিগ্রি ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৫৩ ও ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের সময় তখনকার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকার দরুন তিনি গ্রেফতার হন। তাছাড়াও ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি রমেশ শীল, মুনীর চৌধুরী, অজিতকুমার গুহ, সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত প্রমুখ প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে আসেন। গাজীউল হক কেবল ভাষা-আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন না, ৬২-র শিক্ষাসংস্কার-আন্দোলন, ৬৪-র সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যূত্থানে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধে গাজীউল হকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে তাঁর নেতৃত্বে সাতাশজন যুবক, ঊনচল্লিশজন ইপিআর ও পুলিশসহ উত্তরবঙ্গের আড়িয়া ক্যান্টনমেন্ট শত্রুমুক্ত হয়। আড়িয়ার এ যুদ্ধকে মরিচের যুদ্ধও বলা হয়। এ যুদ্ধের পর তিনি পাকসেনাদের বিরুদ্ধে উত্তরাঞ্চলের হিলিতে সংঘটিত একটি খন্ডযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধের মুখপত্র জয় বাংলা পত্রিকার বিক্রয় বিভাগের দায়িতসহ আকাশ বাণী ও স্বাধীন বাংলা বেতার-কেন্দ্র থেকে রণাঙ্গনের সংবাদ প্রচারের দায়িত্ব পালন করেন। নববইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ছিলেন।

গাজীউল হক আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য এবং ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’-র (১৯ জানুয়ারি ১৯৯২) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তাছাড়াও তিনি ‘প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ’ (পিআইবি)-এর এবং বগুড়া হামদর্দ ইউনানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ছিলেন।

গাজীউল হক অল্প বয়স থেকে লিখালেখি করতেন। জেলে থাকার সময়ও তিনি কিছু সংখ্যক কবিতা ও গান লিখেছেন। তাঁর রচিত: ‘ভুলবো না, ভুলবো না, ভুলবো না/ এই একুশে ফেব্রুয়ারি...’ -এ গানটি গেয়ে প্রভাত ফেরি করা হতো। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: জেলের কবিতা (১৯৬৯), এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম (১৯৭১), এগিয়ে চলো (১৯৭১), বাংলাদেশ আনচেইন্ড (১৯৭১), মিডিয়া ল’স এ্যান্ড রেগুলেশন্স ইন বাংলাদেশ (১৯৯২), মোহাম্মদ সুলতান (১৯৯৪), বাংলাদেশের গণমাধ্যম আইন ও বিধিমালা (১৯৯৬), উচ্চ আদালতে বাংলা (২০০৩)।

প্রগতিশীল আন্দোলন ও অন্যান্য কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বেশসংখ্যাক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। তার মধ্যে পাবনা থিয়েটার পুরস্কার (১৯৭৭), রাষ্ট্রভাষা পদক (১৯৯৩), ভাষা সৈনিক পদক (১৯৯৭), সিপাপ জাতীয় স্বর্ণপদক (১৯৯৯), বাংলা একাডেমীর ফেলোশিপ অর্জন (১৯৯৯), বিশ্ব বাঙালি সম্মেলন পুরস্কার (২০০০), একুশের পদক (২০০০), জাহানারা ইমাম পদক (২০০১), বঙ্গবন্ধু পদক (২০০৩), শেরে-বাংলা জাতীয় পুরস্কার (২০০৪) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ এ্যালামনাই এসোসিয়েশন-এর ৭ম পূণর্মিলনী (২০০৬)-তে তাঁকে ক্রেস্ট উপহার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪তম সমাবর্তন (২০০৮)-এ তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লজ ডিগ্রি দেওয়া হয়। তাঁর মৃত্যু ঢাকায়, ১৭ জুন ২০০৯। [শামীমা আক্তার]