স্যাটেলাইট বিদ্যালয়


স্যাটেলাইট বিদ্যালয়  বিদ্যালয়বিহীন এলাকায় ৬-১০ বছর বয়সী যেসব শিশু প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত তাদের জন্য বসতবাড়ির বৈঠকখানা বা অনুরূপ কোন স্থানে চালুকৃত উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রাকৃতিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত বহু এলাকায় এখনও প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব রয়েছে। এ অভাব দূরীকরণের লক্ষ্যে ১৯৯০-৯৫ সময়ে সাধারণ শিক্ষা প্রকল্পে ২০০টি স্যাটেলাইট বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। উক্ত বিদ্যালয়গুলি একশ ভাগ মহিলা শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত হতো এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৬০ ভাগ ছিল বালিকা। বিদ্যালয়গুলিতে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হতো। পরবর্তী সময়ে ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় শিশু শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে ৮টি বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণি চালু করা হয়। স্থানীয় এলাকাবাসীর আগ্রহে প্রথম দিকে বিদ্যালয়গুলি বসতবাড়ির বৈঠকখানায় শুরু করা হলেও পরবর্তীকালে এ ধরনের অনেক বিদ্যালয় সরকারি অর্থ সাহায্যে নির্মাণ করা হয়। সাধারণ শিক্ষা প্রকল্পের আওতায় এভাবে স্থাপিত ২০০ স্যাটেলাইট বিদ্যালয় শিশু শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে ঝরে-পড়ার হার কমাতে যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করে। এর ফলে বাস্তবায়িত হয়েছে ৪,০০০ স্যাটেলাইট বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প। প্রথমে এ প্রকল্পের মেয়াদকাল ছিল জুলাই ১৯৯৬ থেকে ডিসেম্বর ২০০০ পর্যন্ত এবং অর্থ বরাদ্দ করা হয় ৩,১৮৬.১৭ মিলিয়ন টাকা। এর সম্পূর্ণটাই ছিল বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থ। ২০০০ সালের শেষ পর্যায়ে এসে প্রকল্পটির মেয়াদ ২০০২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয় এবং প্রকল্পের মোট বরাদ্দের পরিমাণ ৫,০০,০০০ মিলিয়ন টাকায় পুনঃনির্ধারণ করা হয়।

স্যাটেলাইট বিদ্যালয় প্রকল্পের তিনটি উদ্দেশ্য হচ্ছে: ১. প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, প্রত্যন্ত ও অনগ্রসর এলাকার এবং বিদ্যালয়বিহীন এলাকার বিদ্যালয়-বর্হিভূত ৬-১০ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের জন্য যথাসময়ে প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা; ২. স্থানীয় জনগণকে যুক্তকরণ এবং সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে ছেলেদের পাশাপাশি গ্রামের মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা; ৩. নিয়মিত বিদ্যালয়গুলির নিম্ন শ্রেণিতে (১ম ও ২য় শ্রেণি) ছাত্র ভর্তির চাপ কমানো অর্থাৎ শ্রেণীপ্রতি ছাত্রসংখ্যা ১০০-এর বেশি হলে নিকটবর্তী স্যাটেলাইট বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ করে দেওয়া।

প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মোট ৪,০০০টি স্যাটেলাইট বিদ্যালয়কে পর্যায়ক্রমে স্থাপন করার ব্যবস্থা করা হয়। প্রথম বছরে প্রথম শ্রেণি চালু ও একজন শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। দ্বিতীয় বছরে দ্বিতীয় শ্রেণি চালুর সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। স্থানীয়ভাবে শিক্ষক নিয়োগ কমিটির মাধ্যমে ন্যূনতম এস.এস.সি দ্বিতীয় বিভাগে পাস যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নির্বাচন করা হয়। বিদ্যালয় সীমানার ২.৫ বর্গ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে বসবাসকারী মহিলা প্রার্থীকে শিক্ষক নির্বাচনে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে পার্বত্য অঞ্চল, বিল, হাওর এবং চর এলাকার ক্ষেত্রে মহিলা প্রার্থী না পাওয়া গেলে পুরুষ প্রার্থীকে বিবেচনায় আনা হয়। স্যাটেলাইট বিদ্যালয়ের অন্যান্য নির্ধারিত নীতিমালা অনুসারে শিক্ষক প্রতিদিন ৩ ঘণ্টা বিদ্যালয়ে শিক্ষাদান করে থাকেন; এছাড়া নিয়মিত মা সমাবেশ, উঠান বৈঠক ইত্যাদি সংগঠনসহ অন্যান্য দায়িত্ব পালন করেন।

স্যাটেলাইট বিদ্যালয়গুলিতে শ্রেণি প্রতি সর্বনিম্ন ৩০ এবং সর্বোচ্চ ৪০ জন ছাত্র ভর্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। বিনামূল্যে বইপ্রাপ্তির সুবিধাসহ শিক্ষা উপকরণ (স্লেট, পেন্সিল, চক, ডাস্টার, কাগজ, কলম, চকবোর্ড ইত্যাদি), আসবাবপত্র (মাদুর, টুল, টেবিল) এবং শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির সুবিধাও স্যাটেলাইট বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ভোগ করে থাকে। প্রকল্পে যেসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয় তা হলো বিদ্যালয়ের জন্য ঘর ভাড়া করা এবং যথাশীঘ্র টিউবওয়েল ও পায়খানাসহ বিদ্যালয়ের পাকা ঘর তৈরি করে দেওয়া। এছাড়াও, প্রকল্পে স্থানীয় জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে এলাকাবাসী কর্তৃক বিদ্যালয় গড়ে তোলার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ন্যায় স্যাটেলাইট বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকের ব্যবহারের জন্য বেঞ্চ ও চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা রাখা হয় নি। উপরন্তু নিজ গৃহের পরিবেশ বজায় রেখে শিক্ষাদান পদ্ধতিকে সহজতর করার উদ্দেশ্যে শ্রেণিকক্ষে ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহারের জন্য মাদুর এবং শিক্ষকের জন্য নিচু আকারের টুল ও টেবিলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে ব্যবহারের সুবিধা ও স্থায়িত্বের কথা বিবেচনা করে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে ছাত্রছাত্রীদের জন্য বাঁশের তৈরি চাটাইয়ের পরিবর্তে সিনথেটিক মাদুর সরবরাহ করা হয়ে থাকে। শিশুদের লেখাপড়ার সুবিধার্থে প্রতিটি স্যাটেলাইট বিদ্যালয়ে বই, স্লেট, পেন্সিল, চক, ডাস্টার এবং দুই শ্রেণির জন্য দুটি চকবোর্ড সরবরাহ করা হয়।

স্যাটেলাইট বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসিক নির্দিষ্ট পাঁচশত টাকা হারে সম্মানী ভাতা পেয়ে থাকেন। স্যাটেলাইট বিদ্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ চাকরির একটি অন্যতম শর্ত। প্রকল্প মেয়াদকালে প্রত্যেক শিক্ষককে দুবার মূলত বিষয়ভিত্তিক পাঠক্রম এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এছাড়া প্রতিটি স্যাটেলাইট বিদ্যালয়ে রেজিস্টার খাতা, জাতীয় পতাকা, সাইন বোর্ড, ঘণ্টা বাজানোর বেল ইত্যাদি ক্রয়ের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়।

প্রকল্প কার্যক্রমের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের সার্বিক দায়িত্ব পালন করে থাকেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন প্রকল্প পরিচালক। মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেন প্রধানত থানা শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাগণ। এরা উপজেলা শিক্ষা কমিটি, শিক্ষক নির্বাচন কমিটি এবং বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে কেন্দ্রের যাবতীয় আদেশ, নির্দেশ, স্যাটেলাইট বিদ্যালয় স্থাপন নীতিমালা অনুসারে বাস্তবায়ন করে থাকেন।

সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের একজন কমিশনারকে অথবা উপজেলা পরিষদের সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে মনোনীত করেন। বিদ্যালয়ের প্রথম স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষিকা হন সদস্য-সচিব। সংলগ্ন এলাকার একটি নিয়মিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে এবং অভিভাবক প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে একজন পুরুষ এবং একজন মহিলাকে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ম্যানেজিং কমিটির সদস্য মনোনীত করেন। এছাড়া স্থানীয় একজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি এবং বিদ্যালয় ঘরের মালিকও ম্যানেজিং কমিটিতে থাকেন।  [শাওয়াল খান]