স্বাস্থ্যবিধি


স্বাস্থ্যবিধি (Sanitation)  সুস্থ জীবনযাপনের জন্য আবশ্যকীয় স্বাস্থ্যচর্চা ও পরিচ্ছন্নতা অনুসরণের বিজ্ঞান। নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহ, পয়ঃজল ও  মানবসৃষ্ট বর্জ্যের যথাযথ নিষ্কাশনসহ সকল প্রকার বর্জ্যের দ্রুত অপসারণ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি সম্পর্কিত অধ্যয়ন এবং স্বাস্থ্যপূর্ণ ও পরিচ্ছন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ এর অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্যবিধি সুস্থতার সাথে সম্পর্কিত সকল বিধিবিধানকেই নির্দেশ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (World Health Organisation) সংজ্ঞানুযায়ী খাদ্যবিধি, বৃষ্টির পানির নিষ্কাশন, কঠিন বর্জ্যের অপসারণ এবং বায়ুমন্ডলীয় দূষণ স্বাস্থ্যবিধির অন্তর্ভুক্ত।

স্বাস্থ্যবিধি সুবিধাসমূহ নিশ্চিত করার মুখ্য উদ্দেশ্য জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুরক্ষা ও এর উন্নয়ন ঘটানো এবং পরিবেশগত দূষণসমূহ হ্রাস করা। বিভিন্ন রোগবাহী মাধ্যম যেমন, দূষিত খাবার ও পানি গ্রহণ, দূষিত মৃত্তিকার সংস্পর্শে আসা এবং জীবাণুপোষক পোকামাকড়ের মাধ্যমে সুস্থ মানুষের দেহ সংক্রামক রোগজীবাণু কর্তৃক আক্রান্ত হওয়া থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে স্বাস্থ্যবিধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

একটি সুপ্রতিষ্ঠিত স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থা মানবসৃষ্ট বর্জ্য ও অন্যান্য বিভিন্ন প্রকার বর্জ্যের জমাকরণ, সংগ্রহ, শোধন ও নিরাপদ উপায়ে প্রকৃতিতে নিঃশেষ করার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করে। সুতরাং মানবীয় ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থায় অবশ্যই বর্জ্যের নিঃসারণ ও জমাকরণ, সংগ্রহ ও পরিবহণ, শোধন ও ধ্বংস অথবা পুনরাবর্তন কর্মকান্ড অন্তর্ভুক্ত হতে হবে।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের প্রধান সমস্যা হচ্ছে মানবসৃষ্ট বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা। দেশে ৯ কোটি গ্রামীণ জনসংখ্যার মাত্র ১৬ ভাগ স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করে। অপর ২২ ভাগ জনগোষ্ঠী ব্যবহার করে নিজেদের তৈরি চাকতি পায়খানা। জনগণ এখন পায়খানা ব্যবহার করার বিষয়ে ধীরে ধীরে সচেতন হচ্ছে এবং দেশের মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ কোন না কোন প্রকারে পায়খানা ব্যবহার করছে। শহরাঞ্চলের ৩ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ৪২ শতাংশ স্বাস্থ্যবিধির আওতাভুক্ত। প্রথাগত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা শুধুমাত্র ঢাকা মহানগরীর কিছু কিছু অংশে কার্যরত রয়েছে এবং নগরীর ৯ কোটি অধিবাসীর মধ্যে মাত্র ১৮ শতাংশ এই সুবিধা লাভ করছে। নগরাঞ্চলে গড়ে ওঠা বস্তিসমূহের স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। অধিকাংশ বস্তিবাসীরই কার্যত কোন পায়খানা নেই, অল্প কিছু সংখ্যক চাকতি পায়খানা অথবা কাচা পায়খানা ব্যবহার করে। গ্রামীণ অধিবাসিগণ স্বাস্থ্যবিধির প্রধান যে সমস্যাটির সম্মুখীন হয় তা হচ্ছে বন্যাপ্রবণ এলাকাসমূহে অথবা উচ্চ পানির স্তরবিশিষ্ট অঞ্চলসমূহে টেকসই ও স্বল্প খরচে স্থাপনযোগ্য চাকতি পায়খানার পরিবেশগতভাবে নিরাপদ নকশার অভাব। বিগত দশকে স্থাপিত বহু পায়খানাই বর্তমানে ছিদ্র হয়ে গিয়েছে এবং এসকল ছিদ্র থেকে পরিবেশে রোগজীবাণু সৃষ্টিকারী শক্তি ছড়িয়ে পড়ছে, বিশেষ করে বন্যার সময় তা আরও তীব্র আকার ধারণ করে। এই সমস্যা প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে জনগণকে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি পায়খানার সুবিধা সম্পর্কে সচেতন করে তোলা প্রয়োজন। বন্যার পানি প্রতিরোধক্ষম স্যানিটারি পায়খানার নকশা অথবা তার চেয়েও অধিকতর কার্যকর কোন পায়খানার নকশার ব্যাপক প্রয়োগ বর্তমানকালে বিদ্যমান পায়খানাজনিত পরিবেশ দূষণ বহুলাংশে হ্রাস করতে সক্ষম হবে।

স্বাস্থ্যবিধির অপর গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে পয়ঃনিষ্কাশন। বাংলাদেশে শুধুমাত্র ঢাকা মহানগরীর কিছু অংশে আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা রয়েছে। ঢাকার অদূরে পাগলা নামক স্থানে একমাত্র পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পে বর্জ্য ভান্ডারীকরণ পদ্ধতিতে পয়ঃশোধন করা হয় এবং শোধিত বর্জ্য বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলা হয়। ঢাকা মহানগরীর পয়ঃজল একটি পৃথক ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। ঢাকা ওয়াসা ঢাকা মহানগরীর পানিবাহিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার নির্মাণ, পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত একমাত্র প্রতিষ্ঠান। অননুমোদিত সংযোগ, বিশেষত শিল্প-কারখানা কর্তৃক সাধিত, যার ফলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি এবং সেই সাথে প্রতিনিয়ত ক্ষমতার অতিরিক্ত বর্জ্যের সংগ্রহ ও পরিশোধন ঢাকার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার একটি সাধারণ চিত্র।

ব্যয়বহুল আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা সর্বত্র না থাকার কারণে নগর কেন্দ্রসমূহে এবং প্রধান প্রধান শহরে ব্যাপকভাবে সেপটিক ট্যাঙ্ক এবং পানিস্রোত ফ্লাশ করার মাধ্যমে সম্পন্ন পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যবহূত হয়ে থাকে। তা সত্ত্বেও সেপটিক ট্যাঙ্কের বর্জ্য ধ্বংস প্রক্রিয়া সাধারণভাবে খুবই নিম্ন প্রকৃতির। শহরগুলোর সেপটিক ট্যাঙ্কগুলোর বর্জ্যসমূহ পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনা না করেই উন্মুক্ত ডোবাগুলোতে নির্গত করা হয়ে থাকে।

পরিবেশগত স্বাস্থ্যবিধির একটি প্রধান অংশ হচ্ছে বিশুদ্ধ পানীয় জলের সরবরাহ নিশ্চিত করা। ঢাকার সর্বত্র পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। চট্টগ্রামে একই দায়িত্ব পালন করে চট্টগ্রাম ওয়াসা। ঢাকা ওয়াসার বর্তমান পানি সরবরাহ ক্ষমতা দৈনিক ৯০ কোটি লিটার (৯০০ মিলিয়ন লিটার/দৈনিক)। এই সরবরাহের ৯৬ শতাংশ আসে ২৭০টি গভীর নলকূপ থেকে এবং অবশিষ্টাংশ আসে দুটি ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানি শোধন প্রকল্প থেকে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম ব্যতীত অন্যান্য শহরের পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার দায়িত্ব পালন করে জনস্বাস্থ্য ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (Department of Public Health and Engineering)। এই অধিদপ্তর দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছে। এযাবৎ কাল পর্যন্ত মোট ৬১টি জেলাশহর এবং প্রায় ২০টি থানা সদরে পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে, যার আওতায় সেসকল এলাকার গড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ অধিবাসী উপকৃত হচ্ছে। সেসকল এলাকায় এর বাইরের ৫৫ শতাংশ অধিবাসী হস্তচালিত নলকূপের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ লাভ করছে। পাইপের মাধ্যমে সরবরাহকৃত পানির বেশিরভাগই গভীর নলকূপের দ্বারা ভূগর্ভস্থ জলস্তর থেকে সংগ্রহ করা হয়, যদিও চারটি শহরে শোধন করে কিছু পরিমাণে ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানিও সরবরাহ করা হয়ে থাকে। সাধারণভাবে নগরাঞ্চলে পাইপের মাধ্যমে সরবরাহকৃত পানি আর্সেনিক সমস্যায় আক্রান্ত না হলেও সেসকল এলাকার কিছু কিছু হস্তচালিত নলকূপের পানি আর্সেনিক দূষিত।

সরকার পানি সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যবিধি পরিস্থিতির উন্নয়নে, বিশেষ করে যেসকল এলাকায় সম্ভব সেসকল এলাকায় পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ, বিভিন্ন ধরনের নলকূপ ও পায়খানার উন্নয়ন প্রভৃতি কর্মকান্ডে এনজিও, বাজারমুখী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের সংশি­ষ্টতাকে উৎসাহিত করছে। জাতীয় পানি নীতিতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব উদ্যোগে পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত সেবা লাভের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর নিমিত্তে ঋণ সুবিধা প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে।   [কাজী মতিনউদ্দিন আহমেদ]