স্বাদুপানির উদ্ভিদ


স্বাদুপানির উদ্ভিদ (Freshwater Plant)  প্রাকৃতিকভাবে স্বাদুপানিতে বসবাসকারী উদ্ভিদ। স্বাদুপানিতে লবণের মাত্রা খুবই কম, ০.৫% (সমুদ্রের পানিতে ৩৫%)। বৃষ্টিই স্বাদুপানির উৎস যা নিচে পড়ে ভূভাগ ধুয়ে হ্রদ, পুকুর, ডোবা, প­াবনভূমি, নদী, খাল ইত্যাদির গর্ভে জমা হয় ও স্বাদুপানির আবাসস্থল গড়ে তোলে। বাংলাদেশে এ ধরনের আবাসস্থলের মধ্যে আছে হাওর, বাঁওড়, বিল, হ্রদ, পুকুর, নদী ও পাবনভূমি।

ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে আবৃতবীজ গাছগাছালিসহ অজস্র ধরনের উদ্ভিদ স্বাদুপানির আবাসে জন্মে। প্রাকৃতিক স্বাদুপানি একটি চমৎকার মাধ্যম, তাতে মিশে থাকে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড। এতে আরও রয়েছে জীবনের অপরিহার্য নানা উপাদান ও পুষ্টিবস্ত্ত: হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, গন্ধক, পটাশিয়াম, ফসফরাস, লোহা, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, বোরন এবং কিছুটা আয়নিত পানি। অধিকন্তু সূর্যালোক স্বভোজী জীবের (সবুজ উদ্ভিদ ও রাসায়নিক সংশে­ষক্ষম ব্যাকটেরিয়া) সালোক-সংশে­ষের জন্য শক্তি ও বহিস্থ মাধ্যমের জন্য তাপ যোগায়। নানা ধরনের প্রচুর জলজ উদ্ভিদ স্বাদুপানির আবাসে জন্মে এবং সেখানকার গ্যাস, পুষ্টিবস্ত্ত এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক ও ভৌত উপকরণের সাহায্যে প্রজনন, বৃদ্ধি ও অন্যান্য ক্রিয়াকর্ম সম্পাদন করে।

স্বাদুপানির কয়েকটি সাধারণ উদ্ভিদ প্লাঙ্কটন

বাংলাদেশের স্বাদুপানিতে সকল জাতের উদ্ভিদই আছে: ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, অ্যাক্টিনোমাইসিটিস, ছত্রাক, শৈবাল ও লাইকেন থেকে লিভারওয়ার্ট, মস, ফার্ন ও আবৃতবীজী। নেই শুধু নগ্নবীজী, এগুলি জলজ পরিবেশে জন্মায় না। কোন পুকুর, বিল বা নদীতে দৃষ্টিপাত করলেই এদেশের জলজ উদ্ভিদের প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্য বোঝা যায়। কোন কোনটি পাড় থেকে পানিতে নামে, কিছু সম্পূর্ণ জলমগ্ন, কয়েকটি অর্ধমগ্ন, আবার কিছু ভাসমান। খাল বা বিলের আরেক জগৎ উদ্ভিদ প­্যাঙ্কটন, যারা আণুবীক্ষণিক উদ্ভিদ, মূলত জলস্রোতে সচল। এই পানিতে উচ্চতাপের সঙ্গে পর্যাপ্ত নাইট্রোজেন ও ফসফরাস থাকায় এসব প­্যাঙ্কটনের অতি বৃদ্ধির ফলে পানি কখনও কখনও সবুজ বা লাল হয়ে ওঠে। একে পানিস্ফুটন (water bloom) বলে। এটি স্বল্পস্থায়ী হলেও এতে পানিদূষণ ঘটে এবং মাছ মারা পড়ে। বাংলাদেশে পানিস্ফুটন ঘটায় Microcystis aeruginosa, Oscillatoria, Anabaena, Euglena, Sanguinea, Volvox, Carteria ইত্যাদি। আণুবীক্ষণিক উদ্ভিদ, প্রধানত শৈবাল পানির তলায় নানা আশ্রয় ইট, পাথর, গাছের ডাল, বালুকণা ও কাদা অাঁকড়ে থাকে।

জলজ ভাইরাসের সংখ্যা খুবই কম। এগুলি হলো A hepatitis, polio ও cyanophage (বিশেষ ধরনের ভাইরাস যারা নীলহরিৎ শৈবালকোষ আক্রমণ করে)। পানিতে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়া অনেক ধরনের। এদের মধ্যে আছে কলেরা, শিগেলা আমাশয় ও টাইফয়েডের জীবাণু। এছাড়া রয়েছে সালোকসংশে­ষী ব্যাকটেরিয়া Chromatium, গন্ধক ব্যাকটেরিয়া Thiospirillum, লৌহ ব্যাকটেরিয়া Leptothrix এবং নাইট্রোজেন ও নাইট্রোজেন যৌগ রূপান্তরকারী আরও কিছু ব্যাকটেরিয়া। ‘নর্দমা ছত্রাক’ নামের Sphaerotilus natans আসলে একটি সূত্রাকার ব্যাকটেরিয়া, যা দূষিত পানির জৈববস্ত্ত বিজারণে সুদক্ষ।

জলজ ম্যাক্রোফাইট

অ্যাকটিনোমাইসিটিস বর্ণহীন, সূত্রাকার এক ধরনের উদ্ভিদ। জলীয় পরিবেশে এরা (Actinoplanes, Streptomyces) নিষ্প্রাণ জৈববস্ত্ত ভেঙে ফেলে এবং সেই পরিবেশে দুর্গন্ধ ছড়ায়। জলজ ছত্রাকের আবাস ও ধরন উভয়ই বহুবিধ। কিছু এককোষী chytrid ছত্রাক অন্যান্য প­্যাঙ্কটন, যেমন Sphaerita ইউগে­নাকে, আর Podochytrium ডায়াটমকে আক্রমণ ও নিহত করে। পানির সুতা আকৃতির ছত্রাক Saprolegnia দ্বারা মাছের পোনা ও নরমদেহী অন্যান্য প্রাণী (যেমন rotifer) আক্রান্ত হয়। কোন কোন লাইকেন (শৈবাল ও ছত্রাকের সহবাসে গঠিত সমাঙ্গদেহ উদ্ভিদ) হ্রদের কিনারে জন্মায়। Verrucaria লাইকেন গোটা জীবনের ৯৫% পানির তলায় কাটায়। Parmelia ও Umbelicaria লাইকেনও জলীয় পরিবেশে থাকে।

বাংলাদেশের জলজ লিভারওয়ার্ট (Bryophyta, শিকড়, কান্ড ও পাতা পৃথকীকৃত নয়) Riccia fluitansRicciocarpus natans নানা জলাশয়ে জন্মে। এদেশে এখনও কোন জলজ মসের খোঁজ পাওয়া যায় নি। Fissidens, Fontinalis, Sphagnum ইত্যাদি জলজ মস আছে পৃথিবীর নানা অঞ্চলে।

স্বাদুপানির শৈবালের সংখ্যা অজস্র। এগুলি খুব ছোট (Nannochloris ২ সেমি) থেকে যথেষ্ট বড় Chara, Nitelia (১০ সেমি)। আবাসস্থল অনুসারে শৈবালের বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। Scenedesmus, Pediastrum, Chlamydomonas, Volvox, Euglena (উদ্ভিদ-প­াঙ্কটন), Botrydiopsis, Lampropedia (পানিতে ডুবে থেকে শরীর বাতাসে উঁচিয়ে রাখে), Nitzschia, Achnanthes, Gomphonema, (বালুকণা অাঁকড়ে পানির নিচে থাকে)। Oedogonium, Ophiocytium, Characium (জলজ অন্য উদ্ভিদের ডাল অাঁকড়ে ধরে), Basicladia (কচ্ছপের খোলে) ও Cladophora (শামুকের খোলকে) হলো উপজীবী (epizoic) শৈবাল।

জলজ ফার্নের মধ্যে বাংলাদেশে আছে Azolla pinnata, Salvinia cucullata, S. auriculata, S. natans, Marsilea quadrifoliata, Ceratopteris thallictroides ও Isoetes

আবৃতবীজের দ্বিবীজপত্রী ও একবীজপত্রীর বহু প্রজাতি স্বাদুপানিতে জন্মে। বাংলাদেশের জলজ দ্বিবীজপত্রীর মধ্যে উলে­খযোগ্য মালাঞ্চা (Alternanthera philoxeroides), হেলেঞ্চা (Enhydra fluctuans), কলমি (Ipomoea aquatica), ঝাঁঝি (Myriophyllum, Utricularia), চাঁদমালা (Nymphoides), মাখনা (Euryale ferox), পদ্ম (Nelumbo nucifera), শাপলা (Nymphaea pubescens), কেশরদাম (Ludwigia), শোলা (Aeschynomene), বিষকাঁটালি (Polygonum), সিঙ্গারা (Trapa) ইত্যাদি। বাংলাদেশের সাধারণ জলজ একবীজপত্রী হলো: Sagittaria, Aponogeton, Cryptocoryne, Lasia, Pistia stratiotes, Cyperus, Eleocharis, Schoenoplectus, Eriocaulon, Coix aquatica, Hygrorhiza aristata, Leersia hexanda, Oryza rufipogon, Blyxa, Hydrilla verticillata, Ottelia alismoides, Spirodela polyrhiza, Lemna perpusilla, Wolffia arrhiza, Limnocharis flava, Najas, Eichhornia crassipes, Monochoria hastata, Potamogeton crispum, এবং Typha latifolia। এ সবগুলিই জন্মে বাংলাদেশের বিল, হাওর, বাওড়, খাল, ডোবা ও নদীতে। তদুপরি বিভিন্ন অঞ্চলে জলাভূমির কিছু গাছও আছে (অধিকাংশই বিপন্ন): হিজল (Barringtonia acutangula), করঞ্জা (Pongamia pinnata), বরুন (Crataeva nurvala), এবং গোটাগামার/পিটুলি (Trewia nudiflora)। জলাভূমির ভিতরে ও কিনারে কিছু কিছু ঝোপঝাড়ও থাকে: ভঁইওকড়া/মটকা (Lippia geminata), বালাডুমুর (Ficus heterophyla), সেঁউতি/বনগোলাপ (Rosa involucrata)। বাংলাদেশে একটি স্বাদুপানির পতঙ্গভুক উদ্ভিদ (Aldrovanda vesiculosa) রাজশাহীতে দেখা যায় এবং সেটি বিপন্ন।

কোন কোন জলজ উদ্ভিদ মানুষ ও পশুর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য যোগায় যেমন Trapa, Nelumbo, Ipomoea, Telanthera, Ottelia এবং Hygroryza। প­াবনভূমিতে গজানো বড় আকারের জলজ গাছগাছালি চাষিরা সংগ্রহ করে শুকিয়ে পুড়িয়ে চাই প্রস্ত্তত করে কিংবা কম্পোস্ট সার বানায়। কিছু জলচর পরিযায়ী পাখি জলজ গাছপালায় বাসা বাঁধে। Najas, Ceratophyllum, Hygroryza, Sagittaria, Monochoria, Eichhornia, Ipomoea, Telanthera, Myriophyllum ইত্যাদি জলজ আগাছায় কতক মাছ প্রজাতি ডিম পাড়ে ও আশ্রয় পায়। বাংলাদেশের বিল, হাওর, বাঁওড় ও নদীতে জাঁক দিয়ে মাছ ধরতেও এগুলি ব্যবহূত হয়।

উপকারী সত্ত্বেও কিছু জলজ উদ্ভিদ ক্ষতিকর। অত্যধিক বৃদ্ধির ফলে এগুলিতে জলাশয় বোঝাই হয়ে যায়, তাতে নৌচলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং মাছও মারা পড়ে (যেমন কচুরিপানা, টোপাপানা ইত্যাদি)। কোন কোনটি কলেরা ও শিগেলা আমাশয়ের রোগজীবাণুর বাহন। এসব সত্ত্বেও জলজ উদ্ভিদ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। এগুলি সূর্যের আলোকে জৈববস্ত্ততে রূপান্তর করতে সক্ষম প্রাথমিক উৎপাদক।  [মনিরুজ্জামান খন্দকার]