স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র


স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র চলচ্চিত্র শিল্পের তথ্যভিত্তিক একটি বিশেষ ধারা। ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্যারিসের গ্র্যান্ড ক্যাফেতে অগাস্ত লুমিয়ের (১৮৬২-১৯৫৪) ও লুই লুমিয়ের (১৮৬৪-১৯৪৮) ভাইয়েরা ব্যবসায়িক ভিত্তিতে পৃথিবীর প্রথম যে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন তা ছিল স্বল্পদৈর্ঘ্যের। ওই সময় থেকে ১৮৯৮ সাল পর্যন্ত তাঁরা প্রদর্শন করেন A boat at the port, Baby’s breakfast প্রভৃতি ছবি। এসব ছবির কোনোটিরই প্রদর্শনকাল দীর্ঘ ছিল না। ১৮৯৬ সালের ২৫ মার্চ থিয়েট্রাস্কোপ যন্ত্রে রবার্ট পল কর্তৃক লন্ডনে প্রদর্শিত চলচ্চিত্র, ২৭ এপ্রিল এডিসন কোম্পানি কর্তৃক প্রদর্শিত চলচ্চিত্র বা ২৯ জুন লুমিয়ের ভাইদের আবিষ্কৃত সিনেমাটোগ্রাফ যন্ত্রে সাধারণে প্রদর্শিত চলচ্চিত্র কোনোটি দীর্ঘ সময় ধরে প্রদর্শিত হয়নি। সময়-বিচারে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ঊষালগ্নের সব ছায়াছবিই ছিল স্বল্পদৈর্ঘ্যের। চলচ্চিত্রের দৈর্ঘ্য দীর্ঘ করে তাকে ব্যবসায়িক ভিত্তিতে কাজে লাগানোর ধারণা পরবর্তীকালের। কাহিনিচিত্রের ধারণা বিকশিত হওয়ার আগে সত্য ঘটনাকে ধারণ করার প্রবণতা থেকে সেসব স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র তৈরি হতে শুরু হয় এবং পাশ্চাত্যের সমাজ সেগুলিকে স্বাগত জানায়।

পাশ্চাত্যে জন্ম নেওয়া এসব চলচ্চিত্র ভারত উপমহাদেশসহ সারা বিশ্বে প্রভাব ফেলে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরুর মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ভারতের মুম্বাইয়ের ওয়াটসন হোটেলে কতকগুলি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয় এবং দৈর্ঘ্য বিচারে সেগুলি ছিল স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র। ১৮৯৬ সালের ৭ জুলাই লুমিয়ের ভাইদের কর্মচারী ম্যরিস সেস্তিয়্যের এ প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা ছিলেন। ফলে ১৯০১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাত ৯ টায় কলকাতায় ক্লাসিক থিয়েটারে হীরালাল সেন (১৮৬৬-১৯১৭) বিভিন্ন নাটকের ধারণকৃত অভিনয়াংশ প্রদর্শন করেন। অবিভক্ত বাংলায়, কাহিনিচিত্র ধারণ ও প্রদর্শনের সে সূচনালগ্নে আমরা পাই সরলা, ভ্রমর, আলিবাবা, হরিরাজ, দোললীলা, বুদ্ধ সীতারাম।

১৯১৩ সাল পর্যন্ত উপমহাদেশে যত চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল তার সবই ছিল স্বল্পদৈর্ঘ্যের। পরেও স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল। ৪ রিলের সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র (১৯২০), ৬ রিলের শিবরাত্রী (১৯২১), ৭ রিলের মা দুর্গা (১৯২১), ৩ রিলের হিন্দুস্তান (১৯২২), শনি প্রভাব (১৯২২), নর্তকী তারা (১৯২২) তার নিদর্শন। তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায় এসব চলচ্চিত্রের বেশিরভাগই নির্মাণ করেছিলেন জামসেদজি ফ্রামজি ম্যাডান। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র কথাটার পাশাপাশি মুক্ত বা স্বাধীন চলচ্চিত্র এবং বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র কথাগুলি এখন ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হয়। এগুলির উৎপত্তিস্থল হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিবেচনা করা হয়। হলিউডের স্টুডিও ব্যবস্থার বাইরে এসে চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রয়াস থেকে এর সৃষ্টি হয়েছে। ১৯১০ সালে হলিউডে বড় দৈর্ঘ্যের ছায়াছবি নির্মাণ প্রয়াসের সূচনাকালে পৃথকভাবে স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারণার উদ্ভব হয়। বিশ শতকের ত্রিশের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মাণে কিছুটা মন্থরতা দেখা দেয় এবং ১৯৫৫ সালের পরে এ ধারার চলচ্চিত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় টেলিভিশন। তবে আশির দশকে এসে সংক্ষিপ্ত বিষয়বস্ত্ত নিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রবণতা বেড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের হলিউড কেন্দ্রিক বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রের বিকাশের এক পর্যায়ে এসে চলচ্চিত্র নির্মাণ, পরিবেশন ও প্রদর্শনে কয়েকটি গোষ্ঠী একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। বিশ শতকের বিশের দশকের প্রথম থেকে এ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করে পাঁচটি প্রধান আমেরিকান চলচ্চিত্র স্টুডিও। এগুলি হচ্ছে এম জি এম, প্যারামাউন্ট পিকচার্স, আর কে ও, ওয়ার্নার ব্রস এবং টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি ফক্স। এই স্টুডিও ব্যবস্থা খুবই শক্তিশালী হয়ে উঠলে ১৯১৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মেরি পিকফোর্ড, ডগলাস ফেয়ারব্যাংকস ও ডি ডব্লিউ গ্রিফিথসহ মার্কিন নির্বাক চলচ্চিত্রের ৫জন নেতৃস্থানীয় ইউনাইটেড আর্টিস্টস নামে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম স্বাধীন (Independent) স্টুডিওর গোড়াপত্তন করেন। অবশ্য চল্লিশের দশকের শেষভাগে এসে এ স্টুডিওর প্রভাবের বিলোপ ঘটে। ১৯৪১ সালে চার্লি চ্যাপলিন ও ওয়াল্ট ডিজনিসহ অনেকে মিলে তৈরি করেন সোসাইটি অব ইন্ডিপেনডেন্ট মোশন পিকচার্স প্রোডিউসার্স। এ সমিতির চেষ্টা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে স্বল্পমূল্যের বহনযোগ্য ক্যামেরার আবির্ভাবের ফলে প্রধান চলচ্চিত্র স্টুডিওগুলির ব্যবস্থাপনার বাইরে গিয়েও চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি হলো। ফলে ১৯৫৩ সালে রেমন্ড এব্রাশকিন্স নির্মিত লিটল ফিউজাটিভ নামের স্বাধীন চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে আমেরিকান একাডেমি পুরস্কার লাভ করে। মোটকথা একচেটিয়া স্টুডিও ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রয়াস হলিউডসহ যুক্তরাষ্ট্রে বহু আগে থেকেই চলে আসছে। এ কারণে এ ধারা বাংলাদেশেও চালু হয়েছে। এদেশে এখন স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ও বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র কথাগুলি প্রায় সমার্থক।

হলিউডের দু-আড়াই ঘণ্টা কাল বা তার চেয়েও বেশি দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রের ধারাতেই উপমহাদেশে পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মিত হতে থাকে। আমাদের দেশেও পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রের জন্য সাধারণ মান হিসেবে আড়াই ঘন্টাকে বিবেচনা করা হয়। ৩৫ মি.মি.-এ এসব চলচ্চিত্র বানানো হয়। এ ধরণের চলচ্চিত্রের নির্মাণ ব্যয় অনেক বেশি। এ কারণে নির্মাতাকে অতিমাত্রায় পুঁজি লগ্নিকারীর ওপর নির্ভর করতে হয়। পুঁজি লগ্নিকারীর কাছে নান্দনিকতা গৌণ বলে গণ্য হবার সম্ভাবনা থাকে। তার কাছে লগ্নি করা পুঁজি লাভসহ ফেরত পাওয়ার চিন্তা মুখ্য হওয়া স্বাভাবিক। অতি বাণিজ্যিকীকরণের ফলে চলচ্চিত্রের মান বিনষ্ট হয়। এসব বিবেচনায় আমাদের দেশের কিছু উদ্যমী ব্যক্তি মূলধারার অর্থাৎ এফডিসিকেন্দ্রিক নির্মাণধারার বাইরে গিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্যোগী হন। হলিউডের স্টুডিও ব্যবস্থার মতোই বাংলাদেশেও চলচ্চিত্র স্টুডিও নির্ভর যে নির্মাণধারা আছে, সেখানে চলচ্চিত্র নির্মাণ ব্যয়বহুল। এ নতুন ধারার নির্মাতারা এসবের বাইরে থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্যোগী হন। ৩৫ মিমি-এ ছবি বানানোর ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হওয়ায় তারা কম ব্যয়ের ১৬ মিমি এ ছবি নির্মাণে উদ্যোগী হন। অধুনা ভিডিও ও ডিজিটাল পদ্ধতিও ব্যবহূত হচ্ছে। এসব ছবিতে যৌনতা, বীভৎসতা, নিষ্ঠুরতা ও ভাঁড়ামোর মতো অপ্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক উপাদান সংযোজন করে ছবির দৈর্ঘ্য বাড়ানোর প্রয়াস নেই। জীবনঘনিষ্ঠ এমন অনেক বিষয় নিয়ে এ ধারার নির্মাতারা ছবি নির্মাণ করেন, যেসব বিষয় নিয়ে বাণিজ্যিক ধারায় ছবি নির্মাণের কথা ভাবাই হয় না। সহজলভ্য ও সহজে বহনযোগ্য ১৬ মিমি প্রজেক্টরের সুবিধা তাই বিকল্পধারার নির্মাতারা গ্রহণ করেন। ফলে স্টুডিওকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থেকে নির্মাতা মুক্তি পান। তিনি সিনেমা হল ভিত্তিক প্রদর্শন ব্যবস্থাকে অতিক্রম করে স্বাধীনভাবে মিলনায়তন বা তাঁবু যেকোনো জায়গাতেই তার ছায়াছবি দেখাতে পারেন। তিনি কারো ওপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে ছবি নির্মাণ ও প্রদর্শন করতে পারেন। এর বিপরীতে মূলধারার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র নির্মাণ, পরিবেশন ও প্রদর্শন প্রক্রিয়ার পুরোটাই নির্মাতার নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত। ছবির কাহিনি নির্বাচনেও এখানে নির্মাতা স্বাধীন। যেমন, গরুর গাড়িতে করে লাশ বহনের ঘটনা নিয়ে নির্মিত হয়েছে চাকা ছবিটি। কাহিনিটি ব্যবসা সফল হওয়ার মতো নয়। এভাবে নির্মিত চলচ্চিত্রকে দৈর্ঘ্য নির্বিশেষে এখন স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র বলা হচ্ছে। নদীর নাম মধুমতির দৈর্ঘ্য সোয়া দু ঘণ্টা হলেও তা এ কারণেই স্বল্পদৈর্ঘ্যের বলে চিহ্নিত।

পুঁজি কম বলে এসব চলচ্চিত্রের নির্মাণ ব্যয়ও কম রাখা হয়। তাই উচ্চ পারিশ্রমিক দাবি করা তারকাদের এসব ছবিতে রাখার সুযোগ হয় না। ফলে বড় পর্দার তথাকথিত বড় অভিনেতা-অভিনেত্রীর বদলে প্রধানত ছোট পর্দার বা নাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ওপর এ ধরণের চলচ্চিত্রের নির্মাণকারীকে নির্ভর করতে হয়। যেমন, চিত্রা নদীর পাড়ে ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়কারীদের মধ্যে রওশন জামিল ছাড়া তৌকির আহমেদ, মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও আফসানা মিমির মতো অভিনয় শিল্পীরা মূলত নাটকের জগতের। এ ধরণের চলচ্চিত্র নির্মাণের আরও একটি সুবিধা হলো, কিছু নিবেদিতপ্রাণ বন্ধু-বান্ধব নিয়েও এ ছবি বানানো সম্ভব। এক্ষেত্রে বিপুল সংখ্যক লোকবলের ব্যয় নির্বাহের দরকার হয় না। এক্ষেত্রে কোনো প্রযোজনা ও পরিবেশনা সংস্থারই দরকার হয় না। তবে নির্মাতার চলচ্চিত্র বিষয়ে ও নির্মাণ কৌশল সম্পর্কে পড়াশোনা, নান্দনিকতা ও নিজস্ব প্রদর্শন ব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো সাংগঠনিক দক্ষতা থাকা খুবই দরকার। এদেশে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রের জন্য এখনও ভালো প্রদর্শন ব্যবস্থা সৃষ্টি করতে না পারাটা বিকল্প ধারা তথা স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রের জন্য একটি বড় সমস্যা। অবশ্য এ সমস্যা অন্যান্য দেশেও আছে। তবে টেলিভিশন চ্যানেলগুলিতে স্বল্পদৈর্ঘ্যের জীবনঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্র উচ্চ প্রশংসিত হলে নির্মাতার পক্ষে আর্থিকভাবে অধিকতর উপকৃত হওয়া সম্ভব।

এক কথায় বিকল্প ধারায় নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রে প্রচলিত প্রথা ভেঙ্গে শিল্পীসত্ত্বার স্বাধীন বিকাশের অবারিত সুযোগ এনে দেয়। এ ধরণের চলচ্চিত্রের প্রধান সমস্যা- ক. প্রদর্শন ব্যবস্থার অভাব খ. পুঁজির অভাব গ. দর্শকের রুচির দৈন্য ঘ. সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও প্রশাসনিক বাধা এবং ৫. প্রথাগত ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িতদের ঈর্ষা, অবজ্ঞা ও অবহেলা।

হুলিয়া, চিত্রা নদীর পাড়ে, অগ্নি যমুনা, বিস্মরণের নদী, ইতি সালমা, ফুল কুমার, শিলালিপিসহ বাংলাদেশে নির্মিত বেশকিছু স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র সাধুবাদ পেয়েছে। তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম, তারেক মাসুদ, শামীম আখতার,  এ.কে.এম জাকারিয়া, রাশেদ চৌধুরী, আশিক মোস্তফা প্রমুখ নির্মাতা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নান্দনিকতার প্রকাশ ঘটিয়ে খ্যাতিলাভ করেছেন।  [খন্দকার মাহমুদুল হাসান]