স্বনির্ভর আন্দোলন


স্বনির্ভর আন্দোলন  পল্লী উন্নয়ন ও গ্রামীণ সমাজের অগ্রগতির লক্ষ্যে পরিচালিত একটি ‘মৌলিক চাহিদা’ কেন্দ্রিক উদ্যোগ। গ্রামের সমাজ-কাঠামোর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে এ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার প্রয়াস ছিল। এটি বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়নের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও সমাজকর্মী মাহবুব আলম চাষী ছিলেন স্বনির্ভর আন্দোলনের পথিকৃৎ। ১৯৭৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় স্বনির্ভর আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। স্বনির্ভর আন্দোলন কর্মকান্ডে প্রধান গুরুত্ব দেওয়া হয় খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টির প্রতি। চারিত্রিক গুণাবলি এবং নৈতিক মূল্যবোধের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বের ওপরও জোর দেওয়া হয়। পল্লী উন্নয়ন উদ্যোগের গোড়ার দিকে গৃহীত বেশ কিছু পদক্ষেপের মধ্যে স্বনির্ভর আন্দোলনের ধারণার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একই ধরনের চিন্তার উন্মেষ ঘটে ১৯৬৭ সালে রাঙ্গুনিয়ার গুমাইতে (চট্টগ্রাম) গৃহীত একটি অংশগ্রহণমূলক প্রকল্পের মধ্যে। ১৯৭৪ সালের আগস্টে ভয়াবহ বন্যা ও দুর্ভিক্ষের সময় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড) প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও জনগণের সম্মিলিত কর্মকান্ডকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণী ও শক্তিকে সংগঠিত করার উপযোগী একটি সাংগঠনিক মডেল অন্বেষণের উদ্দেশ্যে অ্যাকশান প্রোগ্রাম ফর ফ্লাড রিকোভারি নামে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করে। স্বল্প সময়ের মধ্যে এ প্রকল্পের পরীক্ষামূলক কর্মকান্ড দেশের ১৩টি জেলায় সম্প্রসারিত হয়। স্বনির্ভর আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামো গঠিত ছিল ছয়টি পর্যায় বা স্তর নিয়ে, যথা গ্রাম, ইউনিয়ন, থানা, মহকুমা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়। গ্রাম পরিষদ ছিল প্রাথমিক বা ভিত্তিমূলক সংস্থা। গ্রাম পরিষদের প্রধান ছিলেন একজন নির্বাচিত গ্রাম সারথি এবং এই পরিষদের চারটি বিশেষ (নির্বাচিত) কমিটি ছিল। কমিটিগুলির দায়িত্বে ছিল আইনশৃঙ্খলা, কৃষি, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা। ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়ন প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কেন্দ্রগুলি কৃষক, এক্সটেনশন এজেন্টস, জনসেবা প্রদানকারী, স্বেচ্ছাসেবক ও সমাজকর্মিসহ উন্নয়নের বিভিন্ন শরিকদের সম্মিলন ও সমন্বয়ের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করত। স্বনির্ভর আন্দোলনের জাতীয় কমিটি ছিল কেন্দ্রীয় শীর্ষ সংস্থা। এ কমিটির কাজ ছিল নিম্নতর জাতীয় পর্যায়ে এ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠানসমূহের পরিচালনা ও সমন্বয় সাধন।

স্বনির্ভর আন্দোলনের প্রধান অর্জনগুলির মধ্যে রয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, উচ্চফলনশীল শস্যের প্রচলন, স্বেচ্ছাশ্রম, অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প ও ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সমষ্টিগত কর্মোদ্যোগ ও জনগোষ্ঠীকে সংঘবদ্ধ করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রামীণ প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো নির্মাণ। স্বনির্ভর আন্দোলনের নামে বাস্তবায়িত বহুল আলোচিত প্রকল্পগুলির একটি ছিল ১৯৭৬-৭৭ সালে সম্পন্ন উলশী-যদুনাথপুর খাল খনন প্রকল্প। উল্লেখযোগ্য মাত্রার স্বেচ্ছাশ্রমের দ্বারা এ প্রকল্পের অধীনে ৪.২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি খাল খননের মাধ্যমে ১৮ হাজার একর জলাবদ্ধ এলাকার জলনিষ্কাশন ও সেচসুবিধার ব্যবস্থা করা হয়। এ প্রকল্প ৪০টি জেলার ১৩৮টি থানা জুড়ে বিস্তৃত ছিল এবং ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত এর অধীনে ৪৯,১৯,১৩৭ ব্যক্তিকে ৮২,৯৬,১১,৯৫১ টাকা ঋণ প্রদান করা হয়। জিয়াউর রহমান সরকারের স্বনির্ভর গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠান ধারণাটি স্বনির্ভর আন্দোলনের আদল থেকেই গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা সত্ত্বেও স্বনির্ভর আন্দোলন শুধুমাত্র খাদ্য উৎপাদন, জনগণের অংশগ্রহণ ও স্বেচ্ছাশ্রম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আংশিক সাফল্য লাভ করে। বাংলাদেশের পল্লীসমাজে তীব্র ও অনড় সামাজিক স্তরবিন্যাস, স্থানীয় অভিজাত শ্রেণীর অসহযোগিতা, আমলাতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের আধিপত্য, গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানসমূহের সীমিত সামর্থ্য, জনসম্পৃক্তির প্রতি প্রণোদনার সীমাবদ্ধতা, প্রয়োজনীয় অর্থ ও লজিস্টিক সুবিধাদির অপ্রতুলতার কারণে স্বনির্ভর আন্দোলনের কর্মকান্ড অনেক ক্ষেত্রেই বাধাগ্রস্ত ও ব্যর্থ হয়েছে। তবে উল্লিখিত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়নের নীতি ও কর্মসূচিতে স্বনির্ভর আন্দোলনের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়েছে। পরবর্তীকালের সংস্কার কর্মসূচিগুলিতে গ্রাম পর্যায়ের সংগঠন, সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা, আদর্শ ও মূল্যবোধের শিক্ষা, গ্রাম পুনর্গঠনের ব্যাপারে সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি, উন্নয়ন কর্মকান্ডে গ্রামবাসীদের সকল অংশকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ গুরুত্ব পেয়েছে।  [নিয়াজ আহমদ খান]