স্ট্যাটিসটিক্যাল অ্যাকাউন্ট অব বেঙ্গল


স্ট্যাটিসটিক্যাল অ্যাকাউন্ট অব বেঙ্গল  উইলিয়ম উইলসন হান্টার কর্তৃক সংকলিত ও সম্পাদিত বিশ খন্ডের একটি গেজেটিয়ার গ্রন্থ। সাম্রাজ্যিক প্রয়োজন মেটানো এবং ব্রিটিশ উপনিবেশসমূহের বিভিন্ন অঞ্চলের তথ্যাবলি সম্পর্কে সরকার ও পাঠক সাধারণকে অবহিত করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ঔপনিবেশিক সরকারগুলিকে প্রশাসনিক ইউনিটসমূহের গেজেটিয়ার প্রণয়ন করতে নির্দেশ দেয়। ভৌগোলিক, পারিপার্শ্বিক, জাতিতাত্ত্বিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিসংখ্যানগত বিবরণ এই গেজেটিয়ারে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য শর্ত দেয়া হয়। বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার উইলিয়ম গ্রের সরকার (১৮৬৭-১৮৭১) গভর্নর জেনারেলের মাধ্যমে  ভারত সচিব কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে পার্লামেন্টের নির্দেশ পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ইতোমধ্যে আই.সি.এস কর্মকর্তা স্যার উইলিয়ম হান্টারের বেশ কতগুলি গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ায় তিনি একজন পন্ডিত হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। এই ব্যাপক কর্মযজ্ঞ পরিচালনার গুরু দায়িত্ব তাই হান্টারের ওপর অর্পিত হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য হান্টারকে আনুষঙ্গিক সব ধরনের ব্যবস্থা প্রদান করা হয়। প্রকল্পের শর্তানুসারে স্থির হয়, হান্টার তাঁর অধীনস্থদের নিয়ে ১৮৬৯ সালে কাজ শুরু করবেন এবং ১৮৭৫ সালের মধ্যে তা সম্পন্ন করবেন।

প্রকল্প প্রধান হিসেবে হান্টারকে সংকলন প্রক্রিয়া সম্পর্কে নির্দেশ প্রদান, পান্ডুলিপি গ্রহণ ও সেগুলি সম্পাদনা করে ছাপানোর জন্য প্রেরণ করতে হতো। এগুলির চূড়ান্ত বিন্যাস, ভাষা শৈলী এবং ছাপা ও প্রকাশনার সকল খুঁটিনাটি পরিচালনা করা ছিল তাঁর দায়িত্ব। এ দায়িত্বে তাঁকে সাহায্য করার জন্য পাঁচজন সরকারি কর্মকর্তাকে তাঁর অধীনে ন্যস্ত করা হয়। যে জেলার তথ্য সংগ্রহ করা হবে সেই জেলায় কালেক্টর, ম্যাজিস্ট্রেট, জজ ও এস.পি-কে প্রকল্পের কাজে সহযোগিতা করার এবং অগ্রাধিকারভিত্তিতে সকল তথ্য সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় বিজ্ঞপ্তি প্রচার করার নির্দেশ দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে সংগৃহীত তথ্য মূলত ছিল পরিসংখ্যান জাতীয় এবং এগুলির বেশিরভাগ পাওয়া যেত বিভিন্ন রেকর্ড পত্রে। যেসব রেকর্ড প্রকল্পকে সরবরাহ করা হয় তার মধ্যে ছিল  থাকবস্ত জরিপ  (১৮৪২-১৮৬৫) বিষয়ক তথ্যবলি,  রাজস্ব জরিপ (১৮৫০-১৮৭০) বিষয়ক তথ্যাবলি, জমিদারির দলিল-দস্তাবেজ, সেটেলমেন্ট রেকর্ড, সরকারি রিপোর্ট, জেলার পুরানো রেকর্ড ইত্যাদি।

গেজেটিয়ার তথ্যগতভাবে পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য করার জন্য উইলিয়ম হান্টারকে এক বছরের ছুটি মঞ্জুর করা হয়, যাতে তিনি বিলেতে গিয়ে  ইন্ডিয়া অফিস-এর কেন্দ্রীয় আর্কাইভস, সেদেশের অন্যান্য আর্কাইভস ও মিউজিয়ামে গভীরভাবে তথ্যানুসন্ধান করে চূড়ান্ত পান্ডুলিপি তৈরি করতে পারেন। প্রথম দিকে পরিকল্পনা ছিল প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ জেলার ওপর একটি করে স্বতন্ত্র খন্ড প্রকাশ করার। তবে পরবর্তী পর্যায়ে এ পরিকল্পনা পরিবর্তন করে বিশ ভল্যুমেই গেজেটিয়ার সম্পূর্ণ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিহার, উড়িষ্যা, ছোট নাগপুর ও আসাম এই সময় বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত থাকায় ৪৭টি জেলার সবগুলির তথ্য উনিশ ভল্যুমে সংকলন করা হয়। বিশতম ভল্যুম সংকলনের জন্য বিষয় রাখা হয় মৎস্য ও উদ্ভিদ বিষয়ে তাবৎ তথ্য। সুতরাং প্রত্যেক ভল্যুমে অন্তত দুইয়ের অধিক জেলার বিবরণ লিপিবদ্ধ করতে হয়। মোটামুটি পূর্ববঙ্গের যে সকল জেলা নিয়ে আজকের বাংলাদেশ গঠিত সেগুলির বিবরণ লিপিবদ্ধ হয় মোট সাত খন্ডে।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই গেজেটিয়ার তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়। চূড়ান্ত প্রতিবেদন ১৮৭৬ সালে লন্ডন থেকে ‘স্ট্যাটিসটিক্যাল অ্যাকাউন্ট অব বেঙ্গল’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। উইলিয়ম হান্টার এই বিশাল গেজেটিয়ার-এর সংকলক, সম্পাদক ও প্রকল্প পরিচালক হিসেবে সরকারের ধন্যবাদ ও অকুণ্ঠ প্রশংসা অর্জন করেন। যেভাবে হান্টার বিভিন্ন উপাদান থেকে প্রাপ্ত বিচিত্র বিষয়াবলিকে সুবিন্যস্ত আকারে ওজস্বী ভাষায় ধারাবাহিকভাবে পরিবেশন করেন, তার জন্য তিনি সুধীজন দ্বারা বিপুলভাবে সংবর্ধিত হন। উনিশ শতকের বাংলার বিভিন্ন জেলার একটা রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে স্ট্যাটিসটিক্যাল অ্যাকাউন্ট অব বেঙ্গল-কে পন্ডিতগণ এখনও নির্ভরযোগ্য বিবেচনা করেন। ১৮৭৬ সালের পর থেকে গেজেটিয়ার-এর বহু সংস্করণ লন্ডন ও ভারত থেকে প্রকাশিত ও পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। এ থেকে এর উপযোগিতার প্রমাণ মেলে। অনেক সরকারি কর্মকর্তা স্বউদ্যোগে বাংলার বিভিন্ন জেলা সম্পর্কে গেজেটিয়ার প্রকাশ করেছেন। কিন্তু নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে স্ট্যাটিসটিক্যাল অ্যাকাউন্ট অব বেঙ্গল এক্ষেত্রে এখনও অগ্রগণ্য। অন্যান্য গেজেটিয়ারগুলি পরিসংখ্যানের চাইতে বরং স্থানীয় ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠানাদির ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছে।  [সিরাজুল ইসলাম]

আরও দেখুন গেজেটিয়ার অব বেঙ্গল