স্টক এক্সচেঞ্জ


স্টক এক্সচেঞ্জ  একদা ছিল বিভিন্ন কোম্পানির ‘স্টক’ ব্যবসার কেন্দ্র। কিন্তু বর্তমানে স্টক এক্সচেঞ্জ কম্পিউটার নির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাসম্পন্ন শেয়ার ব্যবসার একটি সহায়ক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে, এখনো পর্যন্ত স্টক এক্সচেঞ্জের একটি ঠিকানা অক্ষুন্ন রয়েছে যা প্রশাসনিক ও যোগাযোগের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। অন্যান্যের মধ্যে যে সকল কার্যাবলী একটি স্টক এক্সচেঞ্জ-এ সম্পাদিত হয়, সেগুলি হচ্ছে: (১) শেয়ার, বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডসহ সিকিউরিটিজগুলির তালিকাভুক্তকরণ; (২) তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজগুলির লেনদেনের ব্যবস্থা করা; (৩) লেনদেনের প্রকৃত সময়ে অনলাইন মার্কেটের প্রতি নজর রাখা, মনিটরিং করা এবং লেনদেন কার্যক্রমের বিধিবিধান প্রতিপালন হচ্ছে কিনা তা পরীক্ষা করা; (৪) সম্পাদিত লেনদেন চূড়ান্ত করে নিস্পত্তি করা এবং (৫) নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) এর নির্দেশ অনুযায়ী যে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

১৯৫৬ সালে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় স্টক এক্সচেঞ্জ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড এ শেয়ার বেচাকেনা শুরু হয়। ১৯৯৪ সালে কোম্পানি আইনের আওতায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ নিবন্ধিত এবং এটি ব্রোকারদের কর্তৃক মালিকানাকৃত। এটি একটি স্ব-নিয়ন্ত্রিত সংস্থা যার প্রশাসনিক কার্যাবলী ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইন এবং মেমোরেন্ডাম ও আর্টিকেলস অব এ্যাসোসিয়েশন, সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ ১৯৬৯, সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ বিধি ১৯৮৭ এবং এসইসি কর্তৃক ইস্যুকৃত অন্যান্য বিধি বিধানের আলোকে পরিচালিত হয়।

২৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিচালনা বোর্ড ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড (ডিএসই) এর প্রশাসনিক ও অন্যান্য সকল কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এর মধ্যে ১২ জন সদস্য ব্রোকারদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হন এবং ১২ জন সদস্য এসইসি’র অনুমোদনক্রমে এক্সচেঞ্জের বাইরে থেকে বাছাই করা হয়। পরিচালালনা্ বোর্ডের অপর সদস্য হচ্ছেন এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। তাঁর কোন ভোটদানের ক্ষমতা নাই। পরিচালনা বোর্ড তিন বৎসর মেয়াদের জন্য গঠন করা হয়।

অবশ্য, জাতীয় সংসদে পেশতব্য পৃথক একটি আইনের মাধ্যমে ব্রোকারদের মালিকানাধীন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে ইতোমধ্যে ডি-মিউচুয়ালাইজেশন প্রক্রিয়ায় আনা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ডিএসই’র প্রশাসনিক ও ব্যবসায়ীক পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। ডিএসই দায় সীমাবদ্ধতার মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডারদের কোম্পানিতে রূপান্তরিত হবে। আইনের অনুমোদন সাপেক্ষে এটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

বর্তমানে ডিএসইর সদস্য সংখ্যা ২৩৬, এর মধ্যে ২১৮ জন সদস্য সক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে সম্পৃক্ত রয়েছেন। অবশ্য সংঘস্বারক অনুযায়ী বাকি ১৪টি সদস্যপদ বর্তমানে বিক্রয়ের প্রক্রিয়ায় আছে। এর সকল সদস্যই ব্রোকার যদি তারা এসইসি’র লাইসেন্স নিয়ে এক্সচেঞ্জে লেনদেনের কাজ করে থাকেন। সব ব্রোকার এসইসির লাইসেন্সধারী, অনেকে ডিলার হিসাবেও কাজ করেন। ডিলাররা তাদের স্ব-স্ব একাউন্টের মাধ্যমে শেয়ার কেনা-বেচা করতে পারেন, যা ব্রোকাররা পারেন না। ব্রোকাররা শুধুমাত্র গ্রাহকদের পক্ষে বেচা-কেনা করতে পারেন।

তালিকাভুক্ত কোম্পানিসমূহের ইস্যুকৃত শেয়ার এখন কাগুজে স্টক নয়। বর্তমানে সেগুলি সংশ্লিষ্ট তহবিলের ইউনিট হিসাবে কেন্দ্রীয় ডিপোজিটারি তহবিলের (সেন্ট্রাল ডিপোজিটারি অব বাংলাদেশ লিমিটেড, সিডিবিএল) হিসাবে জমা থাকে। অর্থাৎ, স্টকস বা শেয়ারগুলো এখন কাগুজে নয়, ববং এগুলি ইলেকট্রনিক স্টকস এবং এর প্রতিটির হিসাব সিকিউরিটি ডিপোজিটারি আইন ১৯৯৯ এর আওতায় গঠিত পূর্বোল্লিখিত সিডিবিএল কর্তৃক রক্ষিত হয়। এসইসি সিডিবিএল-এর নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

এপ্রিল, ২০১২ পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ২৩৫টি কোম্পানি, ৪০টি মিউচুয়াল ফান্ডস এবং ৮টি ডিবেঞ্চার তালিকাভুক্ত  হয়েছে। এগুলির মোট মার্কেট পুঁজির পরিমাণ ৩২.৪৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশে আরও একটি স্টক এক্সচেঞ্জ রয়েছে। ১৯৯৫ সনে চালুকৃত এই এক্সচেঞ্জটির নাম চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)। সিএসই’র প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম কমবেশি ডিএসই’র অনুরূপ। কোন কোন ক্ষেত্রে বিশেষ করে লেনদেন প্রশাসন ও ব্যবসা পদ্ধতিতে সংস্কার সাধন এবং উৎকর্ষের বিষয়ে সিএসই ডিএসই’র চেয়ে এগিয়ে গেছে। সিএসইতেও বর্তমানে ডি-মিউচুয়ালাইজেশন প্রক্রিয়া চলছে। ডিএসই ও সিএসই উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে দেশে একটিমাত্র ডি-মিউচুয়ালাইড স্টক এক্সচেঞ্জ থাকলেই চলবে। অবশ্য বর্তমানে বিদ্যমান দুটি স্টক একচেঞ্জেরই অস্তিত্ব টিকে থাকতে পারে, যদি এসইসি তেমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

বাংলাদেশ স্টক মার্কেট বছরের পর বছর ধরে পূঁজিবাজারের ব্যবসার বিকাশ ও সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে এসেছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি কর্তৃক প্রদত্ত নীতিগত সহায়তা পূঁজিবাজারকে সুসংহত ও অংশিদারিত্বমূলক করেছে।  [আবু আহমেদ]