সেন ভাস্কর্য


সেন ভাস্কর্য  সেন যুগের (আ. ১০৯৭-১২২৩ খ্রি) শিল্পকলা চর্চার প্রতিনিধিত্বকারী হিন্দু দেব-দেবীর ভাস্কর্য প্রচুর পরিমাণে পাওয়া গিয়েছে। শৈল্পিক দিক বিচারে সেন ভাস্কর্যেও এগারো শতকের শেষভাগ পর্যন্ত প্রচলিত পাল শিল্পরীতির ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়। পালযুগের শেষ পর্বের মূর্তির একহারা ছিপছিপে গড়ন সেন যুগেও অব্যাহত থাকে। তবে প্রতিমা গড়ার মানের দিক থেকে অধোগতি লক্ষিত হয়।

চিত্র ১: বিষ্ণু, চুরাইন, ঢাকা

সেন ভাস্কর্যের গঠনরীতির উদাহরণ হিসেবে তারিখ সংযুক্ত দুটি মূর্তির কথা বলা যেতে পারে। এদের মধ্যে দিনাজপুরের রাজিবপুরে প্রাপ্ত সদাশিবের মূর্তিটি তৃতীয় গোপালের (আনু. ১১২৯-৪৩ খ্রি) রাজত্বকালে এবং ঢাকার ডালবাজারে প্রাপ্ত চন্ডী মূর্তিটি  লক্ষ্মণসেনের তৃতীয় রাজ্যাঙ্কে উৎকীর্ণ হয়। এ যুগের প্রচুর প্রস্তর ভাস্কর্য অলঙ্করণ দ্বারা সমৃদ্ধ ছিল। প্রতিমার অবয়ব তৈরিতে পূর্বের ধারা বজায় থাকলেও তার মধ্যে এক ধরনের অবক্ষয় লক্ষ্য করা যায়। এ ধারার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ বর্তমানে কলকাতাস্থ ভারতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রংপুরে প্রাপ্ত বিষ্ণু মূর্তি। ধাতুর ঢালাই শিল্পের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ  হচ্ছে ঢাকার চুরাইনে প্রাপ্ত রূপার তৈরী বিষ্ণু মূর্তি (চিত্র-১)। এই মূর্তির আকার এগারো শতকের মূর্তিগুলির চেয়ে যথেষ্ট সম্প্রসারিত। পাগুলি স্তম্ভের মতো এবং বেশ শক্ত করে গড়া, গোল বৃত্তাকারে খোদাই করে হাঁটু স্পষ্ট করা হয়েছে। কালোপাথর কেটে প্রকৃত দেহ ফুটিয়ে তোলা এবং দেহের প্রধান অংশ স্পষ্ট করার বদলে দেহের বক্রতা প্রকাশ করার প্রবণতা ছিল বেশি এবং বেশ উঁচু করে এসব মূর্তি নির্মাণ করা হতো। সম্পূর্ণ আঙ্গিক বিচারে মূর্তিগুলির প্রকাশভঙ্গিতে একটি নিষ্প্রভ ভাব এবং গতানুগতিকতা স্পষ্ট ধরা পড়ে। কোন কোন মূর্তির মুখে জোর করে যেন হাসির ভাব ফোটানো হয়েছে। শাক্ত থেকে প্রাপ্ত দুর্গার প্রস্তর মূর্তিটি (চিত্র-২) এর অন্যতম উদাহরণ। দেবীকে আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলার  স্বাভাবিক প্রবণতা থেকে এই মূর্তিটি ছিল ব্যতিক্রম।

চিত্র ২: দুর্গা, শাক্ত, ঢাকা

সাবলীল ভঙ্গিতে গড়ে তোলা বেশ কিছু সেন যুগের মূর্তি পাওয়া গেছে, যা গঠনের দিক থেকে বলিষ্ঠ ও অপেক্ষাকৃত ভাল। এদিক থেকে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে মালদহে প্রাপ্ত পাথরের তৈরী একটি মস্তকহীন গরুড় মূর্তি (চিত্র-৩) এবং পদুমশহরের একটি পুকুর থেকে প্রাপ্ত পাথরের তৈরী বিষ্ণুর প্রকান্ড মাথা (চিত্র-৪)। এই দুই মূর্তিই বর্তমানে রাজশাহীর  বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। অপেক্ষাকৃত ভাল প্রতিমার উদাহরণ হিসেবে কিছু মিশ্র ধারার তৈরী মূর্তির কথা বলা যেতে পারে। এই ধরনের ভাস্কর্যের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে রাজশাহী জাদুঘরে সংরক্ষিত পাথরের তৈরী অর্ধনারীশ্বরের মূর্তি (চিত্র-৫)। চমৎকার খোদাই করে মূর্তিটি নির্মাণ করা হয়েছে। মূর্তির বাম দিকের অর্ধেক অংশ উমা এবং ডান দিকের অর্ধেক অংশ শিব। এ যুগের মিশ্র রীতির ভাস্কর্যের অন্য উদাহরণ হচ্ছে বর্তমানে ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত বিক্রমপুরে প্রাপ্ত আপিতাকুচ (Apitakuca)-এর প্রস্তর মূর্তি (চিত্র-৬)। গঠন শৈলীর দিক থেকে এটি অত্যুৎকৃষ্ট। মূর্তিটি শুধু সূক্ষ্মভাবে খোদাই করাই নয়- নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দেবীর মুখাবয়ব, অর্ধ নীমিলিত অাঁখি, ভ্রু এবং ঠোঁট। এ যুগের অন্যান্য ভাস্কর্যের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতায় শক্ত পাথরের উপর একটি শান্ত সমাহিত এবং সশ্রদ্ধ ভাব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

চিত্র ৩: মস্তকহীন গরুড় মূর্তি, মালদা

মিশ্র রীতির ভাস্কর্য হিসেবে উমা-মহেশ্বর আলিঙ্গন মূর্তি (চিত্র-৭) আরেকটি ধারা, তবে তা আপিতাকুচ-এর গঠন শৈলীকে রক্ষা করতে পারে নি। মনে হয় এ সকল মূর্তি সেন যুগে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এই ধরনের মূর্তি বাংলাদেশের প্রায় সকল জাদুঘরেই রয়েছে। একই ধারার মূর্তি শিবকে ললিতাসনে পদ্ম সিংহাসনে বসানো হয়েছে। উমা ঘনিষ্ঠ আলিঙ্গনে শিবের বাম উরুতে উপবিষ্ট। মূর্তিগুলির পেছনের কালো পাথরখন্ড অন্যান্য দেব-দেবীতে ঠাসা, আর চার পাশে লতাপাতার স্থাপত্যিক অলংকরণ খোদিত। এই ধারার অন্য মূর্তি হচ্ছে লক্ষ্মী-নারায়ণ মূর্তি। এটি শৈব উমা-মহেশ্বর মূর্তির পাশাপাশি একটি দুষ্প্রাপ্য বৈষ্ণব মূর্তি। সহজ সরল ভঙ্গিতে তৈরি মিশ্র ধারার এই মূর্তিটি বর্তমানে ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত। নির্মাণ শৈলীর উৎকর্ষ ছাড়াও এই ধারার শৈব, বৈষ্ণব ও জৈন মূর্তিগুলিতে স্বর্গীয় শান্ত ভাবের বদলে মোহনীয় রূপ বেশি প্রকাশ পেয়েছে। প্র্ধান মূর্তির পাশে বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি সংযোজন, সূক্ষ্মভাবে লতা-পাতা ও অন্যান্য অলঙ্করণ ফুটিয়ে তোলা এবং মূল স্থাপত্য থেকে স্পষ্টভাবে কালো পাথরকে বিভক্ত করা প্রভৃতি দিক বিচারে একাদশ শতাব্দীর মূর্তিগুলির চেয়ে দ্বাদশ শতাব্দীর মূর্তিগুলি অনেক বেশি স্পষ্ট ছিল। অনেক মূর্তিতে লতাপাতা ও অন্যান্য গতানুগতিক অলঙ্করণ অনুপস্থিত। এসব ক্ষেত্রে পেছনের পাথরকে পূর্ণ করা হয়েছে অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মূর্তি স্থাপন করে। এগুলির মধ্যে বর্তমানে ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত শঙ্করবান্ধাতে প্রাপ্ত কল্যাণ-সুন্দরের মূর্তি উল্লেখ করা যেতে পারে। পাথরের কাজে বাঙালি ভাস্করগণের দক্ষতা ও ক্ষমতার কথা এই মূর্তি দেখে বুঝতে পারা যায়। কিন্তু পাথরের গায়ে পরিপূর্ণ বিন্যাসে অদক্ষতার ছাপ ছিল। তদুপরি কোন কোন মূর্তির কঠিন মুখাবয়বের মধ্যে ভাস্কর্যের প্রধান আঙ্গিক ছিল সীমাবদ্ধ। সেন যুগের অনেক ভাস্কর্যের ভেতরে অতিরিক্ত  দেবদেবীর মূর্তি বা অলঙ্করণের প্রাচুর্য ছিল না, তবে সেখানে মুখাবয়বে কঠিন ভাব ফুটিয়ে তোলার একই রকম বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। এই ধারার ভাস্কর্যের অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে বর্তমানে মহাস্থানগড় জাদুঘরে সংরক্ষিত কুমারী বলে প্রাথমিক ভাবে চিহ্নিত একটি মূর্তি। বাংলাদেশে এই জাতীয় মূর্তির এটি একমাত্র উদাহরণ। ভাস্কর্যের মুখমন্ডল চমৎকারভাবে খোদাই করা এর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। মূর্তির মুখে মৃদু হাসির রেখার মধ্যে আধ্যাত্মিক ভাব তেমন একটা প্রকাশিত হয় নি। এই বৈশিষ্ট্য পরবর্তীকালের সকল মূর্তিতেই লক্ষ্য করা যায়।

চিত্র ৪: বিষ্ণুর খন্ডিত মাথা, পদুমশহর

প্রাচীন বাংলার ভাস্কর্য রীতিতে মূর্তির ধ্যানমগ্নতার ভেতর একটি পরম সুখী ভাব ফুটিয়ে তোলা হতো। কিন্তু সেন পর্বে তা একেবারেই অনুপস্থিত। তার বদলে এ সময় মূর্তির মুখাবয়বে ফুটে উঠেছে গভীর আনন্দের ভাব। রাজশাহীর মান্দইলে প্রাপ্ত এবং রাজশাহী জাদুঘরে সংরক্ষিত পাথরের পার্বতী মূর্তি, গণেশপুরে প্রাপ্ত পাথরের শিব এবং কামদেবের মূর্তি; সুনাইলে প্রাপ্ত এবং বগুড়ার মহাস্থানগড় জাদুঘরে সংরক্ষিত পাথরের ললিতা মূর্তি, মাধাইনগরে প্রাপ্ত পাথরের তৈরী গৌরী মূর্তি এবং মোরইলে প্রাপ্ত পাথরের অম্বিকা মূর্তি   (চিত্র-৮); রংপুর জাদুঘরে সংরক্ষিত পাথরের মনসা মূর্তিসমূহ হচ্ছে এ জাতীয় ভাস্কর্যের কিছু নমুনা। এ ধরনের ভাস্কর্যের কোন কোনটি চমৎকার নির্মাণ শৈলীর পরিপূর্ণ প্রকাশ এবং আকর্ষণীয় দেহ সৌষ্ঠব ছিল, যা ছিল সেন যুগের ভাস্কর্যের উৎকৃষ্ট নমুনা। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে রংপুর জাদুঘরে সংরক্ষিত চার হাত বিশিষ্ট পাথরের মনসা মূর্তি। দেবীর গায়ে রয়েছে জমকালো পোশাক এবং অলংকার, দামি চুল পরানো আছে মাথায়, বক্ষদেশ আবরণকারী পোশাক ছিল স্পষ্ট। এই উজ্জ্বল দ্যুতিময় দেবীর অপর নাম তাই জগৎগৌরী। প্রতীমা নির্মাণের দৃষ্টিতে মূল দেহটি অবশ্য কিছুটা প্রস্তরীভূত হয়ে আছে এবং পেছনের পাথরটি ছিল গতানুগতিক অলঙ্করণে পূর্ণ। এই চমৎকার ভাস্কর্যটিতে সেন যুগের রীতিই প্রতিফলিত হয়েছে।

‘গঙ্গা’-র মূর্তির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর ভেতর পার্থিব ও ইন্দ্রিয়পরায়ণতার প্রকাশ। বাংলাদেশে এই দেবীর বেশ কয়েকটি মূর্তির অস্তিত্বের কথা জানা যায়। তবে রাজশাহী জাদুঘরে সংরক্ষিত সেন যুগের মূর্তিটি এর ইন্দ্রিয়-গ্রাহ্য দেহাবয়ব ও চমৎকার নির্মাণ শৈলীর জন্য অন্যসব মূর্তিকে ছাড়িয়ে গেছে। মূর্তিটির সম্পূর্ণতা এবং এর নির্মাণ শৈলীতে মুন্সিয়ানা বিশেষ ভাবে লক্ষণীয়। দেবীর পরণে রয়েছে প্রচুর অলঙ্কার ও পোশাক। তবে অন্যসব মূর্তির মতো এ ধরনের মূর্তিতে ছাঁচে ঢালা দেহ গঠনের প্রভাব পড়ে নি। গভীরভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে খোদাই করা নাভি দেখে মাংসের কোমল অবস্থান যেন বুঝতে পারা যায়। অবশ্য এটি ভারতীয় ভাস্করদের জন্য নতুন কোন নির্মাণ কৌশল নয়। তবে সাঁচির ভগ্নমূর্তি ছাড়া কোথাও এই পদ্ধতির সফল ব্যবহার হয় নি। মূর্তির বহিরঙ্গকে মসৃণ করার মধ্য দিয়ে দেবীর মুখে হাসির রেখা এবং যৌবন দীপ্ত শরীর স্পষ্ট হয়েছে।

গঙ্গা ও অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তিতে বিলাসী পোশাক ও অলঙ্কারের ব্যবহার দেখে সেন যুগের শাসক ও অভিজাতদের বিলাসী জীবন সম্পর্কে ধারণা করা যায়। সেন ভাস্কর্যের ইন্দ্রিয়পরায়ণ দেহাবয়বের গঠন রীতি দেখে সে যুগের শাসকবর্গ ও উচ্চ শ্রেণীর মানুষেরা সমাজে কি ধরনের সংস্কৃতি লালন করতেন সে সম্পর্কে আভাস পাওয়া যায়। ইন্দ্রিয়পরায়ণতা ও সাবলীল ভাব পূর্বতন ভাস্কর্য রীতিতে প্রকাশিত হলেও সেন যুগে তাতে অতিমাত্রায় পার্থিব ভাব জায়গা করে নেওয়ায় এ ক্ষেত্রে কিছুটা অধোগতি লক্ষ্য করা যায়। কিছু মহৎ উদাহরণ বাদ দিলে সেন যুগের ভাস্কর্য অধোগতির ধারায়ই এগিয়ে গিয়েছিল এবং তা থেকে প্রমাণিত হয় বারো শতকের শেষ দিকে শিল্প ঐতিহ্য নিঃশেষিত হয়ে পড়েছিল।  [শামসুল আলম]

গ্রন্থপঞ্জি  NK Bhattasali, Iconography of Buddhist and Brahmanical Sculptures in the Dacca Museum, Dacca, 1929; RD Banerjee, Eastern Indian School of Medieval Sculpture, Delhi, 1933; AKM Shamsul Alam, Sculptural Art of Bangladesh, Dhaka, 1985.