সেন, গিরিশচন্দ্র


সেন, গিরিশচন্দ্র  (১৮৩৫-১৯১০)  ধর্মবেত্তা ও অনুবাদক। বাংলা ভাষায়  কুরআন শরীফের সার্থক ও পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ তিনিই প্রথম করেন। নারায়ণগঞ্জের পাঁচদোনা গ্রামে তাঁর জন্ম। পেশাগত জীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি ময়মনসিংহের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের কাচারিতে নকলনবিশ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে স্বল্প সময়ের জন্য ময়মনসিংহ জেলা স্কুলে শিক্ষকতা করে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। প্রথম পর্যায়ে তিনি ঢাকা প্রকাশে কাজ করেন এবং এতে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। পরে তিনি সুলভ সমাচার ও বঙ্গবন্ধু পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক এবং মাসিক মহিলা (১৩০২) পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

গিরিশচন্দ্র সেন

ছাত্রজীবনে তিনি ফারসি ও সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করেন। কেশবচন্দ্র সেন ও বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর প্রভাবে ১৮৭১ সালে তিনি ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন এবং প্রচারব্রত গ্রহণ করে উত্তর ভারত, দক্ষিণ ভারত ও ব্রহ্মদেশ ভ্রমণ করেন। গুরু কেশবচন্দ্র সেনের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় তিনি ইসলামি সাহিত্য-সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। এ উপলক্ষে আরবি ভাষা ও ইসলামিক ধর্মশাস্ত্র চর্চার জন্য তিনি ১৮৭৬ সালে লক্ষ্ণৌ গমন করেন। সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করে কুরআনের বঙ্গানুবাদ (১৮৮১-৮৬) সম্পন্ন করেন। বাংলা সাহিত্যে এটা তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি। ধর্ম সম্পর্কে জানার আগ্রহ, চারিত্রিক উদারতা এবং সত্যবাদিতার জন্য গিরিশচন্দ্র ব্রাহ্ম-হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করেন। এক কথায় তিনি ছিলেন সর্বধর্মসমন্বয়ের প্রতীক। তাই সকলের নিকট তিনি ‘ভাই গিরিশচন্দ্র’ নামে পরিচিত ছিলেন।

গিরিশচন্দ্রের বিখ্যাত গ্রন্থ তাপসমালা (১৮৮০-৯৫) ৯৬ জন ওলি-আউলিয়ার জীবনচরিত, যা শেখ ফরীদুদ্দীন আত্তারের ফারসি ভাষায় রচিত তায্কেরাতুল আত্তলিয়ার ভাবাদর্শে রচিত। তিনি হাদিস-পূর্ব বিভাগ (১৮৯২) শিরোনামে মিশ্কাত শরীফের প্রায় অর্ধাংশের অনুবাদ প্রকাশ করেন। গিরিশচন্দ্রের উল্লেখযোগ্য আরেকটি গ্রন্থ হলো তত্ত্বরত্নমালা (১৯০৭)।

এটি শেখ ফরীদুদ্দীন আত্তারের মানতেকুত্তায়েব ও মওলানা জালালউদ্দীন রূমীর মসনবী শরীফ নামক প্রখ্যাত ফারসি গ্রন্থদ্বয় থেকে সংকলিত। এতে নীতিকথা ও শিক্ষণীয় বিষয় ছোট ছোট গল্পের আকারে রসাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া তিনি মূল ফারসি গ্রন্থ থেকে গুলিস্তাঁ ও বুস্তাঁর হিতোপাখ্যানমালা, হাদিস বা মেসকাত্ মসাবিহ (১৮৯২-৯৮), দীউয়ান-ই-হাফিজ প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থ, মহাপুরুষচরিত (১৮৮২-১৮৮৭), মহাপুরুষ মোহাম্মদ ও তৎপ্রবর্তিত এসলাম ধর্ম, এমাম হাসান ও হোসায়নের জীবনী (১৯১১), চারিজন ধর্মনেতা, চারটি সাধ্বী মুসলমান নারী, খলিফাবর্গ, সবমিলিয়ে ৪২টি পুস্তক বাংলা ভাষায় রচনা ও প্রকাশ করেন। বইগুলি মুসলিম সমাজে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়। তিনি রামমোহন রায় রচিত ইসলাম সম্বন্ধীয় গ্রন্থ তুহ্ফাৎ-উল-মুয়াহ্হিদীনের (১৮৭৮) বঙ্গানুবাদ করে ধর্মতত্ত্ব পত্রিকায় প্রকাশ করেন। স্কুলে অধ্যয়নকালে তিনি স্ত্রীশিক্ষার আবশ্যকতা প্রচারকল্পে বনিতাবিনোদন নামে একটি পুস্তক প্রকাশ করেন। রামকৃষ্ণ পরমহংসের উক্তি ও জীবনী তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তাঁর আত্মজীবনী গ্রন্থটি ১৯০৬ সালে প্রকাশিত হয়। [সমবারু চন্দ্র মহন্ত]