সেন, আশালতা


সেন, আশালতা (১৮৯৪-১৯৮৬)  ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় কর্মী, স্বাধীনতা সংগ্রামী, কবি ও সমাজসেবক। ১৮৯৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালীতে তাঁর জন্ম। পিতা বগলামোহন দাশগুপ্ত ছিলেন নোয়াখালী জজ কোর্টের আইনজীবী। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বিক্রমপুরের বিদগাঁও গ্রামে।

বাল্যকাল থেকেই আশালতার মধ্যে সাহিত্যানুরাগ প্রকাশ পায়। ১৯০৪ সালে মাত্র দশ বছর বয়সে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে মাসিক অন্তঃপুর পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর জাতীয়তাবাদী কবিতা সুধীসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরিণত বয়সে তিনি বাল্মীকি রামায়ণের যুদ্ধকান্ডের সংক্ষিপ্ত কাব্যানুবাদ করেন। তাঁর অন্যান্য রচনা: উচ্ছ্বাস, উৎস, বিদ্যুৎ ও ছোটদের ছড়া। শেষ বয়সে তিনি একটি আত্মজীবনীও রচনা করেন।

মাতামহী নবশশী দেবীর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় আশালতা রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন কার্যকররূপ নিলে বিক্রমপুর অঞ্চলে স্বদেশী প্রচারের জন্য নবশশী দেবী, সুশীলা সেন, কমলকামিনী গুপ্তা প্রমুখ ‘মহিলা সমিতি’, ‘স্বদেশী ভান্ডার’ ইত্যাদি গঠন করেন। এ সময় নবশশী দেবী বিলাতি কাপড় বর্জনের সংকল্প-পত্রে দৌহিত্রী আশালতাকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে স্বদেশীব্রতে দীক্ষিত করেন। মাত্র এগারো বছর বয়সে আশালতা গ্রাম্য মহিলাদের স্বাক্ষর সংগ্রহকাজ অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। এভাবেই শুরু হয় তাঁর সংগ্রামী জীবন।

মাতামহীর প্রেরণায় আশালতা দেশ-বিদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন গ্রন্থ পাঠ করে স্বদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ক্রমাগত উদ্বুদ্ধ হতে থাকেন। কিন্তু পরিণয়সূত্রে তাঁকে কিছুদিন আন্দোলন থেকে দূরে থাকতে হয়। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে স্বামী সত্যরঞ্জন সেনের অকালমৃত্যুতে তিনি শিশুপুত্রকে নিয়ে অত্যন্ত বিপর্যস্ত সময় কাটান। সন্তান বয়ঃপ্রাপ্ত হলে পুনরায় তিনি রাজনৈতিক কর্মধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি শ্বশুরের সহায়তায় ঢাকার গেন্ডারিয়ায় স্বীয় বাসভবনে মহিলাদের প্রশিক্ষণের জন্য ‘শিল্পাশ্রম’ নামে একটি বয়নাগার স্থাপন করেন। ১৯২২ সালে  ঢাকা জেলার মহিলা প্রতিনিধিরূপে গয়া কংগ্রেসে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ঘটে। মহিলাদের মধ্যে দেশাত্মবোধ জাগ্রত করা এবং গান্ধীজীর বাণী প্রচার করার লক্ষ্যে ১৯২৪ সালে তিনি সরমা গুপ্তা ও সরযূবালা গুপ্তার সহযোগিতায় গঠন করেন ‘গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি’। সমিতির সদস্যরা নিজেরাই উৎপন্ন দ্রব্যের বিক্রয় ও প্রচারকার্য পরিচালনা করতেন। ১৯২৫ সালে তিনি ‘নিখিল ভারত কাটুনী সংঘের’ (এ.আই.এস.এ) সদস্য হন এবং ব্যাপকভাবে খদ্দর প্রচারে ব্রতী হন। ১৯২৭ সালে ঢাকায় মহিলা কর্মী তৈরির উদ্দেশ্যে তিনি ‘কল্যাণ কুটির আশ্রম’ স্থাপন করেন। ১৯২৯ সালে গেন্ডারিয়ার জুড়ানে শিক্ষাবিস্তারের উদ্দেশ্যে তিনি সরমা গুপ্তার সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘জুড়ান শিক্ষা মন্দির’। বক্তৃতার মাধ্যমে তাঁরা এ অঞ্চলের অনুন্নত সম্প্রদায়ের লোকদের আত্মোন্নয়নের জন্য গণচেতনা জাগ্রত করার চেষ্টা করেন।

১৯৩০ সালে মহাত্মা গান্ধীর ‘লবণ আইন’ অমান্য আন্দোলনের সময় আশালতা সেনের অসাধারণ সাহস ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি সরমা গুপ্তা, ঊষাবালা গুহ প্রমুখ সহকর্মীকে নিয়ে নোয়াখালী থেকে কিছু নোনা পানি ঢাকায় এনে করোনেশন পার্কে সর্বসমক্ষে লবণ তৈরি করে আইন অমান্য আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেন এবং বাংলার নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে আন্দোলন সংগঠিত করেন। ফলে তিনি তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে গ্রেফতার হন।

আশালতার প্রধান লক্ষ্য ছিল মহিলাদের আত্মসচেতন ও সংগঠিত করে তোলা। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধাংশ নারীসমাজ যদি নির্লিপ্ত থাকে, তারা যদি পুরুষদের কাজে সহায়তা না করে তাহলে কোনো আন্দোলনই সফল হতে পারে না। তাই তিনি অনেক নারী সংগঠন তৈরি করেন। জাগ্রত সেবিকাদল (১৯৩০, ঢাকা), রাষ্ট্রীয় মহিলা সঙ্ঘ (১৯৩১, বিক্রমপুর), নারীকর্মী শিক্ষা কেন্দ্র (১৯৩১, ঢাকা) এবং কংগ্রেস মহিলা সঙ্ঘ (১৯৩৯) সেসবের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিক্রমপুরের বিভিন্ন স্থানে মহিলা সঙ্ঘের কয়েকটি শাখাও স্থাপিত হয়। ঢাকার ‘নারীকর্মী শিক্ষা কেন্দ্রের’ শিক্ষক ছিলেন মানভূমের কংগ্রেস নেতা নিবারণ দাশগুপ্ত। শ্রীহট্ট এবং মেদিনীপুরের কাঁথিতেও অনুরূপ দুটি কেন্দ্র স্থাপিত হয়। ১৯৩৯ সালে ‘কংগ্রেস মহিলা সঙ্ঘ’ গঠনের সময় তিনি কংগ্রেসের প্রচারকার্য উপলক্ষে উত্তরবঙ্গ এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা সফর করেন।

১৯৩২ সালে গান্ধীজীর গ্রেপ্তারের পর ঢাকায়  আইন অমান্য আন্দোলন জোরদার হলে ‘গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি’কে বে-আইনি ঘোষণা করা হয় এবং ‘কল্যাণ কুটির’-এর কর্মীদের আবাসগৃহ পুলিশ তালাবদ্ধ করে রাখে। এর বিরুদ্ধে মহিলা কর্মীদের নিয়ে আন্দোলন ও প্রচারকার্য পরিচালনার সময় আশালতা আবার গ্রেপ্তার হন এবং দুটি মামলায় তাঁর সাজা হয়। ১৯৩৩ সালে মুক্তি লাভ করে তিনি ঢাকা জেলার কংগ্রেসের সহসভাপতি মনোনীত হন। ১৯৪২ সালে মহাত্মা গান্ধীর ভারত ছাড় আন্দোলনে আশালতা সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এ সময় ঢাকার তালতলায় পুলিশের গুলিতে এক যুবক নিহত হলে তার প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং সাড়ে সাত মাস সশ্রম কারাদন্ড ভোগ করেন।

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে তিনি বুভুক্ষু মানুষের ত্রাণ-তৎপরতায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৬ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থা পরিষদ এবং ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। পাশাপাশি তাঁর সমাজকল্যাণমূলক কর্মকান্ডও অব্যাহত থাকে। ১৯৬৫ সালে তিনি দিল্লিতে পুত্র সমর রঞ্জন সেনের নিকট চলে যান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আশালতা সেন এ দেশের জনগণকে নানাভাবে সাহায্য করেন এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে কয়েকটি গানও রচনা করেন। স্বাধীনতার পর তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের আমন্ত্রণে তিনি সপরিবারে ঢাকা আসেন এবং ‘গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি’র সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হন। আশালতা সেনের বাড়িটি বর্তমানে ‘গেন্ডারিয়া মনিজা রহমান বালিকা বিদ্যালয়’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৮৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তিনি দিল্লিতে পুত্রের বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন।  [সমবারু চন্দ্র মহন্ত]