সূচিশিল্প


সূচিশিল্প এক ধরনের লোকশিল্প, যা সুই-সুতা দিয়ে হাতের সাহায্যে সৃষ্টি হয়। সূচিশিল্পের দুটি ধারা লৌকিক ও পরিশীলিত।  নকশি কাঁথা লৌকিক পর্যায়ে পড়ে। অতীতে পুরানো কাপড় ও সুতা দিয়ে একান্ত ঘরোয়া পরিবেশে যে নকশাযুক্ত কাঁথা তৈরি হতো তাই নকশি কাঁথা। পরিবারের ব্যবহারিক প্রয়োজনে এ কাঁথা তৈরি করা হতো; এর সঙ্গে কোনো বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল না। নকশি কাঁথার কোনোটি হতো বর্গাকার, কোনোটি আয়তাকার। গ্রামের মেয়েরা বিভিন্ন রঙের সুতা দিয়ে নানা নকশা, কথা, ফুল, পাখি ইত্যাদি তৈরি করত। এগুলি আকার অনুযায়ী রুমাল, বালিশের কভার ইত্যাদি কাজে ব্যবহূত হতো। মেয়েদের বিয়ের সময় সূচিশিল্পে দক্ষতা অনত্যম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হতো। এসব সূচিকর্ম একান্ত প্রিয়জনকে উপহারও দেওয়া হতো।

দেড় শতাধিক বছর আগের একটি পালকি-কাঁথার চারদিকে রয়েছে কাঠঠোকরা পাড়। তার পাশে রয়েছে লাল, হলুদ, সবুজ ও কালো রঙে তৈরি বাঘের সারির অনেকটা বিমূর্ত ছবি। কেন্দ্রে আছে একটি পদ্মফুল, চারকোণায় জীবনবৃক্ষ এবং মাঝখানে ছড়ানো-ছিটানো  কল্কা, বেকিফুল ইত্যাদি; সব মিলিয়ে কাঁথাটিতে এক অপূর্ব সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়েছে। এটি যশোর এলাকার কাঁথা। যশোর, ফরিদপুর ও রাজশাহীর নকশি কাঁথাই বেশি বিখ্যাত। বর্তমানে এ সূচিকর্মটি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তৈরি করা হয়ে থাকে। ফলে এর যে মৌলিক শিল্পগুণ তা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।

সূচিশিল্পের পরিশীলিত ধারাটি স্থানিক নয়, বলা যায়, বিদেশাগত এবং বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এ শিল্প গড়ে উঠেছে। মসলিন-জামদানি প্রভৃতি কাপড়ে এ সূচিকর্মের দ্বারা বুটি তোলা হতো। রাজা-বাদশাহদের হেরেমে, বিত্তবানদের ঘরে এবং দেশের বাইরে অভিজাতদের নিকট এ শিল্পের প্রচুর চাহিদা ছিল। ১০ গজ  ১ গজ মাপের সূক্ষ্ম কাশিদা কাজে একজন সূচিশিল্পীর সময় লাগত আড়াই বছর। কাশিদাই ছিল ব্যাপকতম সূচিশিল্প। নবম শতাব্দীতে বসরা থেকে কাশিদার কাজ ঢাকায় আসে বলে অনুমিত হয়।

সূচিশিল্পে কর্মরত নারী

কার্পাস ও রেশম সুতায় বোনা কাপড়ের কার্পাস-বোনা অংশে মুগা এবং তসর সিল্কে রিপু ও সাটিন ফোঁড়ে কাশিদার বুটি তোলা হতো। টান করে কাপড় সেঁটে তার ওপর সুচ দিয়ে সোনা-রূপার কাজের নাম ছিল কারচব। এ কাজে ঢাকা বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিল। বর্তমানে একে কারচুপি, আড়ি ও ইরি বলা হয়। আড়ি ও ইরি হচ্ছে কারচবের কাজে ব্যবহূত সুচের নাম।

কারচব শিল্পের কয়েকটি বিভাগ হচ্ছে: জরদজি, কাশিদা, চিকনকারি, ফুলকুরি ও রিফুগরি। আবার সূচিকর্মে কার্পাস, রেশম ও সোনা-রূপার ব্যবহার ভেদে কাজের নাম ছিল কারচব, ঝাপান, চারখানা, কলাবতন, কারচিকা ও কামদানি। মসলিন, পশমি, সাল, রুমাল ইত্যাদির ওপর সোনারূপা ও রেশমি সুতার কাজের নাম ছিল জরদজি। সূক্ষ্ম কাপড়ের জরি বা বাদলার কাজের নাম কলাবতন বা গোলাবতন। সাদা মসলিন ও নয়নসুকের ওপর সাদা সুতার কাজের নাম চিকন, চিকনকারি বা চিকনদাজি। সুতি মসলিনের কাপড়ের ওপর সোনা-রূপার কাজের নাম কামদানি। অপেক্ষাকৃত কম সোনা-রূপার কাজের নাম কারচিকা। কার্পাস জমিনের ওপর রঙিন রেশমি সুতার কাজের নাম ফুলকুরি বা ফুলবুটি। রেশমের সঙ্গে সোনা-রূপার তার পাকানো সুতার নাম কলাবতন। এ সুতা কেবল সূচিকর্মেই ব্যবহূত হতো।

চুনাই কাজে রিফুগরেরা সিদ্ধহস্ত ছিল। তারা অতি সূক্ষ্ম মসলিন থেকে একটি আস্ত সুতা বের করে অন্য একটি সুতা সেই ফাঁক দিয়ে চালিয়ে দিতে পারত। এতে রিফুর চিহ্নমাত্র বোঝার উপায় ছিল না। ঢাকার মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের অবাঙালি শিল্পীরা কারচবের কাজ করে থাকে। পাঞ্জাবিতে চিকন ও অন্যান্য কাজ হয় মিরপুর, কচুক্ষেত, মোহাম্মদপুর, দয়াগঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চলে। এছাড়া বেডশিট, টেবিলের চাদর, সালোয়ার-কামিজ, স্কুলের পোশাক ইত্যাদিতে এখন সূচিকর্মের কাজ হয়ে থাকে।  [মোমেন চৌধুরী]