সিমেন্ট শিল্প


সিমেন্ট শিল্প  দেশে ক্রমবর্ধমান নির্মাণ কর্মতৎপরতার সাথে সাথে সিমেন্ট শিল্পও অপেক্ষাকৃত দ্রুত বিকাশমান শিল্প হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। দীর্ঘকাল ধরেই নির্মাণ কাজে ইটপাথর বা অন্যান্য বস্ত্ত দিয়ে গাঁথার কাজে সিমেন্ট সংযোজক উপাদান হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছে। প্রচলিত সিমেন্টের মধ্যে পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট বহুল ব্যবহূত যা চুন ও কাদার মিশ্রণ পুড়িয়ে পাউডারের মতো চূর্ণ করে তৈরি করা হয়। বালি ও পানির সাথে সিমেন্ট মিশিয়ে ‘মর্টার’ এবং ইট বা পাথরের টুকরা, সিমেন্ট, বালি ও পানি মিশিয়ে কংক্রিট তৈরি করা হয়। বর্তমানে (২০১০) দেশে বছরে প্রায় ১৫ মিলিয়ন টন সিমেন্ট ব্যবহূত হয়, যা দেশেই উৎপাদিত হয়। সিমেন্ট উৎপাদনে দেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও (ভারত, মিয়ানমার) এখন সিমেন্ট রপ্তানি হচ্ছে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশে জনপ্রতি সিমেন্ট ব্যবহার ছিল মাত্র ৬৫ কিলোগ্রাম। বিশেষত পার্শ্ববর্তী ভারত (১৫০ কিলোগ্রাম), ইন্দোনেশিয়া (১২৭ কিলোগ্রাম), মালয়েশিয়া (৫২৯ কিলোগ্রাম) এবং থাইল্যান্ডের (৪২৫ কিলোগ্রাম) তুলনায় এ পরিমাণ খুবই কম।

ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশে সিমেন্ট ব্যবহার কম। সিমেন্ট তৈরির প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানও অপর্যাপ্ত। এদেশে গৃহনির্মাণসহ অন্যান্য নির্মাণকাজের প্রধান উপাদান নির্বাচন এমনভাবে করা হয় যাতে সিমেন্টের ব্যবহার সামান্যই হয়। গ্রামাঞ্চলে মানুষ ঘরবাড়ি তৈরির জন্য সচরাচর পাটখড়ি, বাঁশ এবং মাটি প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে। কেবল আর্থিক বিবেচনাই নয় বরং অপেক্ষাকৃত সহজ প্রযুক্তি ও আরামদায়ক গৃহনির্মাণের তাগিদ থেকেও উপর্যুক্ত উপাদান নির্বাচন করা হয়। যারা ইট, সিমেন্ট দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী ঘরবাড়ি তৈরি করতে আগ্রহী তাদের অনেকে এর ব্যয়ভার বহনে অপারগ। এসব বিষয়ের মিলিত প্রভাব সিমেন্টের চাহিদাকে সীমিত করে রেখেছে। তবে, সাম্প্রতিককালে পূর্বতন ধারার ভবনগুলির পরিবর্তে আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণের যে প্রবণতা সূচিত হয়েছে তাতে সিমেন্টের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু যেহেতু দেশের অর্থনীতি এখনও কৃষিনির্ভর, শিল্প ও নির্মাণ খাতে এখনও দ্রুত পরিবর্তন আসেনি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন কেবল কিছু নির্বাচিত খাতেই আবর্তিত হচ্ছে বিধায় সিমেন্টের চাহিদা এখনও অনুল্লেখযোগ্যই থেকে যাচ্ছে।

আশির দশকের মধ্য থেকে কিছু বৃহদাকৃতির অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হওয়া ও বর্ধিত নগরায়ণ, শহরাঞ্চলে অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং ও বহুতল দোকানপাট নির্মাণ কাজ সম্প্রসারণ এবং গ্রামের সচ্ছলদের আধুনিক বাড়িঘরের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হওয়ায় সিমেন্টের চাহিদা তুলনামূলকভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ সিমেন্ট উৎপাদন এবং আমদানি উভয় কর্মকান্ডে প্রধান ভূমিকা পালন করছে।

স্থানীয় কাঁচামাল এবং আমদানিকৃত ক্লিনকার উভয় উপাদান থেকেই স্থানীয়ভাবে সিমেন্ট তৈরি হয়। দেশীয় কোম্পানিগুলি চীন, থাইল্যান্ড, মালয়শিয়া, ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া ও ভারত থেকে ক্লিনকার আমদানি করে। দেশের ব্যক্তিমালিকানাধীন সিমেন্ট কারখানাগুলি প্রায় ৬০ শতাংশ এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলি যেমন লাফার্জ মল্লিন্স, সিমেক্স, হলসিম, হিডেলবার্জ বাকি ৪০% সিমেন্ট উৎপাদন করে। দেশে প্রধান প্রধান সিমেন্ট কোম্পানিগুলি হলো শাহসিমেন্ট, আকিজ সিমেন্ট, ফ্রেশ, ক্রাউন, সেভেন সার্কেল, আরামিত এবং রয়েল ইত্যাদি। যে সকল সিমেন্ট কারখানা আমদানিকৃত ক্লিনকার থেকে সিমেন্ট তৈরি করে তাদের অবস্থান মূলত ঢাকা, চট্টগ্রাম ও মংলায়। ২০১০ সালে রেজিস্ট্রিকৃত সিমেন্ট কারখানার সংখ্যা ৭৪ হলেও বর্তমানে উৎপাদনে নিয়োজিত কারখানার সংখ্যা মাত্র ৩০টি। এই সকল সিমেন্ট কারখানার মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ২১ মিলিয়ন টন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত প্রতিটি ৫০ কিলোগ্রাম ওজনের সিমেন্টের বস্তা ৩৮০-৪৩০ টাকায় বিক্রয় হয়। স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে সিমেন্ট উৎপাদনের বিষয়টি স্থানীয় উৎসের ওপর নির্ভরশীল। সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, জয়পুরহাট ও সিলেট অঞ্চলে চুনাপাথরের খনি রয়েছে। ছাতক ও আয়েনপুর সিমেন্ট ফ্যাক্টরি (সিলেট অঞ্চলে) স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত চুনাপাথর থেকে সিমেন্ট উৎপাদন করে। এ দুটি সিমেন্ট কারখানার মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় তিন মিলিয়ন টন। কারখানা দুটি সিমেন্ট উৎপাদনের জন্য জ্বালানি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে। [মুশফিকুর রহমান]