সাহা, রনদা প্রসাদ


সাহা, রনদা প্রসাদ  সমাজসেবক ও শিল্পানুরাগী। আর.পি সাহা নামেই তিনি অধিক পরিচিত।  ১৮৯৬ সালের ১৫ নভেম্বর সাভার উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের কাছৈড় গ্রামে মাতুলালয়ে তাঁর জন্ম। পিতার নাম দেবেন্দ্রনাথ পোদ্দার এবং মাতার নাম কুমুদিনী দেবী। দেবেন্দ্রনাথ টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর গ্রামের অধিবাসী। দেবেন্দ্রনাথের তিন পুত্র ও এক কন্যার মধ্যে রণদা প্রসাদ দ্বিতীয়। দেবেন্দ্রনাথের পূর্ব পুরুষ ক্ষুদ্র ব্যবসার সাথে জড়িত থাকলেও দেবেন্দ্রনাথের নির্দ্দিষ্ট কোন পেশা ছিলনা। তিনি দলিল লেখক হিসেবে কাজ করতেন, কখনও কখনও তিনি লগ্নি ব্যবসাতেও জড়িত থাকতেন। রণদা মাত্র সাত বছর বয়সে মাতৃহারা হন। তৃতীয় শ্রেনির পর রণদার পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যায়। কিশোর রণদা বাড়ী থেকে পালিয়ে কলকাতা যান এবং তিনি বিভিন্ন ধরনের কায়িক শ্রম যেমন- কুলি, শ্রমিক, রিক্সা চালক, ফেরিওয়ালার প্রভৃতির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এক পর্যায়ে রণদা জাতীয়তাবাদী বা স্বদেশী আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন ও কিছুদিন হাজতবাসও করেন।

রণদা প্রসাদ সাহা

১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। ভারত থেকেও অসংখ্য তরুন যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনীতে নাম লিখায়। রনদা প্রসাদ সাহা বাঙালিদের প্রথম সামরিক সংগঠন বা ইউনিট ‘বেঙ্গল এ্যম্বুলেন্স কোর’-এ যোগ দেন। রণদা ১৯১৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে আলিপুর সেনানিবাসে ১৬ রাজপুত রেজিমেন্টের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন এবং প্রশিক্ষণ শেষে ১৯১৫ সালের ২৬ জুন মেসোপটেমিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে মুম্বাই ও বসরা হয়ে ১৫ জুলাই আমারা শহরে পৌঁছেন। সেখানে তাঁরা বেঙ্গল স্টেশনারি হসপিটাল চালু করেন। ১৯১৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর রণদা ৬ ডিভিশনের ২ ফিল্ড এ্যাম্বুলেন্সের সাথে সংযুক্ত হয়ে বাগদাদ দখলের জন্য কূট আল আমারা (সংক্ষেপে কূট)-এর উদ্দ্যেশ্যে রওনা হন। কূট দখলের পর ২ ফিল্ড এ্যম্বুলেন্স বাগদাদ অভিমুখে রওনা হয়। বাগদাদের পথে টেসিফোন অঞ্চলে পৌঁছানোর পর ২২ ও ২৩ নভেম্বর বৃটিশ বাহিনীর সাথে তুর্কী বহিনীর যুদ্ধ হয় এবং রণদা এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বৃটিশ বাহিনী এ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে কূটে ফিরে যায়। তুর্কী বাহিনী কূট অবরোধ করলে, ১৯১৬ সালের ২৯ এপ্রিল বৃটিশ বাহিনী তুর্কী বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে ও রণদা প্রসাদ সহ অন্যান্যদের যুদ্ধবন্দী হিসেবে বাগদাদ নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিকে যুদ্ধবন্দী বিনিময়ের সুবাদে ২৬ সেপ্টেম্বর রণদা প্রসাদ সাহা  কলকাতা ফেরৎ আসেন।

কলকাতায় ফিরে এসে রণদা প্রসাদ সাহা ১৯১৬ সালের নভেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে নবগঠিত  বাঙালি পল্টন-এ যোগ দেন। একই বছর ডিসেম্বর মাসে তিনি ল্যান্স নায়েক হিসেবে পদোন্নতি প্রাপ্ত হন ও ১৯১৭ সালের ২৫ আগস্ট জমাদার পদে উন্নিত হন। রণদা পুণায় অবস্থিত সেন্ট্রাল ফিজিক্যাল ট্রেনিং ও বেয়োনেট ফাইটিং স্কুল থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং ১৯১৭-এর মাঝামাঝি থেকে পল্টনের করাচী ডিপোতে প্রশিক্ষক হিসেবে বদলী হন। ১৯১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি লেফটেন্যান্ট ডি জে উইল্কস ও জমাদার রণদার নেতৃত্বে পল্টনের একটি দল দু’মাসের জন্য বাংলাদেশে এসে নতুন সৈনিক ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করেন। রণদা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেয়ে সামরিক কসরৎ আর বক্তৃতার মাধ্যমে বাঙালি তরুণদের পল্টনে যোগ দেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়। যুদ্ধবিরতির পর ইংল্যান্ডের রাজা পঞ্চম জর্জ ১৯১৯ সালের ২৯ জুলাইকে ‘শান্তি দিবস’ ঘোষণা করেন। একই তারিখে ইংল্যান্ডে ‘ভিক্টরি মার্চ’ ও ‘পিস সেলিব্রেশন’-এর আয়োজন করা হয়। সম্রাট  ৪৯তম বেঙ্গলি রেজিমেন্ট বা বাঙালি পল্টন থেকে তিনজন প্রতিনিধিকে পিস সেলিব্রেশনে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ করে। ২৫ জুন বাঙালি পল্টনের করাচী ডিপোতে অফিসার কমান্ডিং এবং করাচী ব্রিগ্রেডের স্টাফ অফিসারগণ পিস সেলিব্রেশনের জন্য প্রতিনিধি হিসেবে জমাদার হিসেবে আর পি সাহা, এনসিও হিসেবে হাবিলদার মোহিত কুমার মুন্সী এবং সিপাই (রণদার অর্ডালি) হিসেবে নিত্যগোপাল ভট্টাচার্যকে নির্বাচন করেন। এছাড়া পার্শ্বচর হিসেবে একজন ধোপা এবং একজন ঝাড়ুদারও দলভুক্ত হন। ১৯২০ সালের ১৫ অক্টোবর বাঙালি পল্টন ভেঙ্গে দিলে রণদা কলকাতা ফেরৎ আসেন।

যুদ্ধফেরৎ সৈনিকদের জন্য সরকার থেকে যোগ্যতানুযায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। রণদা রেলবিভাগে টিকেট কালেক্টর পদে চাকুরি পান। তাঁর কর্মস্থল ছিল শিয়ালদহ রেলস্টেশন থেকে দর্শনা হয়ে সিরাজগঞ্জ ঘাট রেলস্টেশন পর্যন্ত রেলপথ। তিনি ১৯৩২ সাল পর্যন্ত রেলবিভাগে চাকুরি করে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরের এককালীন অর্থ দিয়ে কলকাতায় তিনি কয়লা ও লবনের ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তীতে কয়লার ব্যবসা অধিক লাভজনক হওয়ায় লবনের ব্যবসা ছেড়ে শুধু কয়লার ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। প্রথমদিকে তিনি নিজে বাড়ি বাড়ি কয়লা সরবরাহ করতেন। পরবর্তীতে তিনি কয়লার ঠিকাদারী ব্যবসা সহ সরবরাহের কাজ শুরু করেন এবং কলকাতায় কয়লার ডিলারশিপ নেন। এতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বড় আকারের পুঁজি সংগ্রহ করেন। কয়লা ব্যবসায় মুক্তাগাছার  জমিদার সতীশ চৌধুরী রণদাকে সহায়তা করেন।

এসময় নদী পথে চালিত লঞ্চসমূহের ইঞ্জিন কয়লা দ্বারা চালিত হতো। এসকল লঞ্চ সার্ভিসের মালিকদের কেউ কেউ তাঁর নিকট দেনাদার হয়ে পড়লে তিনি দেনার বিপরীতে তাদের লঞ্চগুলি কিনে নেন। রণদা লঞ্চগুলিকে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অঞ্চলে কয়লা পরিবহনের কাজে ব্যবহার করতেন। ১৯৩৯ সালে জমিদার নৃপেন্দ্রনাথ চৌধুরী, ডা.  বিধানচন্দ্র রায়, জাস্টিস জে.এন. মজুমদার ও নলিনী রঞ্চন সরকারকে সঙ্গে নিয়ে রণদা প্রসাদ ‘বেঙ্গল রিভার সার্ভিস’ নামে একটি নৌ-পরিবহণ কোম্পানি চালু করেন। বেঙ্গল রিভার সার্ভিস মূলত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথ সমূহে মালামাল পরিবহণ করতো। নৃপেন্দ্রনাথ চৌধুরী ছিলেন কোম্পানির প্রথম ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তাঁর মৃত্যুতে রণদা ওই পদে অধিষ্ঠিত হন এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যে অন্যান্য শরিকদের কাছ থেকে সকল অংশ কিনে নিয়ে কোম্পানির একক মালিকানা লাভ করেন। প্রকৃতঅর্থে এ অবস্থান থেকেই রণদা প্রসাদ সাহার উত্থান শুরু। তিনি কোম্পানির লঞ্চগুলির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্দেশ্যে নারায়নগঞ্জে একটি ডকইয়ার্ড নির্মাণ করেন। এ অঞ্চলে এটিই প্রথম ডকইয়ার্ড। এখানে বেঙ্গল রিভার সার্ভিসের লঞ্চ ছাড়াও অন্যান্য কোম্পানির এবং ব্যক্তিগত লঞ্চও মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো।

১৯৪০ সালে রণদা নারায়ণগঞ্জস্থ জর্জ অ্যান্ডারসনের যাবতীয় পাট ব্যবসা কিনে নেন। এটি পূর্বে ডেভিড এন্ড কোম্পানি পরিচালনা করত। ডেভিড এন্ড কোম্পানি ১৯২৯ থেকে নারায়নগঞ্জে পাটের ব্যবসা করে আসছিল। রণদা পাটের ব্যবসাকে আধুনিকীকরণ করেন। পাট মজুদের জন্য তিনি পাটকল সংলগ্ন বেশ কয়েকটি গুদাম নির্মাণ করেন এবং ১৯৪৬ সালে নতুন করে বেইল প্রেসিং যন্ত্র স্থাপন করেন। পাটকলের অন্যান্য সকল ইউনিটগুলি পরবর্তীতে বন্ধ হয়ে গেলেও এই প্রেসিং যন্ত্র সচল ছিল।

১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে সরকার প্রচুর খাদ্য সংগ্রহ ও মজুদের জন্য সারা বাংলায় ৪ জন প্রতিনিধি নিয়োগ করে। রণদা প্রসাদ ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। এ ব্যবসায়ও তিনি প্রচুর মুনাফা অর্জন করেন। এভাবে দেশ বিভাগের পূর্বেই রণদা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ব্যবসায়ী এবং শিল্প উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।

রণদা প্রসাদ চাকুরি শুরু করেছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে অসুস্থ ও আহতদের সেবা প্রদানের মাধ্যমে। একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে রুপান্তরিত হওয়ার পরও তিনি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেবা প্রদান অব্যাহত রাখেন। ১৯৩৮ সালে মির্জাপুরে তিনি তাঁর মায়ের নামে  কুমুদিনী হাসপাতালএর ভিত্তি স্থাপন করেন এবং একই সময়ে হাসপাতালের বহির্বিভাগ হিসেবে তাঁর ঠাকুরমা’র নামে ‘শোভাসুন্দরী ডিসপেন্সারি’ চালু করেন। ১৯৪৩ সালে কুমুদিনী হাসপাতালের নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯৪৪ সালের ২৭ জুলাই বাংলার গভর্ণর লর্ড আর জি কেসি ২০ শয্যা বিশিষ্ট এই হাসপাতালের উদ্বোধন করেন। ১৯৫৩ সালে কুমুদিনী হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসা চালু হয়। বাংলাদেশে এ স্থানেই প্রথম ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসা শুরু হয়। ১৯৭০ সালে কুমুদিনী হাসপাতালে ৫০ শয্যার যক্ষা ওয়ার্ড চালু করা হয়। রণদা হাসপাতালের শুরুর দিনগুলিতে মির্জাপুরের মত প্রত্যন্ত অঞ্চলে রোগীদের সেবা শুশ্রুষার প্রয়োজনে নার্সের ঘাটতি পূরণ করার জন্য গ্রামের দু:স্থ ও সহায়-সম্বলহীন নারীদের প্রশিক্ষিত করে তোলেন। পরবর্তীতে হাসপাতালের অভ্যন্তরেই নার্স প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করেন। বর্তমানে এই হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৭৫০। রোগীদের থাকা-খাওয়াসহ সুচিকিৎসার যাবতীয় খরচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বহন করে থাকে। বর্তমানে এই হাসপাতাল থেকে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১২ হাজারের অধিক মানুষ চিকিৎসা সেবা নিয়ে থাকে। কুমুদিনী হাসপাতালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যাঁরা এর সাথে জড়িত ছিলেন এবং রণদার জীবন গঠনে যাঁরা তাঁকে সহায়তা করেছেন, তাঁদের নাম স্মরণীয় করার জন্য ও তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁদের নামে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের নামকরণ হয়। রণদা কুমুদিনী হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা প্রদানের জন্য বিভিন্ন সময় দেশ ও বিদেশের খ্যাতনামা চিকিৎসকদের হাসপাতালে আমন্ত্রণ করতেন। রণদা প্রসাদ কুমুদিনী হাসপাতালের সাথে একটি মহিলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর ২০০১ সালে সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়।

১৯৩৮ সালে রণদার স্ত্রী শোভাসুন্দরী ডিসপেন্সারি সংলগ্ন এলাকায় ২০০ ছাত্রীর আবাসিক সুবিধাসহ একটি বালিকা বিদ্যালয়ের ভিত্তি স্থাপন করেন। ১৯৪৪ সালে এই স্কুলের প্রাথমিক যাত্রা শুরু হয় রণদার চাচা যোগেন্দ্র পোদ্দারের বাসায়। এ সময় ছাত্রী সংখ্যা ছিল মাত্র ১০ জন। ১৯৪৫ সালে বালিকা বিদ্যালয়ের নির্মাণ কাজ শেষ হলে তাঁর প্রপিতামহীর নামে নামকরণ হয়  ভারতেশ্বরী হোমস। ওই বছরই ৫৫ জন ছাত্রী নিয়ে ভারতেশ্বরী হোমস এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এটিই দেশের প্রথম আবাসিক মহিলা বিদ্যালয়। ছাত্রীদের লেখা-পড়া সহ অন্যান্য যাবতীয় খরচ হোমস এর কর্তৃপক্ষ বহন করত। এখানে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি শরীর চর্চাকেও বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়। শুরুতে মাধ্যমিক পর্যন্ত চালু থাকলেও ১৯৬২ সাল থেকে এটি উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে উন্নিত করা হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়ে ৮০০-এর বেশী ছাত্রী অধ্যয়নরত আছে।

১৯৪৩ সালে রণদা টাঙ্গাইলে মেয়েদের জন্য  কুমুদিনী কলেজ স্থাপন করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি পিতার নামে মানিকগঞ্জে  দেবেন্দ্র কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়াও তিনি দেশের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।

১৯৪৩ সালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে রণদা কলকাতা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রায় চার মাস ধরে বেশকিছু লঙ্গরখানা পরিচালনা করে ক্ষুধার্ত মানুষের সেবা প্রদান করেন। ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে রণদা মানবতার কল্যাণে রেডক্রস তহবিলে অর্থ প্রদান করেন। স্কুল-কলেজ, চিকিৎসালয় ও হাসপাতাল ছাড়াও তিনি জনস্বার্থে কমিউনিটি সেন্টার, পাবলিক হল, নাট্যমঞ্চ ইত্যাদি নির্মাণ করেন। ১৯৫৮ সালে রণদার উদ্যোগে ঢাকা সেনানিবাসের সিএমএইচ-এ প্রসুতী বিভাগ স্থাপন করা হয়।

১৯৪৭ সালে রণদা তার সকল ব্যবসা, কল-কারখানা, সম্পত্তি এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানসমূহ পরিচালনার জন্য ‘কুমুদিনী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল’ গঠন করেন। ট্রাস্টের প্রধান কার্যালয় নারায়নগঞ্জে অবস্থিত। ট্রাস্ট ১৯৪৭ সালের ২২ মার্চ যাত্রা শুরু করে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর কুমুদিনী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্টের কার্যক্রম দুভাগ হয়ে যায়। ভারতে অবস্থিত ব্যবসাসমূহ পৃথকভাবে পরিচালিত হতে থাকে এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ দ্বারা ভারতের কলকাতা, কালিমপং ও মধুপুরের দাতব্য প্রতিষ্ঠানসমূহ পরিচালিত হতে থাকে। বাংলাদেশে ট্রাস্টের আওতায় বর্তমানে কুমুদিনী হাসপাতাল, নার্সিং বিদ্যালয়, মহিলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়, ভিলেজ আউটরিচ প্রোগাম, ভারতেশ্বরী হোমস, ট্রেড ট্রেনিং বিদ্যালয়, কুমুদিনী হেন্ডিক্রাফ্টস, জুট বেলিং ও ওয়্যার হাউস, বেঙ্গল রিভার সার্ভিস, ফার্মাসিউটিক্যালস ও বিভিন্ন ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে।

রণদা শৌখীন অভিনেতা হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। সৈনিক অবস্থায় করাচীতে তার নাট্য জীবন শুরু। ১৯৬৯ সালে ‘আলমগীর’ নাটকের মূল চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। বৃটিশ সরকারকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে সহযোগিতা প্রদানের জন্য রণদা ১৯৪৪ সালে ‘রায় বাহাদুর’ খেতাব প্রাপ্ত হন। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সরকার সমাজ সেবার জন্য তাঁকে ‘হেলাল এ পাকিস্তান’ খেতাব প্রদান করে। ১৯৭৮ সালে রণদা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ খেতাব  স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার পান। ১৯৮৪ সালে ‘কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’ ও সমাজ সেবায় অসামান্য অবদানের জন্য ‘স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার’ লাভ করে। বাংলাদেশ সরকারের ডাক বিভাগ ১৯৯১ সালে রণদা প্রসাদের স্বরণে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

১৯৭১ সালের ৭ মে পশ্চিম পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী সহযোগীরা মির্জাপুর থেকে রণদা প্রসাদ সাহা ও তার পুত্র ভবানী প্রসাদ সাহাকে ধরে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে তাঁদের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।  [মুহাম্মদ লুৎফুল হক]

গ্রন্থপঞ্জি কলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্রিকা The Bengalee, The Hindoo Patriot;বঙ্গের বীর সন্তান,  শ্রী উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য;  হেনা সুলতানা, রণদাপ্রসাদ সাহার জীবনকথা ।