সালিস


সালিস তৃণমূল পর্যায়ে দেওয়ানি বা ফৌজদারি উভয় ধরনের ছোটখাট বিবাদ-বিরোধ বিচারের অনানুষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থা। এ বিচারকার্য সমাধা করেন মাতবর বা সালিসকারদের মতো স্থানীয় গণ্যমান্যদের নিয়ে গঠিত বিচারক সভা। সালিস মূলত পাড়া ও গ্রামভিত্তিক স্থানীয় লোকসমাজের বিচার। প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলে প্রধানত যে দু’ধরনের বিচারব্যবস্থা প্রচলিত তার একটি হলো সালিস, অন্যটি হলো সুনির্দিষ্ট আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিচার বিভাগীয় শাখার কার্যক্রম। সাধারণত কোনো সালিস প্রক্রিয়ার শুরু হয় বাস্তব তথ্যগুলি কি কি তা নির্ধারণের জন্য বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষকে জেরার মাধ্যমে। সালিসকারগণ বিরোধে জড়িত উভয় পক্ষের অভিমত গ্রহণের পর তাঁদের রায় প্রদান করেন। যদিও দেশের সর্বত্র এ পদ্ধতি একই রকম, তবু প্রথা ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে স্থানীয় পর্যায়ে সালিসের বিভিন্নতা রয়েছে। স্বাভাবিক সুবিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে সালিসে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পক্ষ সংঘাতে না গিয়ে সমঝোতায় উপনীত হতে আগ্রহী হবার কথা। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাকাঠামো, কখনো বা ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলের সালিস স্বার্থান্বেষী মহলের অস্ত্র হিসেবেই কাজ করে বলে এর অন্যথা হতে দেখা যায়।

প্রাচীন উত্তর ভারত এবং বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের অন্যত্র স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সর্বনিম্ন স্তর ছিল পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। এ পঞ্চায়েত কিছুটা আদালতের মতো কাজ করত। একই গ্রাম বা শহরের বিভিন্ন জাত ও পেশার মানুষের ওপর পঞ্চায়েতের নজরদারির এখতিয়ার ছিল। গোড়ার দিকে সামাজিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে এবং পঞ্চায়েতগুলি তাদের কার্য পরিচালনায় বেশ স্বাধীন ছিল। রাজা কিংবা অন্য নামে পরিচিত শাসকরা পঞ্চায়েতগুলিকে প্রাথমিক পর্যায়ে সংগঠিত করার ব্যাপারে ভূমিকা পালন করলেও তারা পঞ্চায়েতের কাজে বড় একটা হস্তক্ষেপ করতেন না। গ্রামীণ সমাজে উদ্ভূত প্রায় সকল ধরনের বিবাদ-বিরোধ নিষ্পত্তিতে পঞ্চায়েতের এখতিয়ার ছিল। পঞ্চায়েত দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় ধরনের মামলা নিষ্পত্তি করত। এর ক্ষমতা শুধু আর্থিক গন্ডিতে সীমিত থাকত না। পরে মুসলিম শাসকরা তাদের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলেন। এ বিচারব্যবস্থার সাথে সনাতন ব্যবস্থার বৈসাদৃশ্য থাকলেও কার্যত গ্রামে বিদ্যমান পঞ্চায়েতগুলির উপর তার প্রভাব পড়ে নি। তবে ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলাগুলির বিচারের জন্য আনুষ্ঠানিক আদালত প্রতিষ্ঠার ফলে পঞ্চায়েতের এখতিয়ার ও কর্তৃত্ব  হ্রাস পায়। ব্রিটিশ শাসকদের প্রবর্তিত নতুন ভূমিব্যবস্থা পঞ্চায়েত বিচারব্যবস্থার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। তবু সমগ্র ব্রিটিশ আমলে পঞ্চায়েত বিচারব্যবস্থাকে কখনও বাতিল করা হয় নি, বরং পঞ্চায়েত ব্যবস্থার অবক্ষয় সত্ত্বেও নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা এর প্রয়োজনীয়তার স্বীকৃতি দেয়।

কোনো কোনো ইতিহাসবিদদের মতে গ্রাম পঞ্চায়েত প্রাচীন উত্তর ভারতে জন্মলাভ করেছিল, আজকের বাংলাদেশ অঞ্চলে তা বিদ্যমান ছিল না অথবা থাকলেও তা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তাই কোনকালে এ দেশে একটি সুসংগঠিত সালিস ব্যবস্থা কার্যকর ছিল বলে অনুমান করা যায় না। ব্রিটিশ আমলের প্রথমদিকে এতদঅঞ্চলে দুই ধরনের স্থানীয় বিচার সম্পাদিত হতো বলে মনে হয়: (১) সামাজিক বিষয়ে ছোটখাট বিবাদ-বিরোধের অধিকাংশ নিষ্পত্তি করতেন গ্রাম্য সালিস; এবং (২) জমিজমা নিয়ে বিরোধ এবং বিভিন্ন পাড়া ও গ্রামের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি করতেন জমিদার বা তার প্রতিনিধিগণ। পরে গ্রামাঞ্চলের লোকসংখ্যা ও আয়তন বৃদ্ধি পেলে গ্রামভিত্তিক বিচারব্যবস্থা প্রচলিত হয়। কালক্রমে জমিদারি ব্যবস্থা ও আনুষ্ঠানিক আদালতের বিকাশের পরিপ্রেক্ষিতে সালিস-বিচার অনুষ্ঠান ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়ে এক সময়ে লুপ্ত হয়ে যায়। বাংলার গ্রামগুলির সালিস-বিচার প্রাচীনকালে ভারতের উত্তরাঞ্চলে গড়ে ওঠা এক উন্নত গ্রামভিত্তিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল বলে মনে করার কোনো সুযোগ নেই। বাংলায় যে সালিস-বিচারের প্রচলন ছিল তা ছিল অত্যন্ত ঘরোয়া প্রকৃতির এবং তৃণমূল পর্যায়ে বিদ্যমান বাস্তব পরিস্থিতির তাগিদেই তার সৃষ্টি।

এ রকম এক প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা ১৯১৯ সালের স্বায়ত্তশাসন আইনের আওতায় গ্রামভিত্তিক আদালত ও বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। এই আদালত ও বেঞ্চগুলির দায়িত্ব ছিল গ্রাম পর্যায়ে ছোটখাট অপরাধ ও বিরোধের বিচার করা। আর এ বিচারকার্য পরিচালিত হতো গ্রামভিত্তিক স্থানীয় সংস্থাসমূহ অর্থাৎ ওই একই আইনে গঠিত ইউনিয়ন বোর্ডে নির্বাচিত স্থানীয় কর্মকর্তা বা চেয়ারম্যানদের সামগ্রিক তত্ত্বাবধানে। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ও সালিস আদালত অধ্যাদেশ জারি করে। এ দুই অধ্যাদেশের আওতায় গ্রাম আদালত ও বেঞ্চগুলির উপর বিবাহ, বহুবিবাহ, খোরপোশ, বাল্যবিবাহ, অধিকার ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত ছোটখাটো অপরাধের বিচার করার দায়িত্ব অর্পিত হয়। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার ছোটখাট  ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সকল ইউনিয়নে গ্রাম আদালত গঠন করেন। গ্রাম আদালতের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ন্যায়-অন্যায় নির্ধারণ করে অন্যায় আচরণকারীর শাস্তিবিধান করা নয়, বরং বিরোধের একটা আপোষমূলক নিষ্পত্তি খুঁজে বের করা। তবে পরিতাপের বিষয় এই যে, স্থানীয় সরকারের কর্মকর্তাদের মধ্যে পরিষ্কার ধারণার অভাব, তাদের দুর্নীতিপূর্ণ আচরণ ও অসহযোগিতা জনিত সমস্যা এবং স্থানীয় সংস্থাগুলির হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতার অভাব গ্রাম আদালত ও বেঞ্চগুলির সূচনাকাল থেকেই তাদের কর্মপরিচালনার অন্তরায় হয়ে আছে।

ক্ষুদ্র  ক্ষুদ্র এলাকায় বিপুল জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধিত ঘনবসতি ও সীমিত সম্পদের ভাগাভাগিতে সৃষ্ট চাপের কারণে বাংলার গ্রামকাঠামোর মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের বিরোধ ও বিবাদের ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলে। এর ফলে একদিকে মানুষের গ্রামভিত্তিক পরিচিতি যেমন আরও জোরদার হয়েছে, তেমনি পাড়ার সংখ্যাও বেড়েছে। গ্রামভিত্তিক সালিসের অভ্যুদয় ঘটেছে পাড়াভিত্তিক সালিসের অতিরিক্ত বা তার বিকল্প হিসেবে। আন্তঃগ্রাম সালিসও অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে উপদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হলে বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে গ্রাম ও পাড়া পর্যায়ের সালিস আর কার্যকর হতো না, সেক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদগুলির চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নেতৃত্বে ইউনিয়ন পর্যায়ে সালিস অনুষ্ঠিত হয়েছে। সক্রিয় আনুষ্ঠানিক আদালতের শরণাপন্ন না হয়ে ঐতিহ্যগত ঘরোয়া সালিসের মাধ্যমে বিচারকার্য সম্পাদনের কারণ এই যে, আনুষ্ঠানিক আদালতে সুষ্ঠুভাবে বিচারকার্য সম্পাদিত হতো না। আদালতে অনুসরণীয় পদ্ধতি ও শাস্তির মাত্রা বা তার বাস্তবায়নের ধরন অধিকাংশের নিকটই গ্রহণযোগ্য হতো না। অধিকন্তু, যেকোন আনুষ্ঠানিক রায়কে উচ্চতর আদালতে চ্যালেঞ্জ করে তা রহিত করা যেতো। তাই গ্রামীণ বাংলাদেশে তৃণমূল বা ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি আনুষ্ঠানিক আদালতের পাশাপাশি আজও বিদ্যমান রয়েছে সনাতন ও ঘরোয়া সালিস যা পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে এক বা একাধিক পর্যায়ে, যেমন মহল্লা, গ্রাম বা ইউনিয়নে কার্যকর হয়।

তবে সাম্প্রতিক কিছু সমীক্ষায় জানা যায়, গ্রামভিত্তিক সালিসের বেলায় তীব্র দলাদলি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে গুরুতর জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের ছোটখাট বিরোধগুলি এখন বর্ধিত হারে নিয়মিত গ্রামআদালতের বাইরে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান/সদস্যদের নিকট নিষ্পত্তির জন্য উত্থাপন করা হয়। উক্ত সমীক্ষায় স্থানীয় সরকার বা ইউনিয়ন পরিষদের কর্মকর্তাদের পরিচালিত ঘরোয়া সালিসে ব্যাপক দুর্নীতির ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। অধিকাংশ সালিস পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট আইন বা স্বীকৃত নীতিমালার প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেওয়া হয় না। বিত্তবান ও প্রভাবশালী মহলের চাপ, অর্থের প্রভাব বা বিশেষ অনুগ্রহ, স্থানীয় সন্ত্রাসীদের ভয় এবং গোঁড়া ধর্মীয় অভিমতের আধিপত্য সালিসে ন্যায়বিচারের প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শেষোক্ত অন্তরায়টি দেশের কিছু এলাকায় বিশেষ প্রাধান্য বিস্তার করেছে বলে মনে হয়, যেখানে সালিস কখনো কখনো অমানবিক ‘ফতোয়া’ (যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীর বিরুদ্ধে প্রযুক্ত হয়) কার্যকর করার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। আর এসব ফতোয়া জারি করেন স্থানীয় ধর্মীয় নেতারা। এরপরও দেশে অনেক এলাকায় গ্রাম পর্যায়ে সালিস সক্রিয় রয়েছে। কারণ এতে সুবিধা এই যে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে দ্রুত একত্র করা যায়, তারা তাদের মতামত অবাধে ব্যক্ত করতে পারেন, ফলে বিচারকার্য দ্রুত সম্পন্ন করা যায়।

সালিসের মাধ্যমে কোনো ছোটখাট বিরোধের নিষ্পত্তি করা হলে অনিবার্যভাবেই তা আর্থিক নিষ্পত্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। কার্যত বহু অপরাধেরই উদ্ভব ঘটে জমিজমা নিয়ে বিরোধ ও পারিবারিক বিরোধ থেকে, যেগুলো পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সহজ হয়। যদিও ছোটখাট ফৌজদারি অপরাধ সংক্রান্ত প্রতিহিংসামূলক মনোভাব পরিহার করে বিরোধ নিষ্পত্তি করা শ্রেয়, তথাপি মামলা আদালতে গেলে তা যত ছোটই হোক, সহজে নিষ্পত্তির চেয়ে তা লড়ার প্রবণতাই প্রবল থাকে। তাই বিরোধের নিষ্পত্তি হয় না, বরং বিরোধে জড়িত পক্ষদ্বয়ের মধ্যে এবং সাধারণভাবে গোটা সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ ও শত্রুতা  আরও বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশের বর্তমান পটভূমিকায় কেউ সালিস প্রথার নিরবচ্ছিন্ন ধারা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হলে এবং এর কারণ অনুসন্ধান করলে দেখতে পাবেন, গণমানুষের ধ্যান-ধারণা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে যে ঐতিহ্যবাহী সালিস প্রথা প্রচলিত ছিল, তার পুনরুজ্জীবন ঘটানো খুবই দুরূহ। কাঠামোগত ও নানা বাস্তব সমস্যার কারণে গ্রামীণ সমাজকাঠামোর মধ্যে সম্প্রীতির অভাবে বিবদমান পক্ষগুলির মধ্যে বিরোধের ন্যায়সঙ্গত সমাধান করা খুবই কঠিন কাজ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু বেসরকারি সংগঠন সনাতন বিচারব্যবস্থা তথা সালিস ব্যবস্থাকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে এগিয়ে এসেছে। তারা এ ধরনের বিচার প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা, কোনো কিছু আরোপ না করার প্রবণতা এবং ‘উভয় পক্ষের জন্য ন্যায়সঙ্গত বিজয়ের’ পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন। সনাতন সালিস ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে এনজিওগুলি অগ্রাধিকারমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিভিন্ন আইনগত বিষয় ও বিচারপ্রক্রিয়ার ব্যাপারে  সালিসদের (প্রধানত স্বেচ্ছাসেবকদের) প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে।  [ফজলুল হক]

গ্রন্থপঞ্জি  Kamal Siddiqui, ‘In Quest of Justice at the Grass Roots’, Journal of The Asiatic Society of Bangladesh, Vol. 43, no.1, 1998; Fazlul Haq, Towards  a Local Justice System for the Poor, Dhaka, 1998.