সার


সার  প্রাকৃতিক অথবা কৃত্রিম উৎসের জৈব ও অজৈব বস্ত্ত (চূনাকরণ বস্ত্ত ব্যতীত), যা গাছের বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য এক বা একাধিক পুষ্টি উপাদান মৃত্তিকাতে সরবরাহ করে। যেকোন অজৈব লবণ, যেমন- অ্যামোনিয়াম সালফেট বা জৈব বস্ত্ত, যেমন- ইউরিয়া, যা গাছের পুষ্টি উপাদান সরবরাহের মাধ্যমে শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি করতে ব্যবহূত হয় সেসব বস্ত্তকে ‘বাণিজ্যিক’ সার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুনির্দিষ্টভাবে তিন প্রকারের সার আছে: রাসায়নিক সার, জৈব সার এবং জীবাণু সার। পৃথিবীব্যাপী কৃষিকাজে ব্যবহূত সামগ্রীর মধ্যে সারই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বস্ত্ত। সাংশ্লেষিক সারে অধিক পরিমাণে পুষ্টি উপাদান থাকে। প্রকৃতিতে পাওয়া যায় এমন অজৈব বস্ত্তও পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ। ফলশ্রুতিতে শস্যের প্রয়োজন মিটানোর জন্য প্রাকৃতিক জৈব বস্ত্তর তুলনায় কম পরিমাণে সারের প্রয়োজন হয়।

মৃত্তিকা গাছের পুষ্টি উপাদান সরবরাহকারী প্রধান মাধ্যম। গাছের জন্য প্রয়োজনীয় ১৭টি অপরিহার্য মৌলের মধ্যে গাছ মৃত্তিকা থেকে ১৪টি মৌল পেয়ে থাকে। কিন্তু মৃত্তিকাগুলো পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করার স্বাভাবিক ক্ষমতায় যথেষ্ট পার্থক্য প্রদর্শন করে। পুষ্টি উপাদান সরবরাহের এ ক্ষমতা সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে, কারণ উচ্চফলনশীল জাতের শস্যের নিবিড় চাষাবাদ, অতি সামান্য বা জৈব বস্ত্ত ব্যবহার না করা এবং অযথাযথ মৃত্তিকা ও শস্য ব্যবস্থাপনা। অপর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে শস্যগুলো পুষ্টি উপাদান ঘাটতির সম্মুখীন হয়, যা শস্যের উৎপাদন ও গুণ হ্রাসে প্রতিফলিত হয়। সে কারণে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়ার জন্য সার প্রয়োগের মাধ্যমে মৃত্তিকাতে পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করার প্রয়োজন হয়।

শস্যের ফলন বৃদ্ধি করতে প্রয়োগকৃত গাছপালা ও প্রাণিজ উৎসজাত বস্ত্তকে জৈব সার বলা হয়। প্রক্রিয়াহীন বা প্রক্রিয়া করা অবস্থায় এসব বস্ত্ত সাধারণত অধিক আয়তন দখল করে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রকার জৈব সার মৃত্তিকাতে প্রয়োগ করা হয়। অতীতকালে বাংলাদেশে শস্য উৎপাদনের জন্য প্রধানত জৈব সার ব্যবহার করা হতো। ১৯৬০-এর দশকে রাসায়নিক সার আগমনের সাথে সাথে জৈব সারের ব্যবহার প্রথমে ধীরে ধীরে এবং পরবর্তী সময়ে আকস্মিকভাবে হ্রাস পেয়েছিল। তৎসত্ত্বেও জৈব সারের মধ্যে প্রাণিজ সার, কম্পোস্ট (বিভিন্ন জৈব উপাদানে প্রস্ত্তত সার), সবুজ সার ও জীবাণু সার বাংলাদেশে ব্যবহূত হয়।

বর্তমান কৃষিতে শস্য উৎপাদন সিস্টেমের জন্য সার অপরিহার্য। শস্য উৎপাদন প্রভাবকারী নিয়ামকের মধ্যে ফলন বৃদ্ধিতে সার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রকৃত অর্থে, বাংলাদেশ কৃষির উৎপাদন সিস্টেমে সফলতা অজৈব সারের উপরই নির্ভরশীল। কারণ, মোট উৎপাদনের ৫০ শতাংশের জন্য এসব সারই দায়ী। তৎসত্ত্বেও, শস্য উৎপাদনে সারের অবদান শস্য, শস্যের নিবিড়তা, ঋতু, মৃত্তিকা বৈশিষ্ট্য ও ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির ওপরও নির্ভর করে।

বাংলাদেশে পঞ্চাশ দশকের গোড়ার দিকে গাছের পুষ্টি উপাদানের সম্পূরক উৎস হিসেবে রাসায়নিক (অজৈব) সার প্রবর্তন করা হয়েছিল। কিন্তু আধুনিক জাতের শস্যের প্রবর্তন ও সম্প্রসারণ এবং সেচ সুবিধা সৃষ্টির সাথে সাথে ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে নিয়মিতভাবে এসব সারের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছিল। সার ব্যবহার বৃদ্ধির প্রবণতা, বিশেষ করে ইউরিয়া-নাইট্রোজেনের ব্যবহার বৃদ্ধি এখনো বহাল আছে।

১৯৮০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের মৃত্তিকাতে সার থেকে তিনটি প্রাথমিক মুখ্য পুষ্টি উপাদান- নাইট্রোজেন (N), ফসফরাস (P) এবং পটাশিয়াম (K) এবং অমুখ্য পুষ্টি উপাদান ক্যালসিয়াম (Ca) সরবরাহ করা হতো। সালফার (S) ও জিঙ্কের (Zn) গুরুত্ব, বিশেষ করে ধান চাষে এদের গুরুত্ব আশির দশকের গোড়ার দিকে শনাক্ত করা হয়েছিল। জিপসাম, জিঙ্কসালফেট এবং জিঙ্ক অক্সি-সালফেট থেকে সালফার ও জিঙ্ক সরবরাহ করতে এসব সার প্রবর্তন করা হয়েছিল। ইদানিংকালে, কিছু কিছু মৃত্তিকা ও শস্যে ম্যাগনেসিয়াম (Mg) ও মলিবডেনামের (Mo) ঘটতি দেখা যাচ্ছে। এসব পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করতে ভবিষ্যতে যথাযথ সার ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে।

সারের মধ্যে নাইট্রোজেনের ব্যবহারই প্রধান অবস্থান দখল করে আছে। এর কারণগুলো হলো মৃত্তিকাতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ কম এবং শস্যের বৃদ্ধিতে নাইট্রোজেন সংবলিত সারের দৃশ্যমান প্রভাব অতি দ্রুত দেখা যাওয়ার কারণে এ সার কৃষকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে। অন্যান্য সার কম দৃষ্টি আকর্ষণ করার কারণ হলো এদের প্রভাব সাধারণত কম দেখা যায়, যদিও এদের প্রয়োজনকে অস্বীকার করা যায় না।

বিভিন্ন প্রকারের জৈব সার মৃত্তিকাতে প্রয়োগ করা হয়, যেমন- গোবর, মূত্র, মুরগির বিষ্ঠা, খামারজাত সার, কম্পোস্ট, শুষ্ক রক্ত, হাড়ের গুড়া, মৎস্যজাত সার (fish meal), বাদামের খৈল, খৈল, ধইঞ্চা, সানহ্যাম্প, গোমটর, মাষকলাই, মুগডাল, ধান ও গমের খড়, আখের পাতা, আগাছা, ছাই, ইত্যাদি। এসব বস্ত্তর মধ্যে প্রাণিজ সার, কম্পোষ্ট, সবুজ সার ও খৈল সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও কার্বন সরবরাহ করতে এসব মৌলের চক্রায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবন্ত বা সুপ্ত সুনির্দিষ্ট অণুজীবের উপজাত (strain) সাধারণত জীবাণুসার হিসেবে পরিচিত। নীল-সবুজ শৈবাল (BGA), রাইজোরিয়াম, অ্যাযোটোব্যাকটার, অ্যাযোম্পিরিলাম, ভেসিকুলার আরবুসকুলার মাইসারাইজাল (Vesicular Arbuscular Mycerrhizal) ছত্রাক এবং ফসফব্যাকটারিন পরিচিত কিছু জীবাণুসারের উদাহরণ, ডালজাতীয় শস্য ও অন্যান্য সীম জাতীয় গাছের জন্য রাইজোরিয়াম এবং ধানের জন্য অ্যাযোলার (Azolla) সঙ্গে নীল-সবুজ শৈবাল ব্যবহারের উপকারিতা অনেক পরীক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রতিপাদন করা হয়েছে, কিন্তু খামার পর্যায়ে এদের ব্যবহার এখন পর্যন্ত ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয় নি।

রাইজোবিয়াম (Rhizobium) ও ব্রাডিহিজোরিয়াম (Bradyrhizobium) গণের ব্যাকটেরিয়া শিম গোত্রের গাছের সঙ্গে একত্রে বায়ুমন্ডলীয় নাইট্রোজেন বন্ধনের অন্যান্য ক্ষমতার অধিকারী।

১৯৬২-৬৩ সালে বাংলাদেশে মোট ২০,২৩৫ টন পুষ্টি উপাদান সার থেকে ব্যবহার করা হয়েছিল। এর মধ্যে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১৮,৯১৬, ৬৬১ ও ৭০৩ টন। ১৯৯৫-৯৬ সালে সার থেকে ব্যবহূত পুষ্টি উপাদানের মোট পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১১,৭৯,৩৯০ টনে। সেই বছর ব্যবহূত বিভিন্ন পরিমাণ পুষ্টি উপাদানের মধ্যে নাইট্রোজেন ৯,৪২,৭৭১ টন, ফসফরাস ৬৯,৯৬৬ টন, পটাশিয়াম ৭৭, ৯৪০ টন, সালফার ৮৯,৪৬৮ টন এবং জিঙ্ক ৩৪৫ টন।

১৯৯৭-৯৮ সালে বাংলাদেশে উৎপাদিত সারের পরিমাণ ছিল ইউরিয়া ১,৮৭৩ মিলিয়ন টন, ট্রিপল সুপারফসফেট (TSP) ৫০ হাজার টন, সিঙ্গেল সুপারফসফেট ১০০ হাজার টন এবং অ্যামোনিয়াম সালফেট ৩ হাজার টন। বাংলাদেশে TSP কারখানাতে উপ-উৎপন্নদ্রব্য হিসাবে জিপসাম উৎপাদিত হয়।

সারণি বাংলাদেশে সার উৎপাদন শিল্পকারখানা ও উৎপন্ন দ্রব্য।

শিল্পকারখানা অবস্থান উৎপন্ন দ্রব্য
কাফকো (কর্ণফুলি ফার্টিলাইজার কো.)  চট্টগ্রাম ইউরিয়া
চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লি.  চট্টগ্রাম ইউরিয়া
যমুনা ফার্টিলাইজার কো. লি. জামালপুর ইউরিয়া
জিয়া ফার্টিলাইজার কো. লি. আশুগঞ্জ ইউরিয়া
ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি লি. ঘোড়াশাল ইউরিয়া
ন্যাচারাল গ্যাস ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি ফেঞ্জুগঞ্জ ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়াম সালফেট
পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি  ঘোড়াশাল ইউরিয়া
চিটাগাং টিএসপি কমপ্লেক্র   চট্টগ্রাম টিএসপি ও সিঙ্গেল সুপারফসফেট

কোন কোন সারে কেবল একটি পুষ্টি মৌল থাকে, আবার কিছু কিছু সারে একাধিক পুষ্টি মৌল থাকে। শেষোক্ত সারগুলোকে বহুপুষ্টি উপাদান সংবলিত সার (multinutrient fertiliser) বলা হয়। প্রায়োগিক উদ্দেশ্যে একাধিক সারকে একত্রে মিশ্রিত করা হয় এবং এ প্রকার সারকে মিশ্র (mixed) সার বলা হয়। বাংলাদেশে ইউরিয়া ব্যবহার করে শস্যের জন্য প্রায় সব নাইট্রোজেনের প্রয়োজন মিটানো হয়। এছাড়া, কোনো কোনো শস্য, বিশেষ করে চা গাছের জন্য অ্যামোনিয়াম সালফেট ব্যবহার করা হয়। ট্রিপল সুপারফসফেট ও ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট (ADAP) থেকে ফসফরাস সরবরাহ করা হয়। ফসফরাস ছাড়াও ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট গাছের জন্য নাইট্রোজেনও সরবরাহ করে। পটাশিয়ামকে মিউরিয়েট অব পটাশ (MP), সালফারকে জিপসাম, জিঙ্ককে জিঙ্ক সালফেট ও জিঙ্ক অক্সাইড, মলিবডেনামকে অ্যামোনিয়াম মলিবডেট এবং বোরনকে সলোবর ও বোরাক্স হিসেবে প্রয়োগ করা হয়। এটা হিসাব করে দেখা গিয়াছে যে, ১৯৭৩ সালে যেখানে প্রতি হেক্টরে ১৮ কেজি পুষ্টি উপাদান ব্যবহার করা হতো সেই তুলনায় ১৯৯৪ সালে প্রতি হেক্টরে ১০৮ কেজি পুষ্টি উপাদান ব্যবহার করা হয়েছিল। পুষ্টি উপাদান ব্যবহারের এ পরিমাণ ১৯৯৪ সালে কোরিয়া প্রজাতন্ত্র (৪৬৭ কেজি/ হেক্টর/ বছর) ও চীনে (৩০৯ কেজি/হেক্টর/বছর) ব্যবহূত সারের তুলনায় অনেক কম, কিন্তু ভারত (৮০ কেজি/হেক্টর/বছর) ও পাকিস্তানে (১০২ কেজি/হেক্টর/বছর) ব্যবহূত সারের তুলনায় একটু বেশি।

গাছের জন্য পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করা ছাড়াও সার মৃত্তিকা ধর্মাবলির উপর অন্যান্য প্রভাবও বিস্তার করে। মৃত্তিকার রাসায়নিক, ভৌত ও জৈব ধর্মাবলির উপর জৈব সারের অনুকূল প্রভাব আছে। জৈব সারের বিয়োজনের ফলে নির্গত উপাদানসমূহ এসব ভিন্নমুখী প্রভাব বিস্তার করে এবং কৃত্রিম রাসায়নিক সারের চেয়ে এদের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। সাংশ্লেষিক সারের প্রভাব দ্রুত কিন্তু স্বল্পস্থায়ী।  [সিরাজুল হক]