সায়ের


সায়ের  ফারসী শব্দ। প্রাক ব্রিটিশ ও ব্রিটিশ যুগের সূচনালগ্নে কোন ‘চৌকি’ বা কাস্টম হাউস-এর মধ্য দিয়ে মালামাল পরিবহনকালে মালিকদের প্রদেয় স্থানীয়ভাবে আরোপিত একটি শুল্ক। মুগল রাজস্ব ব্যবস্থায় করের দুটি প্রধান শাখা ছিল- ভূমি রাজস্ব বিভাগ ও শুল্ক বিভাগ। বিস্তৃত ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের দিক থেকে সায়ের অর্থ দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও সম্পত্তির ওপর নানা ধরনের শুল্ক। বাণিজ্য পথে ও ব্যবসা কেন্দ্রের নির্দিষ্ট এলাকায় পরিবহন শুল্ক আদায় করাকেও সায়ের বলা হতো। যেসব সামগ্রীর জন্য শুল্ক প্রদান করতে হতো, সেগুলিকে একত্রে ‘সায়ের মহল’ বলা হতো। তবে বণিকরা যখন তাদের মালামাল এক বাজার থেকে অন্য বাজারে পরিবহণ করতেন তখন তারা যথেষ্ট হয়রানির শিকার হতেন। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিভিন্ন স্থানে চৌকি বা শুল্ক আদায়ের কেন্দ্র স্থাপন করা হতো। এসব কেন্দ্র পরিবহন নৌকা থামিয়ে প্রথামাফিক সায়ের শুল্ক আদায় করতো। সায়ের শুল্ক আদায়কারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে ছিল প্রধানত স্থানীয় জমিদার এবং কখনও কখনও রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ইজারাদার। তাদের মধ্যে ‘সায়ের মহল’ বণ্টন করা হতো।

সায়ের আদায় নিয়ে বিতর্কই বাংলার নওয়াব এবং ইংরেজ  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে সংঘাতের অন্যতম প্রধান কারণ। সম্রাট  শাহজাহানের সময় থেকেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি স্থানীয় চৌকিদারদেরকে সায়ের প্রদান থেকে অব্যাহতির সুযোগ ভোগ করে আসছিল। কিন্তু আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর বাংলার নওয়াবগণ প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পর তাঁরা রাজকীয়  ফরমানকে অস্বীকার করেন। কোম্পানি আবার সম্রাট ফররুখ সিয়ারের কাছ থেকে নতুন করে একটি ফরমান আদায় করে নেয়। এই ফরমান মোতাবেক কোম্পানির কাছ থেকে বাংলার সুবাহদারের শুল্ক আদায়ে কোন এখতিয়ার ছিল না। কোম্পানি বছরে মাত্র তিন হাজার সিক্কারূপি প্রদানের মাধ্যমে বাণিজ্য করার সুবিধা ভোগ করত। তবে স্থানীয়ভাবে রাজকীয় নির্দেশ সব সময় পালিত হতো না, ফলে নওয়াব ও কোম্পানির সঙ্গে নতুন করে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এই দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত অবসান ঘটে প্রথমে  পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) ও পরে  বক্সারের যুদ্ধএর (১৭৬৪) মধ্য দিয়ে। এদুটি যুদ্ধের ফলে বাংলায় ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। ১৭৭৩ সাল পর্যন্ত জমিদারগণ সায়ের শুল্ক আদায় করতেন। এর পরে ‘শহর শুল্ক’ ছাড়া অন্য সব অভ্যন্তরীণ শুল্ক ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করা হয়। কিন্তু দেশের দূরবর্তী অঞ্চলে এই নির্দেশ কার্যকর করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হয়নি। ১৭৮৮ সালে সরকার সায়ের সংগ্রহে জমিদারদের অধিকার পুনরায় রদ করে। তাই ধারণা করা হয়, এই প্রথা কোথাও কোথাও সেই সময় পর্যন্ত চলে আসছিল। লর্ড কর্নওয়ালিসের এক সরকারি নোট (১০ ফেব্রুয়ারি ১৭৯০) থেকে জানা যায় যে, সায়ের রদ করার পরও জমিদারগণ সায়ের শুল্ক সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছিলেন এবং তাতে গভর্নর জেনারেল অসন্তুষ্ট ছিলেন।  চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিধি অনুযায়ী সায়ের রদের কারণে জমিদারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় এবং জমিদারগণ এই অবৈধ শুল্ক যাতে আর আদায় না করতে পারে সে বিষয়ে জেলা কালেক্টরদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে ১৭৯০-এর পর জমিদারদের নিজ খরচে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হাট-বাজার থেকে তাঁরা টোল আদায় করতে পারতেন।  [সিরাজুল ইসলাম]