সরাইল হাটখোলা মসজিদ


সরাইল হাটখোলা মসজিদ  ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলা সদর থেকে প্রায় ১১.৫ কিমি উত্তরে সরাইল উপজেলা বাজার (হাট)-এর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। মসজিদটি স্থানীয় জনগণ কর্তৃক পুনর্নির্মাণ এবং মেরামত করায় বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবশ্য বর্তমানে এটি বেশ ভাল অবস্থায় সংরক্ষিত রয়েছে। সম্প্রতি মসজিদটির উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ পাশে সমতল ছাদের বারান্দা নির্মাণ করায় এর আদিরূপ কেবল পেছন দিক থেকে বোঝা যায়। মসজিদটিতে একটি শিলালিপি আছে। ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে  আওরঙ্গজেব-এর শাসনামলে মজলিস শাহবাজের পুত্র নূর মুহম্মদের স্ত্রী মসজিদটি নির্মাণ করেন।

ইট নির্মিত আয়তাকার (১৪.০২ মি × ৭.৬২ মি) মসজিদটির বাইরের চারকোণে চারটি অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ আছে, যা ছাদের উপরে উঠে গেছে এবং শীর্ষদেশে কলস নকশা শোভিত। বপ্র (Parapet) এবং দুই ব্যান্ডের কার্নিস সুলতানি রীতিতে সুন্দরভাবে বাঁকানো। মসজিদটিতে প্রবেশের জন্য পূর্বদিকে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণে একটি করে খিলানাকৃতির প্রবেশপথ আছে। পূর্বদিকের প্রবেশপথের সামনে ও পেছনে খিলান, মধ্যবর্তী স্থান ভল্ট দ্বারা আচ্ছাদিত। কেন্দ্রীয় খিলানটি প্রক্ষিপ্ত, দুই পাশে দুটি সরু মিনার, যা বর্তমানে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। পূর্ব দিকের তিনটি প্রবেশপথ বরাবর পশ্চিম দেয়ালে তিনটি অর্ধঅষ্টভুজাকৃতির মিহরাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় মিহরাবটির বাইরের দিকে আয়তাকার প্রক্ষেপণের দুই প্রান্তে অর্ধঅষ্টভুজাকৃতির মিনার আছে, যা ছাদ পর্যন্ত উঠে গেছে এবং শীর্ষ কলস চূড়াসহ ছোট ছোট শিরাল গম্বুজে আচ্ছাদিত।

দেওয়াল সংলগ্ন ইটের স্তম্ভের উপর পূর্ব-পশ্চিমে প্রশস্ত দুটি খিলান মসজিদের অভ্যন্তরীণ ভাগকে তিনটি ‘বে’-তে বিভক্ত করেছে। কেন্দ্রীয় ‘বে’ বর্গাকৃতির (প্রতি বাহু ৪.৭৫ মি) এবং পাশের ‘বে’ আয়তাকৃতির (৪.৭৫ মি × ১.৯৮মি)। বৃত্তাকার ড্রামের উপর একটি বড় গম্বুজ দ্বারা কেন্দ্রীয় ‘বে’টি আচ্ছাদিত। পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত খিলানদ্বয় কেন্দ্রীয় মিহরাব ও কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের উপরে বদ্ধ খিলান এবং ইমারতের অভ্যন্তরে চারকোণে স্থাপিত ঐতিহ্যবাহী মুগল পেন্ডেন্টিভ গম্বুজটির ভার বহন করছে। পাশের প্রতিটি আয়তাকার ‘বে’ ভল্ট আচ্ছাদিত, যা ভিতর থেকে চৌচালা রীতির, কিন্তু বাইরের দিকে দুটি ছোট মেকী গম্বুজ রয়েছে। তাই মসজিদটি পাঁচ গম্বুজবিশিষ্ট। মাঝখানের গম্বুজটি বড় এবং চারকোণার চারটি গম্বুজ ছোট। বর্তমানে সবগুলি গম্বুজের শীর্ষচূড়া কলস নকশা শোভিত।

সরাইল হাটখোলা মসজিদ, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া

মসজিদটিতে খোপ নকশা এবং পোড়ামাটির অলংকরণ ব্যবহূত হয়েছে। বাইরের দেয়ালে অগভীর খোপ নকশার সারি রয়েছে। উপরের সারিটি বদ্ধ খিলান নকশায় শোভিত। কেন্দ্রীয় খিলানপথ, কেন্দ্রীয় মিহরাব এবং পার্শ্ব বুরুজগুলিতে পোড়ামাটির ফলকের অলংকরণ পরিলক্ষিত হয়। কেন্দ্রীয় খিলানপথের আয়তাকার ফ্রেমটি প্যাঁচানো গোলাপ নকশা ও জালি নকশায় সুশোভিত করা হয়েছে। প্রবেশপথের খিলানসমূহের স্প্যানড্রেল ফুলের প্যাঁচানো নকশা দ্বারা দৃষ্টিনন্দনভাবে অলঙ্কৃত। কেন্দ্রীয় মিহরাবটিও একটি আয়তাকার ফ্রেমের মধ্যে স্থাপিত। এর খিলানটি বহু খাঁজবিশিষ্ট এবং ফ্রেমের উপরিভাগ বিভিন্ন ধরনের প্যাঁচানো ফুল, গোলাপ এবং জালি নকশা দ্বারা শোভিত। মিহরাব খিলানটি অলঙ্কৃত সংলগ্ন স্তম্ভ থেকে উত্থিত। স্তম্ভ দুটি ছাঁচে ঢালা ব্যান্ড দ্বারা কয়েক ভাগে বিভক্ত।

মিহরাব কুলুঙ্গির ভেতরের অংশ হালকা উত্তোলিত ব্যান্ড নকশা দ্বারা বিভক্ত। এই ব্যান্ডের মধ্যবর্তী এলাকাসমূহ উল্লম্বভাবে স্থাপিত আয়তাকার খোপ নকশা দিয়ে পূরণ করা হয়েছে। খোপগুলির প্রতিটিতে বহু খাঁজবিশিষ্ট আলংকারিক খিলান এবং খিলানের শীর্ষ থেকে ঝুলন্ত শিকল-ঘণ্টার মোটিফ রয়েছে। পার্শ্ববুরুজসমূহে বিভক্তকারী ব্যান্ডগুলির উপরে এবং নিচে রয়েছে সোজা ও উল্টো ফুল-পাপড়ির নকশা। পার্শ্ববুরুজের ব্যান্ডগুলির অন্তর্বর্তী স্থান বর্তমানে প্লাস্টার দ্বারা মসৃণ করা, তবে আদিতে এখানে পোড়ামাটির অলঙ্করণ ছিল। দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের পার্শ্ববুরুজে এখনও এর চিহ্ন রয়েছে। একটি বড় কেন্দ্রীয় গম্বুজ এবং চারকোণে চারটি ছোট গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত মসজিদটি বাংলায় প্রথমবারের মতো মুগল স্থাপত্যের বিরল রীতির উদাহরণ। মসজিদ স্থাপত্যের এই রীতি বাংলায় প্রথম পরিলক্ষিত হয় কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে অবস্থিত কুতুবশাহী মসজিদে। মসজিদটি আনুমানিক ষোল শতকের শেষভাগে নির্মিত। তখনও এই এলাকায় মুগল অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অষ্টগ্রাম মসজিদের ভূমি নকশা এবং আচ্ছাদনের প্রভাব মাত্র ২৪.১৪ কিমি. দূরে অবস্থিত সরাইল মসজিদে সরাসরি পরিলক্ষিত হয়। বাংলার বাইরে দিল্লির নিজামউদ্দীন আউলিয়ার দরগায় অবস্থিত জামাত খানা মসজিদ (১৩১০-১৬) এবং বিহারের পাটনায় শেরশাহের মসজিদে এই রীতির ব্যবহার দেখা যায়। সেখান থেকেই সম্ভবত এই রীতি নেওয়া হয়েছে। কুমিল্লার ওয়ালিপুরে অবস্থিত আলমগীরী মসজিদ (১৬৯২ খ্রি) এবং পুরানো ঢাকার বেচারাম দেউড়ি মসজিদে (১৮৭২ সাল) এ রীতির আরও পরিশীলিত রূপ দেখা যায়।

সরাইল মসজিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক এই যে, দেশের অন্যান্য অনেক মসজিদের মতো এখানে সুলতানি ও মুগল এই দুই পৃথক স্থাপত্য শৈলীর স্বার্থক সম্মিলন ঘটানো হয়েছে। প্রথম রীতিটি ফুটে উঠেছে এর বক্র কার্নিস এবং পোড়ামাটির অলঙ্করণে এবং দ্বিতীয় রীতির প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায় দেয়ালের গায়ে প্লাস্টারের আচ্ছাদন, খোপ নকশার ব্যবহার, গম্বুজের নিচে ড্রামের ব্যবহার এবং বপ্র (Parapet) ছাড়িয়ে পার্শ্ববুরুজের উপরে উঠে যাওয়ায়।  [এম.এ বারি]