সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯


সরকারি কর্মচারী (আচরণ ) বিধিমালা, ১৯৭৯ সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নিয়োগ ও চাকুরির শর্তাবলি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। একই অনুচ্ছেদে কর্মচারীদের নিয়োগ ও চাকুরির শর্তাবলি নিয়ন্ত্রণে কোনো আইন বা বিধি প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত কর্মচারীদের নিয়োগ ও চাকুরির শর্ত নিয়ন্ত্রণের জন্য বিধি প্রণয়নে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এরূপে প্রণীত বিধিমালা এ ধরনের কোনো আইনের বিধানের সঙ্গে সঙ্গতি সাপেক্ষে কার্যকর হবে। এই প্রদত্ত ক্ষমতার আওতায় সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ প্রণীত হয় এবং ১৯৭৯ সালের ১৮ মে এই বিধি বাংলাদেশ গেজেটে (অতিরিক্ত) প্রকাশিত হয়। এ বিধিমালা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান আমলে ১৯৬৪ ও ১৯৬৬ সালে প্রণীত আচরণ বিধিমালা বাতিল ঘোষিত হয়।

এ বিধিমালা বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক বিভাগে দেশের অভ্যন্তরে বা বাইরে কর্তব্যরত বা ছুটিরত সকল সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সরকারের অন্য যেকোন সংস্থা, প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের অধীনে প্রেষণে কর্মরত সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও এই বিধিমালা প্রযোজ্য। তবে সুনির্দিষ্ট বিভাগের কোনো কোনো শ্রেণীর সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রে এ বিধি প্রযোজ্য হবে না, যাদের চাকুরির শর্তাবলি নিয়ন্ত্রণের জন্য পৃথক বিধিমালা রয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধির একটি কাঠামো তৈরির উদ্দেশ্যে এই বিধিমালা প্রণীত হয়। উদ্দেশ্য ছিল দুর্নীতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাইরের প্রভাব, স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব, প্রতিশোধমূলক নিপীড়ন ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ নিশ্চিত করা। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ১৯৭৫-এর আওতায় এর যেকোন বিধি লঙ্ঘন অসদাচরণের শামিল। একজন সরকারি কর্মচারী এ ধরনের বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে তার বিরুদ্ধে এ বিধির আওতায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।

৩২টি বিধি সম্বলিত এ বিশদ বিধিমালায় সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ বিশেষ কার্যক্রমের ওপর সীমাবদ্ধতা ও নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে। এই বিধিসমূহ মোটামুটি তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। প্রথমত, কতিপয় বিধি সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ সংক্রান্ত। নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রগুলো হলো ফটকা বিনিয়োগ, সংসদ-সদস্য বা সরকারি কর্মচারী নন এমন ব্যক্তির নিকট সরকারি কর্মচারীর পক্ষে কোনো কাজে হস্তক্ষেপের জন্য তদবির করা, রাজনীতি ও নির্বাচনে অংশ নেয়া, সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ প্রচার করা, সংকীর্ণতা, পক্ষপাতিত্ব ও প্রতিশোধমূলক নিপীড়নকে প্রশ্রয় দেয়া এবং ক্ষমতার ইচ্ছাকৃত অপব্যবহার। রাজনৈতিক ও অন্যান্য প্রভাব কাজে লাগানোর ক্ষেত্রেও সরকারি কর্মচারীর জন্য অনুরূপ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। একজন সরকারি কর্মচারী বিদেশী মিশন বা দাতাসংস্থার নিকট থেকে বিদেশ সফরের আমন্ত্রণ বা বিদেশে প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ লাভের জন্য তদবির করতে পারবেন না।

দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা হলো এমন কিছু কার্যক্রম সম্পর্কিত যা সরকারের পূর্বানুমতি ব্যতীত একজন সরকারি কর্মচারী করতে পারেন না। এগুলো হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বাইরে কোনো উপহার গ্রহণ, কোনো সরকারি কর্মচারীর সম্মানে জনসভা অনুষ্ঠান, সরকারি কর্মচারী কর্তৃক তহবিল সংগ্রহ, সুদে ধার দেওয়া ও ঋণ গ্রহণ, মূল্যবান সম্পত্তি ক্রয় ও বিক্রয়, ইমারত নির্মাণ। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে কোনো কোম্পানি গঠন ও পরিচালনা, ব্যক্তিগত ব্যবসা ও চাকুরি গ্রহণ, ঋণ পরিশোধে অসামর্থ্য ও ঋণ গ্রহণের অভ্যাস, অন্যের নিকট সরকারি কাগজপত্র হস্তান্তর বা তথ্য সরবরাহ করা ইত্যাদি। এসকল কাজের জন্য সরকারের পূর্বানুমতি আবশ্যক।

তৃতীয় পর্যায়ের বিধিতে বলা হয়েছে যে, সরকারি চাকুরিতে প্রবেশকালে একজন সরকারি কর্মচারী যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তার ১০ হাজার টাকার অতিরিক্ত সম্পত্তির একটি ঘোষণা প্রদান করবেন। এতে আরও বলা হয়েছে যে, চাকুরিতে প্রবেশকালে তিনি সম্পত্তির যে হিসাব প্রদান করেছেন, তার বৃদ্ধি বা হ্রাস উল্লেখ করে প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে সরকারের নিকট একটি বার্ষিক বিবরণ দাখিল করবেন। সরকার চাইলে একজন সরকারি কর্মচারীকে তার চলতি সম্পত্তির হিসাব পেশ করতে হবে। [এ.এম.এম শওকত আলী]