সরকারি কর্মচারী (অবসর) আইন, ১৯৭৪


সরকারি কর্মচারী (অবসর ) আইন, ১৯৭৪  সরকারি কর্মচারীদের চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি সম্পর্কিত আইনের সংশোধন ও সংহতকরণ এই আইনের উদ্দেশ্য। ব্রিটিশ শাসনামলে সরকারি কর্মচারীদের অবসর গ্রহণের বয়সসীমা নির্ধারিত ছিল ৫৫ বছর। পাকিস্তান আমলে তা বাড়িয়ে ৬০ বছর করা হয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর সরকারি কর্মচারী (অবসর) অধ্যাদেশ ১৯৭৩ (১৯৭৩ সালের ২৬ নং অধ্যাদেশ)-এর অধীনে অবসর গ্রহণের বয়সসীমা নির্ধারিত হয় ৫৭ বছর। অবসর গ্রহণের এ বয়োসীমা অক্ষুণ্ণ রেখে ১৯৭৪ সালের আইন দ্বারা উল্লিখিত অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়।

বর্তমানে এ আইন প্রজাতন্ত্রের যেকোনও পদে বা কোনও করপোরেশন, জাতীয়করণকৃত প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় সরকারের চাকুরিতে নিয়োজিত সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য। পাকিস্তান আমলের যেকোনও সময় পাকিস্তান সরকারের চাকুরি করার সুবাদে বর্তমানে বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের চাকুরিতে নিয়োজিত হতে ইচ্ছুক যেকোনও ব্যক্তির ক্ষেত্রেও এই আইন প্রযোজ্য হবে। যাদের ক্ষেত্রে এ আইন প্রযোজ্য নয় তারা হলেন: (ক) প্রতিরক্ষা সার্ভিসের সদস্য, (খ) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারী, (গ) বিশেষ উদ্দেশ্যে গঠিত কোনও কমিশন, কমিটি বা বোর্ডের অধীনে চাকুরিরত ব্যক্তি, (ঘ) রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প শ্রমিক (চাকুরির শর্তাবলি) অধ্যাদেশ ১৯৭৩-এ সংজ্ঞায়িত শ্রমিক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীবাহিনী, এবং (ঙ) যেকোনও দপ্তরের জন্য নির্বাচিত বা আইনের অধীনে মনোনীত ব্যক্তি।

এ আইনের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে: (ক) একজন সরকারি কর্মচারীর বয়স ৫৭ বছর পূর্ণ হলে তিনি আবশ্যিকভাবে চাকুরি থেকে অবসর নেবেন; (খ) প্রজাতন্ত্রের কোনও পদে বা কোনও করপোরেশন, জাতীয়করণকৃত প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় সরকারের কোনও চাকুরিতে সকল ধরনের পুনঃনিয়োগ নিষিদ্ধ; (গ) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এমন কোনো পদের ক্ষেত্রে পুনঃনিয়োগের এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না; (ঘ) জনস্বার্থের জন্য প্রয়োজনীয় মনে করলে রাষ্ট্রপতি যেকোনও সরকারি কর্মচারীকে অবসর গ্রহণের পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে পারেন।

স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের বিধান এই আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এই বিধান অনুযায়ী যেকোনও সরকারি কর্মচারীর চাকুরি ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর যেকোনও সময় স্বেচ্ছায় অবসর নিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে যে তারিখ থেকে তিনি অবসরে যেতে চান তার ন্যূনপক্ষে ৩০ দিন পূর্বে লিখিত নোটিশের মাধ্যমে তা চাকুরিদাতা কর্তৃপক্ষকে জানাতে হয়। এভাবে গৃহীত অবসর চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে এবং তার পরিবর্তন বা প্রত্যাহার করা যাবে না। স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের বিধানে সরকার নিজেও যেকোনও সরকারি কর্মচারীকে কোনও কারণ দর্শানো ছাড়াই অবসর দিতে পারে, যদি সরকার মনে করে যে জনস্বার্থে তা করা জরুরি। ১৯৮৩ সালের ১ নং অধ্যাদেশবলে সরকারকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয় এবং তা কার্যকর হয় ১৯৮৩ সালের ২৮ জুলাই থেকে।  এতে একমাত্র শর্ত হলো যে, স্বেচ্ছা অবসরে যেতে ইচ্ছুক কর্মচারীকে যে তারিখ থেকে তিনি অবসরে যেতে চান তার অন্তত ত্রিশ দিন পূর্বে লিখিত নোটিশের মাধ্যমে নিয়োগ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।

সরকারি কর্মচারীদের স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের অধিকার একটি অলঙ্ঘনীয় অধিকার। যেকোনও সরকারি কর্মচারীর এই ইচ্ছা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ মেনে নিতে বাধ্য, তা প্রত্যাখ্যান করার কোনও আইনগত সুযোগ নেই। কতিপয় নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অবসর গ্রহণকারী কর্মচারীর অবসর ভাতাদি প্রদান স্থগিত রাখার ক্ষমতা এই বিধানে রয়েছে। কোনও সরকারি কর্মচারী অবসর গ্রহণের সময় যদি তার বিরুদ্ধে সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের দায়েরকৃত মামলা বা বিভাগীয় তদন্ত বিচারাধীন থাকে, তাহলে তিনি অবসর ভাতাদি পাবেন না। তবে তিনি প্রভিডেন্ট ফান্ড ও তার সুদের অর্থ পাবেন। পেনশন ও অন্যান্য অবসর ভাতাদি পাবেন কি না তা মামলা বা তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।  [এ.এম.এম শওকত আলী]