সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯


সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯ বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস সংক্রান্ত ক্রমবর্ধমান সহিংস ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে অনেক দেশেই বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাস বিরোধী আইন বিগত এক দশকে প্রণীত হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালে সর্বপ্রথম এ সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ জারী করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। সাংবিধানিক অনুশাসন অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক জারীকৃত অধ্যাদেশসমূহ সংসদ কর্তৃক অনুমোদন করতে হয়, অন্যথায় এর বৈধতা বিলুপ্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচিত সরকার কর্তৃক পেশকৃত সন্ত্রাস বিরোধী আইন (২০০৯ সালের ১৬ নং আইন) সংসদ ফেব্রুয়ারি মাসে অনুমোদন করে।

এ আইনে ১০টি অধ্যায় ও ৪৫ টি ধারা রয়েছে। আইনটি ২০০৮ সালের ১১ জুন থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে মর্মে বিধানও রয়েছে। একই সাথে এ বিধানও রয়েছে যে, অধ্যাদেশটি এ আইনের বলে রহিতকরণ সত্ত্বেও অধ্যাদেশের অধীনে কৃত কর্ম বা গৃহীত ব্যবস্থা বর্তমান আইনের অধীনে কৃত বা গৃহীত হয়েছে বলে গণ্য হবে। ফৌজদারি কার্যবিধিসহ অন্যান্য আইনের বিধানাবলির উপর এ আইনের বিধানাবলিকে প্রাধান্যও দেয়া হয়েছে। অতিরাষ্ট্রিক প্রয়োগের বিষয়ও এ আইনে সন্নিবেশিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তিনটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। এক, যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের বাইরে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক বা বাংলাদেশের সম্পদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ সংঘটন করে, যা বাংলাদেশে হলে এ আইনের অধীনে শাস্তিযোগ্য হতো, তাহলে ওই অপরাধ বাংলাদেশে সংঘঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং অভিযুক্তের ক্ষেত্রে এ আইনের বিধানাবলি প্রযোজ্য হবে। দুই, যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের বাইরে থেকে এসে এ দেশে কোনো অপরাধ করে, তাহলে ওই অপরাধের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া বাংলাদেশে সংঘঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং অভিযুক্তের ক্ষেত্রে এ আইনের বিধানাবলি প্রযোজ্য হবে। তিন, যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে বাংলাদেশের বাইরে কোনো অপরাধ করে, তাহলে ওই অপরাধেও সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া বাংলাদেশে সংঘঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি ও অপরাধের ক্ষেত্রে এ আইনের বিধানাবলি প্রযোজ্য হবে।

অতিরাষ্ট্রিক প্রয়োগের বিষয়টি সন্ত্রাসী কার্যক্র্মের ধারা বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করেই আইনে সন্নিবেশিত হয়েছে। কারণ, অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। যেকোন দেশের বিপথগামী ব্যক্তিরা অন্য কোনো দেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে নিজ দেশে ফিরে সন্ত্রাসী অপরাধ সংঘটন করতে পারে এবং করেও থাকে। একইভাবে অন্য কোনো দেশ থেকে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করার জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বা উপকরণ নিয়ে আসে বা অন্য কোনো দেশের সন্ত্রাসী সংগঠন এগুলো নিয়ে আসতে পারে।

আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে সন্ত্রাসী কার্যের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অখন্ডতা, সংহতি, নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার জন্য জনসাধারণ বা জনসাধারণের কোনো অংশের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে সরকার বা কোনো ব্যক্তিকে কোনো কাজ করতে বা করা থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে যদি কেউ (ক) কোনো ব্যক্তিকে হত্যা, গুরুতর আঘাত, আটক বা অপহরণ করে বা ব্যক্তির কোনো সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করে অথবা (খ) ‘ক’ এর উদ্দেশ্য সাধনকল্পে কোনো বিস্ফোরক দ্রব্য, দাহ্য বস্ত্ত, আগ্নেয়াস্ত্র বা অন্য কোনো প্রকার রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করলে বা নিজ দখলে রাখলে, ওই ব্যক্তি ‘সন্ত্রাসী কার্য’ সংঘটনের অপরাধ করবে। এ ধরনের অপরাধের জন্য শাস্তি হবে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড অথবা অনুর্ধ বিশ বছর সশ্রম কারাদন্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডিত করা যাবে।

এ আইনের একটি উলে­খযোগ্য বিষয় হলো সন্ত্রাসী কার্যে অর্থ যোগান সংক্রা্ন্ত বিষয়াদি। বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের ভিত্তিতে এ বিধানটি সন্নিবেশিত করা হয়েছে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য অর্থের প্রয়োজন হয়। আইনের বিধান অনুযায়ী অর্থ যোগানের বিষয়টি প্রমাণিত হলে সাজা হবে অনধিক বিশ বছর এবং অন্যুন তিন বছর এবং এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডও আরোপ করা যাবে। এ ছাড়া অপরাধ সংক্রান্ত অন্যান্য বিধান ও শাস্তির ব্যবস্থাও আইনে রয়েছে। যেমন, নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যপদ, নিষিদ্ধ সংগঠন সমর্থন, অপরাধ সংক্রান্ত ষড়যন্ত্র, প্রচেষ্টা, সহায়তা, প্ররোচনা ও অপরাধীকে আশ্রয় প্রদানের জন্য বিভিন্ন মেয়াদের শাস্তির উল্লেখ রয়েছে।

সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে আর্থিক সহায়তা প্রতিরোধকল্পে বাংলাদেশ ব্যাংককে সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়েছে। ব্যাঙ্কিং চ্যানেলের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা নিরোধকল্পে ব্যাংকগুলোতে সুনির্দিষ্ট অনুশাসন ও আইনের বিধান রয়েছে। উপর্যুক্ত বিধানাবলি প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ ও নির্দেশনা আরোপ করা হয়েছে। যথা, (এক) সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সম্মতি বা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ব্যতিরেকে কোনো ব্যাংকের কোনো দলিল বা নথিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রবেশাধিকার থাকবে না এবং (দুই) প্রত্যেক ব্যাংক অর্থসহায়তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনসহ কর্মকর্তাগণ এ সংক্রান্ত দায়িত্ব প্রতিপালন করছে কিনা তা নিশ্চিত করবে। এ সম্পর্কে যাবতীয় নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংক প্রদান করবে এবং ব্যত্যয়ের ক্ষেত্রে অনধিক দশ লাখ টাকার জরিমানা দিতে হবে।

আইনের অন্যান্য বিধানের মধ্যে রয়েছে সরকার প্রয়োজনীয় মনে করলে সংগঠন নিষিদ্ধকরণ, সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, তদন্ত পদ্ধতি এবং বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, বিচার পদ্ধতি, তদন্ত ও বিচারের জন্য সময় নির্ধারণ, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে ব্যবহূত বস্ত্তর দখল, পারস্পরিক আইনগত সহায়তা, অপরাধের আমল ও জামিন অযোগ্যতা, এবং বিচারাধীন মামলা কোর্ট পরিবর্তনের পূর্বানুমতি।  [এ.এম.এম শওকত আলী]

গ্রন্থপঞ্জি  Bangladesh Gazette (Extraordinary), 24 February 2009.