সত্যধর্ম


সত্যধর্ম  হিন্দুদের একটি সাধন পন্থা। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এই তিন কালের বিভাগকে অতিক্রম করে যার স্থিতি, যে ধর্ম সত্যস্বরূপ, পরম পিতার একমাত্র অভিপ্রেত এবং যে ধর্ম অসৎকে সৎ করে তাকেই বলে সত্যধর্ম। পরম পিতা ও জীবাত্মার সম্বন্ধ এবং জীবাত্মার মুক্তির উপায় এ ধর্মের প্রধান আলোচ্য বিষয়। এ ধর্মে বলা হয়েছে যে, মানুষ নিজের কর্মানুসারে আত্মপ্রসাদ বা আত্মগ্লানি ভোগ করে। দেহত্যাগের পর আত্মা পরলোকে অবস্থান করে। পরলোকগত আত্মাসমূহের কয়েকটি পুনরায় জন্মগ্রহণ করে, আর অবশিষ্টগুলি পরলোকেই অবস্থান করে। সত্যধর্ম মতে সাকার উপাসনা নেই।

সত্যধর্ম হিন্দুদের জাতিভেদ প্রথা স্বীকার করে না। এখানে স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই পরম পিতার সন্তানরূপে পরস্পর সহোদর-সহোদরা। এই ভ্রাতৃত্ববোধ ক্রমে বিশ্বের সব চেতন পদার্থে সম্প্রসারিত হয়। এ ধর্মে নির্বাণ প্রাপ্তির কথা নেই। পরমেশ্বর অনন্ত ও গুণময়। সাধনার দ্বারা জীব যত উন্নত স্তরেই উঠুক না কেন সে পরম পিতার সমান হয় না বা নিজেকে পরমাত্মাতুল্য বোধ করতে পারে না। ফলে  বেদান্ত ঘোষিত ‘তত্ত্বমসি’, ‘সোহম্’ তত্ত্ব সত্যধর্ম অনুমোদন করে না। পরমেশ্বর অনন্ত গুণের অধিকারী। তাঁর এক বা একাধিক গুণে গুণান্বিত হয়ে সাধক কখনও অনন্ত গুণময় পরমেশ্বর হতে পারে না। জগৎ ও জীবনের কল্যাণের জন্য সাধককে প্রীতি, ভক্তি, প্রেম প্রভৃতি গুণ অর্জনের সাধনা করতে হয়। আর এজন্য ঈশ্বরের উপাসনা এবং তাঁর গুণের অনুশীলন সাধনার অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত।

উপাস্যকে আত্মার আভরণ করাকে উপাসনা বলে। পরম পিতার গুণকীর্তন ও স্বীয় পাপ উক্তি এ দুটি ভাগে উপাসনাকে ভাগ করা হয়। উপাস্যের গুণকীর্তন এবং তাঁর নিকট বা তাঁর উদ্দেশে স্বীয় পাপের উল্লেখ করাই উপাসনা। পরম পিতার নিকট প্রার্থনা করাও এ ধর্মের অঙ্গ। প্রার্থনা তিন প্রকার: পাপ থেকে মুক্তির জন্য প্রার্থনা, গুণের নিমিত্ত প্রার্থনা এবং ভিক্ষা। দিনে তিনবার উপাসনা করার বিধান আছে। উপাস্যের গুণকীর্তন উপাসনার বিশেষ অঙ্গ। স্তবে ও গানে পরম পুরুষের গুণকীর্তন করতে হয়। গুণকীর্তনের পর সাধক নিজ নিজ পাপ উল্লেখ করে আত্মগ্লানি বোধ করে এবং পাপ থেকে উদ্ধারের জন্য প্রার্থনা করে।

সাধনা শব্দের অর্থ অভ্যাস করা। যদিও উপাসনার মাধ্যমেই গুণের বৃদ্ধি হয় তথাপি যথোচিত অভ্যাস না করলে প্রকৃত গুণের উন্নতি হয় না। সুতরাং সাধনা অর্থাৎ গুণাভ্যাস একান্ত প্রয়োজন। মানব জন্মের সার্থকতা সম্পাদন, জীবাত্মার বিনাশ-সাধন, ভগ্নাংশের অখন্ডাকারে পরিবর্তন এগুলিই হচ্ছে সত্যধর্মের সারকথা। গুণানুশীলন এবং সাধনার দ্বারা আত্মকষর্ণরূপ উৎকৃষ্ট উপায়ের মাধ্যমে পারলৌকিক সাধনসমৃদ্ধ মহাপুরুষগণ এ ধর্মের প্রচারক। এই মহাত্মাদের অনুগ্রহ লাভের জন্য প্রেম, সরলতা, পবিত্রতা, একাগ্রতা, ভক্তি ও ঈশ্বরে বিশ্বাস এই গুণগুলি অর্জনে সাধকের যত্নবান হওয়া একান্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশে এ ধর্মের বেশ কিছু অনুসারী রয়েছে। তারা গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করে। বিভিন্ন সময়ে তারা একত্র মিলিত হয়ে ধর্মচর্চা করে।  [পরেশচন্দ্র মন্ডল]