সচিবালয় নির্দেশাবলি


সচিবালয় নির্দেশাবলি সরকারি কাজকর্ম পরিচালনার কার্যবিধি। এটি দাপ্তরিকভাবে সংকলিত একটি দলিল এবং তা রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রচারিত হয়। এ দলিলের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৮৯৯ সালের মে মাসে ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন একটি স্মারকপত্রে সচিবালয়ে বিভিন্ন নথিতে অতিরিক্ত লেখালেখির দীর্ঘসূত্রিতার প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেন। এছাড়া বিভিন্ন বিভাগের সূত্রোল্লেখ এবং এসব বিভাগে কাগজপত্র চালাচালির প্রচলিত অদক্ষ পদ্ধতির কথাও তিনি এই স্মারকপত্রে উল্লেখ করেন। পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য লর্ড কার্জন নিজেই কতিপয় সুপারিশ প্রদান করেন। তাঁর সুপারিশসমূহ এবং সেগুলিতে বিভিন্ন বিভাগের সংশোধনী পরবর্তী সময়ে চূড়ান্তভাবে ‘সচিবালয় নির্দেশাবলি’ নামের একটি দলিলে অন্তর্ভুক্ত হয়। ‘সচিবালয় নির্দেশাবলি’ অতিরিক্ত নোট লেখালেখি কমানো এবং অন্তর্বিভাগীয় ও আন্তঃবিভাগীয় নানা বিষয়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও আলোচনায় উৎসাহ দানের উপর অধিক গুরুত্ব দেয়। ১৯১৯ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে সচিবালয়ের প্রচলিত কার্যপদ্ধতি উন্নয়ন এবং ‘সচিবালয় নির্দেশাবলিতে’ পরিবর্তন সংক্রান্ত সুপারিশ প্রদানের জন্য কয়েকটি কমিটি গঠিত হয়। তবে কার্যকলাপ পরিচালনা প্রণালীর মূল কাঠামো ও বিষয়বস্ত্ত শেষাবধি কমবেশি অপরিবর্তিতই থেকে যায়।

১৯৬২ সালে কেন্দ্রীয় সরকার ‘সচিবালয় নির্দেশাবলি’ সংশোধন করে যে দলিল প্রণয়ন করে তার ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তান সরকার ১৯৬৩ সালে নিজস্ব একটি ‘সচিবালয় নির্দেশাবলি’ প্রচার করে। দলিলের নির্দেশাবলি মোটামুটি যেসব বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল সেগুলি হচ্ছে: (ক) সচিবালয়ের বিভাগীয় সংগঠন ও কর্ম বণ্টন; (খ) কাজকর্ম নিষ্পত্তির ধরন; (গ) নোট নথিভুক্তকরণ খসড়া তৈরি; (ঘ) অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে আলোচনা; (ঙ) বিভাগ বহির্ভূত কর্মকর্তাদের নিকট ও তাদের কাছ থেকে আসা সূত্র উল্লেখ; (চ) সচিবালয়ের বিভাগসমূহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিদপ্তরগুলির প্রধানদের কাছ থেকে প্রাপ্ত সূত্র উল্লেখ; (ছ) বিদেশী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ; (জ) বিলম্ব নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে সর্তকতা; (ঝ) পরিদর্শন; (ঞ) সভানুষ্ঠান; (ট) গোপন দলিলসমূহের ব্যবহার ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা; (ঠ) আইন প্রণয়নের প্রস্তাবসমূহ নিষ্পত্তির ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত দাপ্তরিক কার্যক্রম; (ড) বিভাগসমূহ কর্তৃক প্রদেয় নির্দেশাবলির তালিকা ইত্যাদি।

বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে নতুন ‘সচিবালয় নির্দেশাবলি’ প্রস্ত্ততের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ উদ্দেশ্যে কেবিনেট সচিব কর্তৃক গঠিত ৪ সদস্যের একটি কমিটি ১৯৭৫ সালের অক্টোবরে তাদের কাজ শেষ করে। তাদের তৈরি সচিবালয়ের নির্দেশাবলির খসড়াটি মতামতের জন্য সকল সচিবের কাছে পাঠানো হয়। তারপর প্রশাসনিক উন্নয়ন কমিটির সচিবদের কাছে এটি দাখিল করা হয় এবং ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে এ কমিটি খসড়াটিকে চূড়ান্ত রূপ দান করে। পরবর্তীকালে সচিবালয় নির্দেশাবলির বঙ্গানুবাদ প্রকাশ সহ কাজটি সমাপ্ত করার জন্য ৭ জন বিশেষজ্ঞের একটি কমিটি গঠিত হয়। ১৯৭৮ সালের অক্টোবর মাসে সচিবালয় নির্দেশাবলির বাংলা সংকলন প্রকাশিত হয়।

বৈশিষ্ট্য ও বিষয়বস্ত্তর দিক থেকে পূর্বের সকল উদ্যোগের মতো সচিবালয় নির্দেশাবলির বাংলা অনুবাদ ছিল অনেকটা ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত ইংরেজি সংকলনের মতো। সচিবালয় নির্দেশাবলির বাংলা অনুবাদটি সচিবালয়ে এবং বাইরে ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হয়ে আসছে। সচিবালয় নির্দেশাবলির মুখবন্ধে স্পষ্টতই উল্লেখ আছে যে, গ্রন্থভুক্ত নির্দেশাবলি কার্যবিধির ৪(১০) আইন অনুসারে জারি করা হয়েছে। অবশ্য কার্যবিধির নির্দেশের সঙ্গে এসব নির্দেশের কয়েকটির অধিক্রমন ও পুনরাবৃত্তি রয়েছে।  [এ.এম.এম শওকত আলী]