সংস্কৃতি, বস্ত্তগত


সংস্কৃতি, বস্ত্তগত  একটি দৃশ্যমান প্রক্রিয়া যা ভাবনা এবং অনুভূতিকে ত্রিমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পর্যন্ত বিস্ত্তত করে।  বস্ত্তগত সংস্কৃতি তৈরি হয় নির্মিত, বিপুলভাবে পরিচালিত, পরিকল্পিত, গড়ে উঠা, পরিবর্তিত এবং ব্যবহূত ধরা-ছোঁয়ার বস্ত্ত দ্বারা। শিল্প, কলা, কারুশিল্প, স্থাপত্য, সারসরঞ্জাম এবং খাদ্য হলো বস্ত্তগত সংস্কৃতি। আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে বলতে গেলে বলা যায়, বস্ত্তগত সংস্কৃতি হলো ব্যক্তি এবং সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন জীবনের সমগ্রতা। এটি গভীরভাবে, ব্যক্তিগত, সামাজিক, মানসিক এবং শারীরিক। বস্ত্তগত সংস্কৃতির স্বাভাবিক ব্যবহারিক ও সৃজনশীল কর্মকান্ডের গভীরতা জটিলতা বিবেচনায় এটি সামাজিকভাবে সঞ্চারিত জ্ঞান, আচরণের ধরনের, অনুশীলন ও সৃজনশীলতার, উৎপাদন এবং ভোগের এক মূর্ত প্রকাশ। বস্ত্তগত সংস্কৃতি গবেষণা শুধুমাত্র কতগুলি বস্ত্তর অধ্যয়ন নয়। এটি সামাজিক জীবনের বস্ত্ত এবং কৌশল আন্তসম্পর্ক। মোটকথা এটি হলো মানুষের সাংস্কৃতিক সংহতির অধ্যয়ন।

বস্ত্তগত সংস্কৃতির লক্ষণকে কেন এতোটা গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি ভাবা উচিৎ? কীভাবে এটি স্বাতন্ত্র্যমন্ডিত? ইতিহাসবেত্তা এবং সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘকাল ধরে যুক্তি প্রদর্শন করেছেন যে, মানুষের পূর্বেকার আচার-আচরণ উপলব্ধির ক্ষেত্রে বস্ত্তর চেয়ে বরং শব্দ অধিকতর ভালো সম্পদ। বর্তমানে অভিজ্ঞতাবাদী উপাত্তের এক স্বতন্ত্র ধরন হিসেবে বস্ত্তগত সংস্কৃতিকে গণ্য করা হয়। বস্ত্তগত সংস্কৃতির নিষ্ঠাবান শিক্ষার্থীরা তাদের কোন অনুসন্ধানের জন্য বিদ্যমান প্রমাণিক বিষয় এবং পরিসংখ্যানগত উপাত্তকে অস্বীকার করতে পারে না। বস্ত্তগত সংস্কৃতি গবেষণা অতীতের কথা ও বস্ত্তর সঙ্গে জড়িত। তবে কতগুলি প্রামাণিক বৈশিষ্ট্য তথ্যের গুরুত্ব, অস্থায়ী বন্ধন, ত্রিমাত্রিকতা এবং বিস্তৃত প্রতিনিধিত্বশীলতা প্রমাণিকীকরণ উৎসের চেয়ে শারীরিক সাক্ষ্যে প্রধান।

বস্ত্তগত সংস্কৃতি সংস্কৃতির একটি উপাদান সম্ভবত সবচেয়ে বড় উপাদানই। আমরা যা কিছু তৈরি করি সেসবের ব্যাপারে মানবিক অভিব্যক্তিগুলিই এটি আলিঙ্গন করে। এটি আবার প্রাকৃতিক সম্পদকে সাংস্কৃতিক সম্পদে রূপান্তর করার জন্য জ্ঞান আহরণের সচেতন প্রচেষ্টা বোঝায়। আবার এটি জ্ঞানের মধ্যে একটি সচেতনতা দেখায়, যা প্রাকৃতিক সম্পদকে সাংস্কৃতিক শিল্পে রূপান্তরিত করে।

মানুষ তার তার কর্মকান্ড সম্পর্কে লিখবার অথবা বলবার অনেক আগ থেকেই বিভিন্ন জিনিস বানাতে থাকে। এদিক থেকে কথ্য সংস্কৃতি চেয়ে বস্ত্তগত সংস্কৃতির বয়স বেশি। নানা উপকরণ তৈরির ঘটনা সব সংস্কৃতিতেই ঘটেছে। প্রায় সব সংস্কৃতিইে দেখা গিয়েছে বস্ত্তত লেখা আবিষ্কারের বহু আগেই সেটির উদ্ভব ঘটেছিল। সুতরাং, মানবতার সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির সবচেয়ে পুরনো উত্তরাধিকার হলো বস্ত্তগত সংস্কৃতি। বস্ত্তত, আমাদের মানবিকতার প্রাচীনতম প্রকাশ এই বস্ত্তগত সংস্কৃতি।

ইতিহাসের চেয়ে বিপুল দীর্ঘতর প্রাক-ইতিহাসের জন্য আমরা পুরোপুরি নির্ভরশীল বস্ত্তগত সংস্কৃতির উপর। লেখা দলিলের উপর নির্ভরশীল মানুষের ইতিহাসের বয়স প্রায় ছয় হাজার বছর। তবে, এই সময়কালের সাক্ষ্যপ্রমাণের বড় অংশই পাওয়া গেছে কারুপণ্য রূপে। মানুষের পুরো ইতিহাস বিবৃত করতে প্রত্নতত্ত্ববিদরা বস্ত্তগত সংস্কৃতির বিশ্লেষণ এর মাধ্যমে এই মানবিক গল্পকে আরও পঞ্চাশ হাজার বছর পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারেন।

কোন স্থান এবং সময়ের লিখিত প্রমাণাদি কিংবা পর্যাপ্ত সাক্ষ্যের অভাবে সেখানে বস্ত্তগত সংস্কৃতিই হলো মানুষের কার্যক্রম বিষয়ে অন্তর্দৃষ্টি অর্জনের সবচেয়ে ভালো উপকরণ। মানুষের নির্মিত বিভিন্ন বস্ত্তর নামে ইতিহাসবেত্তারা সাধারণত মানব ইতিহাসের বড় পর্যায়গুলিকে চিহ্নিত করেন। এইভাবে বস্ত্তগত সভ্যতার প্রগতিকে চিত্রিত করতে প্রস্তর, তাম্র, ব্রোঞ্জ ও লৌহ এই চার যুগে ভাগ করা হয়। প্রস্তর যুগকে ভাগ করা হয়: প্যালিওলিথিক (প্রাচীন প্রস্তর পাথর যুগ হিসেবে পরিচিত), মেসোলিথিক (মধ্য প্রস্তর যুগ বলে পরিচিত) ও নিওলিথিক (যেটিকে নব্য প্রস্তর যুগ নামে পরিচিত) এই তিন স্তর কালে। এই তিনটি স্তর প্রথম ব্যবহূত হয় ইউরোপের প্রাগ-ইতিহাসের ক্ষেত্রে। প্রস্তর যুগ, তাম্র যুগ, ব্রোঞ্জ এবং লৌহ যুগ যথাক্রমে প্রস্তর যুগের সংস্কৃতি, তাম্য যুগের সংস্কৃতি, ব্রোঞ্জ সংস্কৃতি এবং লৌহ যুগের সংস্কৃতি উপস্থাপন করে। প্রস্তর এবং তাম্র যুগের ক্রান্তিকালীন পর্যায়ের সংস্কৃতি ক্যালকোলিথিক সংস্কৃতি নামে পরিচতি।

প্রত্নতত্ত্ব এবং ইতিহাস বলে যে, বস্ত্তগত সংস্কৃতি হলো সময়ের দিক থেকে সবচেয়ে প্রাচীন। এটি হলো অতীতের সত্যিকারের অবস্থা যা বর্তমান সময়েও চলছে। আমরা হয়তো বেশি দিন লালন শাহের গান শুনতে পারবো না, কিন্তু আমরা দশ শতকের তাম্রলিপি অথবা উনিশ শতকের পাথর ম্যাটের শ্রম প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারি। শক্ত এবং যদি নষ্ট না হওয়া অতীতের এমন অনেক প্রত্নদ্রব্য আমাদের কাছে এসেছে যা গবেষকদের লিখিত রেকর্ডের বাইরে মানুষের সংস্কৃতির পরিবর্তন এর মাধ্যমে মানুষের আচরণ জানতে সাহায্য করেছে।

বস্ত্তগত সংস্কৃতির প্রামাণিকরণের শক্তি কখনও অতিরঞ্জিত হওয়া উচিৎ না। সকল প্রত্নদ্রব্য আগে-পরে ছিঁড়ে, ভেঙ্গে, নষ্ট, কিংবা ঠিক না করা অথবা হারিয়ে যেতে পারে। যাদুঘর অথবা অন্যান্য গুদামে সংরক্ষিত রাখা প্রত্নদ্রব্যের ক্ষেত্রেও এটি ঘটতে পারে। কাঠের জিনিস, ধাতুর অক্সিডাইজ, পাথর ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং কাগজ ছিঁড়ে যাওয়া সত্ত্বেও, বস্ত্তগত সংস্কৃতি মানুষের অন্যান্য আদি নিদর্শন থেকে সবচেয়ে বেশিদিন টিকে থাকে।

বস্ত্তগত সংস্কৃতি এর সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলি প্রামাণিকরণ হিসেবে যথেষ্ট মূল্যবান যদিও অন্যান্য ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে বাস্তবভাবে দেখা যায় এটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করার খুবই কম প্রমাণ আছে। নৃবিজ্ঞানী উইলিয়াম রাজে বস্ত্তগত সংস্কৃতির এই বিষয়গুলি নিয়ে বলেছেন যে, নৃবিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবেত্তা এবং অন্যান্য পন্ডিতরা যা বোঝে তা নির্ভুল, অবিসংবাদি, বিজ্ঞানসম্মত, তদন্তসাপেক্ষ এবং তা প্রথাগত বিশ্লেষণকেন্দ্রিক কৌশলের উপর ভিত্তি করে স্বাধীন ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। একইভাবে শারীরিক উপাদান অনেকটাই মানুষের কর্মকান্ডের কম পক্ষপাতদুষ্ট প্রমাণ যেগুলি এখনও কোন ধরনের নেতিবাচক ধারণা হিসেবে বেঁচে আছে তা নয় ঘটনা হিসেবেই টিকে আছে।

নৃবিজ্ঞানী এবং প্রত্নতত্ত্ববিদরা কমপক্ষে ১৮৭০ সাল থেকে বস্ত্তগত সংস্কৃতির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করে আসছেন আর ইতিহাসবেত্তা এবং অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানীরা খুবই সাম্প্রতিককালে সংস্কৃতি বিশ্লেষণে এই প্রত্যয় ব্যবহার করছেন। নৃবিজ্ঞানী এ. লেইন-ফক্স পিট রিভার্স প্রথম বস্ত্তগত সংস্কৃতি প্রত্যয়টি ব্যবহার করেন। ১৮৭৫ সালে ‘সাংস্কৃতিক বিবর্তন’-এর উপর লেখায় পিট রিভাস সমাজবিজ্ঞানের নতুন গবেষকদের বস্ত্তগত সংস্কৃতিকে ‘মনের নির্দিষ্ট ধারণার প্রতীকী ধরন’ হিসেবে বিবেচনা করতে অনুরোধ জানান।

প্রত্নত্ত্ববিদের মত শিল্প ইতিহাসবেত্তা, প্রযুক্তিনির্ভর ইতিহাসবেত্তা, সামাজিক ঐতিহাসিক, আচরণবিদ, এথনোগ্রাফার এবং লোক বিশারদরা এখন প্রত্নদ্রব্য থেকে মানুষের আচরণ সৃষ্টি এবং পরিবর্তন দেখার জন্য পদ্ধতির প্রয়েজনীয়তার কথা স্বীকার করছেন। প্রত্নদ্রব্য সম্পর্কে বুঝতে পেরে শিল্প ইতিহাসবিদ জুলস প্রাউন বলেন, ‘আমরা প্রথম অবস্থাতেই অন্য মন নিয়ে সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে পারি না, আমাদের বোধ দিয়ে আমরা সাংস্কৃতিক পক্ষপাত তৈরি করি’। প্রাউন একে পরবর্তীকালে ব্যাখ্যা করেন যে, বোধের মাধ্যমে এই বোঝাপড়া প্রক্রিয়া ইতিহাসবেত্তাদের নিজেদের ব্যক্তির মধ্যে নিয়ে গেছে যিনি এটি সম্পাদন করেছেন, তৈরি করেছেন, ব্যবহার অথবা উপভোগ করেছেন। প্রাউন বলেন, ‘তাদের দৃষ্টিতে দেখো এবং তাদের হাতে অনুভব করো তাদেরকে সহানুভুতির সঙ্গে বিশ্লেষণ করো- এটি পরিষ্কারভাবেই লিখিত ভাষার চেয়ে অতীতের সঙ্গে যুক্ত থাকার পথ’। তিনি এই বস্ত্তগত সংস্কৃতি তথ্য থেকে প্রাপ্ত বিশেষ বোধ সম্পন্ন জ্ঞানের দাবি করে বলেন, এটির জ্ঞানতত্ত্বীয় অনেক সমালোচনা থাকলেও শিল্প ইতিহাস এবং প্রযুক্তি নির্ভর ইতিহাসবিদদের মধ্যে এর অনেক সমর্থক ছিলো। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ব্রুক হিন্ডেল লিখেছেন, ‘প্রযুক্তি নির্ভর ইতিহাসবিদদের লেখার যন্ত্রপাতি এবং প্রক্রিয়ার বাইরে যেতে হবে। তিনি অবশ্যই এটিকে তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন’। সামাজিক ইতিহাসবিদরা কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায় অথবা সমাজের নির্দিষ্ট সময়ে সামাজিক বিশ্বাস-মূল্যবোধ, ধারণা, আচরণ এবং অনুমান- প্রত্নদ্রব্যের মধ্যেই গবেষণা করতে আগ্রহী। আচরণবিদরা মানুষ এবং বস্ত্তর মধ্যে কী ঘটছে তা বোঝার চেষ্টা করেন। আসলে বস্ত্তগত সংস্কৃতি মানুষের ব্যবহার, চলাচল এবং পদ্ধতি দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত যা সুসংগঠিত আচরণ দ্বারা নির্ধারিত। আচরণবিদরা মানুষকে দুইভাগে ভাগ করেছেন। সাধারণ গ্রুপ হলো এথনিক, জাতিগত, আঞ্চলিক, ধর্মীয় এবং পেশাগত। মানুষ তার গ্রুপ পরিচয় তুলে ধরতে বিভিন্ন বস্ত্ত ব্যবহার করে। তারা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিশেষ ধরনের পোশাক পরে বিশেষ খাবার গ্রহণ করে এবং  এবং পরের দিন কাজের জায়গায় নিয়মানুযায়ী পোশাক পরে এবং খায়। আচরণবিদরা গ্রুপের বিভিন্ন বস্ত্ত সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ করে গ্রুপ বৈশিষ্ট্য এবং পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চিহ্নিত করে। ‘বস্ত্তগত সংস্কৃতি এথনোগ্রাফারদেরও আগ্রহের জায়গা। যেহেতু এথনোগ্রাফী হলো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গ্রুপে বিভক্ত মানুষদের একটি বিজ্ঞান। এথনোগ্রাফাররা কোন ধরনের বিক্ষিপ্ত ধরনের বিষয়ে আগ্রহী হয় না বরং মানুষ এবং বস্ত্তর সম্পর্ক খোঁজার বিষয়ে আগ্রহী। লোকবিশারদদের কাছে বস্ত্তগত সংস্কৃতি হলো মূল্যবোধ এর প্রতিবিম্ব এবং নির্দিষ্ট লোক বিষয়ের প্রতীকী অংশীদারিত্ব। অবস্থা, প্রতীক এবং ঐতিহ্য হলো কোন সংস্কৃতির একটি নির্ধারক উপাদান যে নির্ধারণ করবে কোনো বিষয় লোক হয়ে উঠবে। হেনরী গ্লাসি বলেন, ‘অবস্থা হলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি চলমান, বস্ত্তর উপাদান খুব কমই পরিবির্তত হয়’। লোক হোক বা না হোক প্রত্যেক সংস্কৃতির একটি প্রতীক আছে। এটি অনেক বেশি বোঝা যায় যে, বস্ত্তগত লোক সংস্কৃতিতে, মানুষ প্রতীকের প্রতি প্রক্রিয়া দেখায় কারণ মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবতা থেকে প্রতীকের প্রতি সাড়া দেয়। আর ঐহিত্য হলো মানুষের অতীত কেন্দ্রিক সৃষ্টি। বস্ত্তগত লোক সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ এবং প্রাক-শিল্পীয়। এটির জন্য প্রথাগত দক্ষতার প্রয়োজন, এটি  হাতে তৈরি এবং কায়িকশ্রমে চালিত হয় এবং অল্পকিছু যান্ত্রিক সহযোগিতা অথবা কোন সাহায্য ছাড়াই চলে। লোক শিল্পীরা সামাজিকভাবে মুখে মুখে ঐতিহ্য ছড়ায় এবং তাদের উৎপাদিত দ্রব্যে প্রতীকের থাকে।

বস্ত্তগত সংস্কৃতির প্রমাণের বিভিন্ন ধরনের দাবী বর্তমানে থাকা সত্ত্বেও এটা স্বীকার করতেই হবে যে, সংস্কৃতি উৎঘাটনে বস্ত্তগত সংস্কৃতির তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে পদ্ধতিগত সমস্যাসহ নানা সমস্যা যুক্ত আছে। বস্ত্তগত সংস্কৃতি গবেষণায় বিভিন্ন সমস্যার অভিঘাত তথ্য বেশি দিন টিকে না; এ জন্য তথ্য প্রাপ্তি এবং দেখার ক্ষেত্রে সমস্যা আছে বলে মানুষের দক্ষতাকে অতিরঞ্জিত করা হয় এবং তা সিক্রনিক বিশ্লেষণের দিকে যায়। বস্ত্তগত সংস্কৃতির গবেষকরা তাদের তথ্যের পুরোটা বুঝতে প্রায়শই ব্যর্থ হয়। প্রত্নদ্রব্য নির্বাচনের সমস্যা, খারাপ অবস্থা এবং হারিয়ে যাওয়ার কারণে বস্ত্তগত সংস্কৃতির প্রমাণ তৈরি একটি জটিল প্রক্রিয়া হয়ে গেছে। কোন কোন প্রত্নদ্রব্য বেঁচে থাকবে, আর কোন কোনটি থাকবেনা এর উপরই বেশিরভাগ গবেষণা হওয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পাথর এবং কাঠের অনেক জিনিসই তাদের জৈব কাঠের অংশটুকু হারিয়ে ফেলেছে, যার ফলে কাঠের কাজের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের জন্য পন্ডিতদের খুবই সমস্যা হয়েছে। কাঠ হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বস্ত্ত। জলবায়ু এর বেঁচে থাকা বা না থাকার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঠান্ডা মাটিতে যেমন রাশিয়ার সমতল অঞ্চল এবং মিশরের শুষ্ক অঞ্চলে কাঠ ভালোভাবে সংরক্ষণ করা যায়, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল হিসেবে বাংলাদেশে যেখানে অতিবৃষ্টি, এসিড মাটি, বেশি আর্দ্রতা, ক্ষয়, অনেক বেশি গাছপালা এবং পোকামাকড় থাকায় জলবায়ু কাঠের জন্য খুবই ক্ষতিকারক। এমনকি ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার ঠান্ডা আবহাওয়াও কাঠের জন্য ভালো নয়। কিছুটা উষ্ণ এবং উঠানামা করা তাপমাত্রা এই পদ্ধতিকে নিঃশেষ করে ফেলে। কোন কোন পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় বিষয়বালীও এই ক্ষতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। আমাদের জাদুঘরে সংগ্রহে থাকা সত্ত্বেবও কত জিনিস হারিয়ে গেছে আমাদের সেই বিষয়ে ধারণা খুবই কম। বেশিরভাগ এশিয়ান এবং আফ্রিকান দেশেরই তাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সম্পত্তি হারিয়ে ফেলেছে যেগুলি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বোঝার জন্য খুবই জরুরি। অতীতের বাস্তবতা আর বর্তমানের বস্ত্তর অবস্থানের মধ্যকার ফাঁক কতোখানি আছে এই দেশগুলির এই বিষয়ে সচেতনতা বেশি নয়। কোন কোন ঐতিহাসিক ঘটনায় দেখা গিয়েছে যে, নারীর আবিষ্কার হারিয়ে গেছে আর পুরুষের আবিষ্কার থেকে গেছে। বেশিরভাগ প্রত্নদ্রব্য নিম্নশ্রেণি থেকে মধ্য এবং উচ্চশ্রেণিতে টিকে আছে। সামাজিক ইতিহাসবিদদের এই সমস্যা কমিয়ে আনার জন্য লিঙ্গীয়, জাতি, এথনিসিটি এবং আর্থসামাজিক স্তরকে গুরুত্ব দিতে হবে। এমনকি যখন পর্যাপ্ত তথ্য থাকে, তখন বস্ত্ত সম্পূর্ণভাবে তাদের ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতের বাইরে বিচ্ছন্নভাবে এসে গবেষকদের কাছে হাজির হয়। এই ধরনের পরিপ্রেক্ষিত আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতকে বিবেচনায় না আনায় প্রত্নদ্রব্য এখন হয়ে পড়েছে স্যুভেনিয়রের চেয়ে একটু বেশি মর্যাদার মাত্র। লোক গৃহ যেখান থেকে এই লোকশিল্প উৎপাদিত হয়েছে বেশিরভাগ গবেষণা সেগুলি বাদ দিয়ে গবেষণা করে।  ‘স্থনের বাইরে’ মানে হলো ‘দৃষ্টির বাইরে’।

উইলকম্ব ওয়াসবার্ন এর মতে, ইতিহাসবিদরা প্রত্নদ্রব্যের অল্প কিছুই ব্যবহার করেন, কারণ তারা এই সমস্ত তথ্যে অল্পই প্রবেশাধিকার পান। বিভিন্ন কারণে প্রত্নদ্রব্য পন্ডিতদের কাছে সহজলভ্য করা হয় না। অন্যান্য তথ্যের মতো প্রত্নদ্রব্যের বিকল্প সহজে তৈরি করা, বিশ্লেষণ এবং তদেন্তর জন্য প্রকাশ করা যায় না। এমনকি জাদুঘরগুলি প্রত্নদ্রব্যগুলি ঠিকমতো ক্যাটালগ করার ক্ষেত্রেও তেমন সচেষ্ট নয়, যার কারণে ধারাবাহিক গবেষণার জন্য এগুলি খুঁজে পেতে গবেষকদের সমস্যা হয়। বস্ত্তগত সংস্কৃতি তথ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানে ওয়াসবার্ন প্রস্তাব করেন যে, প্রত্নদ্রব্যগুলিকে ছবি, অাঁকনি এবং অন্যান্য বহনযোগ্য এবং সংখ্যাভিত্তিক মাধ্যমে তৈরি করা যায়। গবেষকদের কাছে এখন নতুন হাতিয়ার হিসেবে কম্পিউটার আছে, যার মাধ্যমে তারা বস্ত্তগত সংস্কৃতির তথ্য কাজের জন্য সংগ্রহ করে রাখতে পারে। এখন ঐতিহাসিক সময়ের বস্ত্তগত সংস্কৃতির তথ্যের ব্যবহার এবং বিশ্লেষণের জন্য কম্পিউটার গ্রাফিকস, ক্লে মডেলিং, ডায়াগ্রাম, অনলাইন সহযোগিতা, অন্যান্য গবেষণা ধারণা এবং বিভিন্ন ধরনের কলাকৌশল বেড়েছে।

ওয়ারেন.ই রবার্টস বলেন, ‘তাদের নিজেদের জন্য আমাদের প্রত্নবন্তু গবেষণার দরকার নেই, কিন্তু তাদের জন্য করা প্রয়োজন যারা এইগুলি বানিয়েছে এবং ব্যবহার করে’। হেনরী গ্লাসি বলেন, ‘যে বস্ত্ত মানুষ বানাতে শিখে তাই হলো বস্ত্তগত সংস্কৃতি’। সংস্কৃতি হলো বুদ্ধিবৃত্তিক, যৌক্তিক এবং বিমূর্ত; এটি কখনও বস্ত্তগত হতে পারে না, কিন্তু বস্ত্ত তখনও বস্ত্ত সংস্কৃতি হতে পারে এবং বস্ত্তগত সংস্কৃতি মানুষের শিক্ষণের সঙ্গে একাত্ম হয়, যা একজন ব্যক্তিকে দৃশ্যমান এবং মূর্ত কোন বস্ত্ত উৎপাদন তৈরি করতে পরিকল্পনা, পদ্ধতি এবং কারণ তৈরি করার দিকে নিয়ে যায়।’

পৃথিবীর অবস্থা, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, চিন্তার উপস্থাপন এবং নকশার মানসিক চর্চার উপর ভিত্তি করে মানুষ প্রত্নদ্রব্যকে কাঠামো দেয় যাকে আমরা সৃজনশীলতা বলি। সৃজনশীলতা ব্যক্তির মাধ্যমে তৈরি হয় কিন্তু সকলের প্রজ্ঞার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গতা পায়। সকলের প্রজ্ঞা একটি আচরণ বৈশিষ্ট্য তৈরি করে এবং সম্পদায় এর জন্য গর্ববোধ করে। যার কারণে প্রত্নদ্রব্যে মানুষের আচরণ গবেষণা বস্ত্তগত সংস্কৃতির একটি বড় উদ্দেশ্য। যদিও সকল সমাজে প্রত্নদ্রব্যের মাধ্যমে একই ধরনের জ্ঞান চর্চা হয়, একই উদ্দেশ্য ও বিশ্বাস থাকে কিন্তু এখনও এটা অস্বীকার করা যায়না যে, ব্যক্তি তাদের নিজস্ব জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা দিয়ে কাজ করে। বস্ত্তগত সংস্কৃতির ব্যক্তির অনুভুতি এবং সমন্বিত জ্ঞানকে একত্র করে মানুষের মৌলিক অস্তিত্বকে উপস্থাপন করে।

প্রত্নতত্ত্ব এবং বস্ত্তগত সংস্কৃতি উভয়েই প্রত্নদ্রব্য নিয়ে কাজ করে। বস্ত্তগত সংস্কৃতির ভূমিকা পরিষ্কার করার জন্য বস্ত্তগত সংস্কৃতির সঙ্গে প্রত্নতত্ত্বের তুলনা করা যায়। জেমস দ্বিজ বলেন বস্ত্তগত সংস্কৃতি এবং প্রত্নতত্ত্বের মধ্যকার পার্থক্য একটি দিক। তিনি বলেন যে, প্রত্নবিদরাই মানুষের আচরণ স্বাধীনভাবে দেখতে পারেন তাদেরকে এথনোলজিস্টদের মতো সাবজেকটিভ বিশ্লেষণে যেতে হয় না। জাতিতত্ত্ববিদ মারবিন হ্যারিস প্রত্নতত্ত্ববিদদের এথনোলজিস্টদের ক্যাটাগরিকৃত তথ্য একত্র না করার জন্য দ্বিজকে সমর্থন করে। প্রথাগত জাতিতাত্ত্বিক বিষয়বলীকে আক্রমণ করেন। তিনি মনে করেন, প্রত্নত্ত্ববিদরা অনেকখানি এগিয়েছেন বস্ত্তর উপর নির্ভর করে; তারা মানুষের আচরণ বোঝার জন্য অবজেকটিভ পদ্ধতি তৈরি করেছে। দ্বিজ বস্ত্তগত সংস্কৃতি বলতে যেটিকে ‘সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল তথ্য’ বলেছেন সেটি থেকে সরে যান এবং বলেন জাতিতাত্ত্বিকদের সাবজেকটিভ বিশ্লেষণের বিপরীতে। মানুষের আচরণের সঙ্গেই বস্ত্তগত সংস্কৃতি এর গুরুত্ব আছে। এমনকি প্রত্নত্ত্ববিদরাও মানুষের আচরণ নির্মোহভাবে গবেষণা করতে পারে, পূর্বের মানুষ এবং ঘটনা যাদেরকে তারা কখনও জানেন না, সেটি তারা নতুনভাবে তৈরি করতে পারেন না। যেহেতু প্রত্নতাত্ত্বিকরা মৃত মানুষদের উপর গবেষণা করতে পারেনা, শুধু বস্ত্তর উপর কাজ করে, আমরা প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের বাইরেও বস্ত্তগত সংস্কৃতির গুরুত্ব বিবেচনা করতে পারি। বস্ত্তগত সংস্কৃতি কমপক্ষে বর্তমানের মানুষ এবং শারীরিক সৃষ্টি দেখতে পারে। এখন সত্যিকার পৃথিবীতে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত। যখন প্রত্নবিদরা বর্তমান সমাজ গবেষণা করে তারা তখন বস্ত্তগত সংস্কৃতি কৌশল প্রয়োগ করেন।

বস্ত্তগত সংস্কৃতির গুরুত্ব ভালোভাবে বোঝার জন্য আমরা বস্ত্তগত সংস্কৃতি গবেষণার একটি প্রকল্পের দিকে তাকাই যা এই বিষয়গুলিকে দেখে: মৃতশিল্প, পাট শিল্প, দারুশিল্প, স্থানীয় সাহপত্য। প্রত্যেক বিষয়ের জন্য ভৌগোলিকভাবে গবেষণার ক্ষেত্র পুরো বাংলাদেশ। মাঠকর্মের উপর ভিত্তি করে প্রত্যেক কাজেরই ধরন এবং বৈশিষ্ট্যে আঞ্চলিক বৈচিত্র্য আছে, এই বৈচিত্র্যতার জন্য ভৌগোলিক/প্রতিবেশগত, এথনিক, ধর্মীয়, সামাজিক এবং প্রযুক্তিগত কারণভিত্তিক ভিন্নতা আছে। শিল্পীরা অজ্ঞাত থাকতে পারেনা, তাদেরকে সামনে আসতে হবে, আমাদের পণ্যের স্রষ্টাকে জানতে হবে। বস্ত্তগত সংস্কৃতি গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকে হলো, ব্যক্তি তা তৈরি করছেন তার পর্যবেক্ষণকৃত ব্যবহার রেকর্ড করা, যিনি এটিকে গ্রহণ করছেন এবং যিনি এটিকে ব্যবহার করছেন সেটিও দেখা।  আরেকটা  উদ্দেশ্য আছে আর সেটি হলো কিভাবে প্রতীক তৈরি হয় এবং পরিবর্তিত হয়, কীভাবে বস্ত্ত মানুষের জন্য কাজ করে, কিভাবে নকশা তৈরি হয় এবং প্রয়োগ হয়। বস্ত্তগত সংস্কৃতির সবচেয়ে মৌলিক বিষয় হলো শব্দ থেকে বস্ত্ত এবং তার কাজ অনেক বেশি জোরে উচ্চারিত হয় এবং গবেষকরা বস্ত্তগত সংস্কৃতিকে দেখে যোগাযোগ এবং শিক্ষার বিষয় হিসেবে।

বস্ত্তগত সংস্কৃতি নিয়ে আধুনিক গবেষণা গুরুত্ব দিচ্ছে একজন শিল্পীর জীবন বৃত্তান্তের উপর যখন গবেষকরা যেখানে শিল্পী কাজ করছে এবং বস্ত্ত তৈরি করেছে সেই পরিবেশে ধারাবাহিক কথোপকথন পদ্ধতি ব্যবহার করেন তাহলে সেটি সেই পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য হয়ে যায়। একজন দক্ষ শিল্পী অনেক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, চিন্তক এবং সৃষ্টিশীল। যখন সে দীর্ঘ সময় ধরে পণ্য তৈরি করবে তার পণ্য সময়ের সাথে সাথে বিভন্ন রকম হবে। তার জীবন বৃত্তান্ত সরাসরি, তার প্রথাগত আচরণের ছবি এবং বিশ্বাস সেখানে থাকবে। তার শিল্প সম্মত কাজ যা ব্যক্তিগত এবং সামাজিক প্রয়োজন অনুযায়ী এবং শারীরিক এবং অথনৈতিক অবস্থায় কাঠামোবদ্ধ হয় তা আমরা তার পুরো জীবন থেকে জানতে পারি। একজন দক্ষ শিল্পীর জীবনী থেকে আমরা তার সৃষ্টি সম্পর্কে বিশ্লেষণ এবং এই বস্ত্ত দ্বারা কী ধরনের ব্যক্তিত্বের এবং কার্যাবলির প্রকাশ পেয়েছে তা বোঝা যায়। মৌখিক এবং অন্যান্য ধরনের প্রমাণ দ্বারা আমরা শিল্পীর দক্ষতার একটি বড় চিত্র পাই। বাণিজ্যিকরণ এবং মানসম্মতের বাইরে মানুষ এখনও প্রথা চায়। তারা এখনও হস্তশিল্পের পূজা করে। প্রথাই হলো এই শিল্পীদের কাজের প্রতিবিম্ব যারা প্রথার ব্যবহার এবং নন্দনতাত্ত্বিক বিষয় বোঝার মাধ্যমে জীবনের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখে।  [ফিরোজ মাহমুদ]

আরও দেখুন বাঙালি সংস্কৃতি