সংবাদ সংস্থা


সংবাদ সংস্থা  সংবাদ সংগ্রহ করে সংবাদপত্র, সাময়িকী ও ইলেট্রনিক্স সম্প্রচার কেন্দ্রগুলির মধ্যে বণ্টন করার প্রতিষ্ঠান। এদেশের সংবাদ সংস্থাগুলির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের আগেই।

দ্য রয়টার টেলিগ্রাম কোম্পানি সংক্ষেপে রয়টার পৃথিবীর প্রাচীন সংবাদ সংস্থাগুলির অন্যতম। ব্রিটিশ-ভারতেও তাদের শাখা ছিল। দি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তান (এপিপি) পাকিস্তানের প্রথম সংবাদ সংস্থা, ১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয়, করাচিতে প্রধান অফিস এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের, ঢাকা ও চট্টগ্রামে এর শাখা ছিল। একই বছরে, ব্যক্তিমালিকানাধীন সংবাদ সংস্থা ইউনাইটেড প্রেস অব পাকিস্তান (ইউপিপি) কার্যক্রম শুরু করে করাচি থেকে। ঢাকায় এ সংস্থার একটি শাখা ছিল। আরেকটি ব্যক্তি মালিকানাধীন সংবাদ সংস্থা পাকিস্তান প্রেস এজেন্সি নামে (পিপিএ) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে এটি পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনাল (পিপিআই) নাম গ্রহণ করে। ১৯৫৬ সালের জুন থেকে চালু এ সংস্থার প্রধান অফিস ছিল করাচিতে এবং ঢাকায় ছিল এর শাখা অফিস। পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম স্থানীয় মালিকানাধীন স্বাধীন সংবাদ সংস্থা ছিল দি ইস্টার্ন নিউজ এজেন্সি (এনা)। ১৯৭০ সালে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে নয় মাস এ সংস্থার কার্যক্রম স্থগিত ছিল।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর এপিপি ও পিপিআই ব্যুরো পরিত্যক্ত ঘোষিত হয় এবং এপিপি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) নামে রূপান্তরিত হয়। পিপিআই প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ প্রেস ইন্টারন্যাশনাল (বিপিআই) নামে কার্যক্রম শুরু করে এবং শীঘ্রই বাসস-এর সঙ্গে একীভূত হয়। বর্তমানে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এমন প্রধান প্রধান সংস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে: ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি), আনন্দ বাংলা সংবাদ লিমিটেড (এবিএএস), বাংলাদেশ নিউজ সার্ভিস (বিএনএস), নিউজ মিডিয়া, নিউজ নেটওয়ার্ক, প্রোব নিউজ এজেন্সি, প্রেস নেটওয়ার্ক, সাউথ এশিয়ান নিউজ এজেন্সি (এসএএনএ) এবং চট্টগ্রাম ভিত্তিক বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ)। বর্তমানে বাংলাদেশের বেশির ভাগ নিউজ এজেন্সিগুলি অনলাইন ভিত্তিক। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার মধ্যে রয়টার, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এবং এজেন্সি ফ্রান্স প্রেস (এএফপি)-এর ঢাকা ব্যুরো অফিস রয়েছে। পাশাপাশি অনেকগুলি জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা, যেমন প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই), আইআরএনএ, আইআইএনএ, আনতারা এবং জিনহুয়া-র প্রতিনিধি রয়েছে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)  ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে এক সরকারি আদেশবলে জাতীয় সংবাদ সংস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়। প্রায় যন্ত্রসরঞ্জামহীন অবস্থায় প্রাক্তন এপিপি-র অল্পসংখ্যক কর্মকর্তা নিয়ে এই সংস্থা কার্যক্রম শুরু করে। দেশ তখন বহির্বিশ্ব থেকে ছিল বিচ্ছিন্ন, কিন্তু শীঘ্রই ইন্ডিয়ার পিটিআই-এর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে সংস্থাটি সংবাদ সংগ্রহ শুরু করে এবং পরপরই ইউপিআই, এএফপি ও রয়টারের সংস্থাগুলির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী তার যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়। সংশি­ষ্ট ঘটনাক্রম ও জাতীয় সংবাদ সহজলভ্য করা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলির সার্ভিসের সহজপ্রাপ্যতা ও দেশের সংবাদ সংস্থাগুলির সার্ভিসের জন্য ১৯৭৯ সালে বাসস অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এ সংস্থাকে জাতীয় সংবাদ সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা দেওয়া হয়।

চট্টগ্রামে একটি নিউজ ব্যুরো, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট এবং নয়াদিলি­তে (ইন্ডিয়া) সংবাদদাতা এবং জেলা সদরগুলিতে সংযোগ রক্ষা করে ঢাকার প্রধান অফিসের মাধ্যমে বাসস সংবাদ সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনা করে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংবাদ সংস্থাগুলির সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সংস্থাটি বৈদেশিক সংবাদ সংগ্রহ করে। অনেকদিন আগেই এই সংস্থা রয়টার্স, এএফপি, ইউপিআই, পিটিআই, এপিপি, চীনের জিনহুয়া, নেপালের আরএসএস, মালয়েশিয়ার Bernama, ইন্দোনেশিয়ার আনতারা, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের এপিএন, তৎকালীন জিডিআর-এর এডিএন, কিউবার Prensa Latina, ইরাকের আইএনএ, জাপানের কিয়োদো, রোমানিয়ার AGER PRESS, ইরানের ইরনা, ননএলায়েনড নিউজ পুল, অরগানাইজেশন অব এশিয়া প্যাসিফিক নিউজ এজেন্সিজ (ওএএনএ), ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক নিউজ এজেন্সির (আইআইএনএ) সঙ্গে বিনিময় চুক্তি সম্পাদন করেছে এবং ফ্রান্সের এএফপি ও অন্যান্য বৈদেশিক সংবাদ সংস্থার সঙ্গে সংবাদচিত্র বিনিময়ের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। বাসস সরকারের কার্যাবলি, কূটনৈতিক বিষয়, সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনাবলি, অর্থনীতি, অর্থসংস্থান, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, আইন ও সংসদীয় বিষয়াবলি সর্ম্পকিত সংবাদসমূহ সারাদেশের সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশন এবং চাঁদা প্রদানকারী সরকারি সংস্থাগুলিকে পরিবেশনের মাধ্যমে জাতীয় সংবাদ কার্যক্রম পরিচালনা করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রামান ও পণ্যের মূল্যহারসহ বাণিজ্যিক সংবাদ পরিবেশনের জন্য ব্যাংকসমূহ ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলি বাসসকে চাঁদা প্রদান করে। এ সংস্থা ফিচার সার্ভিস চালু করেছে, সম্প্রতি কম্পিউটার মাধ্যম ব্যবহূত হচ্ছে এবং ১৯৮৮ থেকে বাংলা সার্ভিস শুরু করেছে। সংস্থাটি তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত, একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক-কাম-প্রধান সম্পাদক কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং একজন সভাপতিসহ পরিচালকদের একটি বোর্ড এর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা তত্ত্বাবধান করে। চাঁদাদাতাদের চাঁদা এ সংস্থার আয়ের উৎস এবং এটি সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল।

ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি)  ১৯৮৮ সালে সংবাদ সংস্থাটি কার্যক্রম শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) হচ্ছে এর প্রিন্সিপল সংস্থা। এটি নিজেকে সরকারি প্রভাবমুক্ত স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গির সংস্থা হিসেবে দাবি করে। বাংলাদেশের প্রথম কম্পিউটার ব্যবস্থিত এই সংবাদ সংস্থার নীতি নির্ধারণ ও সমস্ত কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করে একটি পরিচালক পরিষদ।

ইউএনবি সারাদেশের ছড়ানো সংবাদদাতাদের কাছ থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে এবং এর আন্তর্জাতিক অংশীদাররাও সংবাদ প্রেরণ করে। মূল অংশীদার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সঙ্গে যুক্তভাবে এই সংস্থা তার গ্রাহকদের বিস্তৃত ক্ষেত্রের তথ্য উপাত্ত এবং সংবাদ সরবরাহ করে। সংবাদ সরবরাহ ছাড়া তারা বিভিন্ন তাৎপর্যপূর্ণ ইস্যু ও সমস্যা, নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ, বিশেষ প্রতিবেদন ও ফিচার সার্ভিস দেয়। এছাড়াও এএফপি ও রয়টারর্স-এর সংবাদচিত্র স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সংগ্রহ করে সংস্থাটি নিজ গ্রাহকদেরকে সরবরাহ করে।

ইউএনবি-র গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে সংবাদপত্র ও সাময়িকী, রেডিও, টেলিভিশন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাসমূহ। এপির সঙ্গে স্বতন্ত্র সম্পর্ক ছাড়াও এই সংস্থা চেক নিউজ এজেন্সি এবং Anadolu (তুরস্ক), রোমপ্রেস (রোমানিয়া), এএনএসএ (ইতালি), রিয়া নভস্তি (রাশিয়া), Yonhap (কোরিয়া) এবং কিয়োদো (জাপান)সহ বিশ্বব্যাপী জাতীয় সংবাদ সংস্থাগুলির সঙ্গে সংবাদ বিনিময় চুক্তি করেছে। সংস্থাটি অর্গানাইজেশন অব এশিয়া-প্যাসিফিক নিউজ এজেন্সিস (ওএএনএ), কমনওয়েলথ প্রেস ইউনিয়ন (সিপিইউ), এএমআইসি এবং এশিয়া নেট-এর সদস্য।

ইস্টার্ন নিউজ এজেন্সি (এনা)  বাংলাদেশে প্রথম ব্যক্তি মালিকানাধীন সংবাদ সংস্থা, ১৯৭০ সালের মার্চ মাসে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই এটি পুরোদস্ত্তর সংবাদ সংস্থায় পরিণত হয়। এই সংস্থা ঘটনাবহুল বছর ১৯৭০-৭১ সালের সংবাদ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে জননন্দিত হয়। পরিণতিতে, পাকিস্তানের সামরিক জান্তার কোপানলে পড়ে সংস্থাটি বন্ধ হয়ে যায়। এই সংস্থার কার্যক্রম একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়েই স্থগিত ছিল। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর ১৯৭১ সালে এনা আবার কার্যক্রম শুরু করে। একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বা বিখ্যাত ব্যবসায়ীকে সভাপতি করে ছয় জন পরিচালক সমন্বয়ে এনা পরিচালিত হতো। প্রধান নির্বাহী হিসেবে থাকতেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক, তিনিই সংস্থার প্রধান সম্পাদক। তিনি দশ বছরের জন্য এই পদে নির্বাচিত হতেন এবং পরবর্তী স্থায়িত্বকালের জন্য পুনর্নির্বাচন ছিল যোগ্যতার ভিত্তিতে মনোনয়ন সাপেক্ষ। ৫১ শতাংশ শেয়ার ছিল উদ্যোক্তাদের, বাকি শেয়ার জনসাধারণ, বিশেষত ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জন্য উন্মুক্ত ছিল। এই সংস্থার প্রধান কার্যালয় ঢাকায়; দেশের কতগুলি জেলা শহরে এবং লন্ডন, নিউইয়র্ক, আবুধাবি ও নয়াদিল্লীতে এর প্রতিনিধি ছিল। ছয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা তাস, এপি, ইউএনআই, কুনা, জিনহুয়া এবং এএনএসএ-এর সঙ্গে এনার সংবাদ-বিনিময় চুক্তি ছিল। এনা সংবাদ প্রেরণের জন্য পুরোপুরি সরকারি টেলিকম্যুনিকেশন সিস্টেমের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের জন্য দুই দশকের পর এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে এনা শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলা সংবাদপত্র সরবারহ করে। বাংলাদেশে আরও কিছু নিউজ এজেন্সি রয়েছে যারা অনলাইনে নিউজ প্রদান করে। অনলাইন ভিত্তিক দেশে প্রধান নিউজ সংস্থা হলো Bdnews24.com। ঢাকা ও চট্টগ্রামে কয়েকটি নিউজ এজেন্সি রয়েছে যারা বিচিত্র ধরনের খবর পরিবেশন করে থাকে। [হেলাল উদ্দিন আহমেদ]