ষাটগম্বুজ মসজিদ


ষাটগম্বুজ মসজিদ  বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদগুলির মধ্যে বৃহত্তম এবং সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম চিত্তাকর্ষক নিদর্শন। খান আল-আজম উলুগ খান জাহান, যিনি দক্ষিণ বাংলার এক বৃহৎ অংশ জয় করে তৎকালীন সুলতান নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহের (১৪৩৫-৫৯) সম্মানে বিজিত অঞ্চলের নামকরণ করেন  খলিফাতাবাদ। তিনিই সম্ভবত ষাটগম্বজ মসজিদের নির্মাতা। ১৪৫৯ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত  খান জাহান হাভেলি-খলিফাতাবাদ থেকে উক্ত অঞ্চল শাসন করেন। তাঁর শাসনকৃত অঞ্চলটিকে বর্তমান বাগেরহাটের সাথে অভিন্ন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। সময়ের ব্যবধানে এরূপ অসাধারণ একটি ভবন ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকার এর সংস্কার ও মেরামতের উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং পরবর্তীসময়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ধারাবাহিকভাবে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। বিশ শতকের আশির দশকের শুরুতে ইউনেসকো-র (UNESCO) উদ্যোগে এই ঐতিহাসিক পুরাকীর্তিটির রক্ষণাবেক্ষণে এক কার্যকরী ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এবং তা বর্তমানে শেষের পর্যায়ে।

ভূমি নকশা ও বর্ণনা  প্রাচীর বেষ্টিত মসজিদটি বর্তমান বাগেরহাট শহর থেকে তিন মাইল পশ্চিমে ঘোড়াদিঘির পূর্ব পাড়ে অবস্থিত। প্রাচীরবেষ্টিত মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশের জন্য আদিতে দুটি প্রবেশপথ ছিল- একটি পূর্বদিকে এবং অন্যটি উত্তর দিকে। পূর্ব দিকের প্রবেশপথটি বর্তমানে পুনঃনির্মাণ করা হলেও উত্তর দিকেরটি বর্তমানে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পূর্ব দিকের প্রবেশপথটি, যা নিজেই একটি স্বতন্ত্র ভবনের দাবিদার, মসজিদের কেন্দ্রীয় খিলানপথ বরাবর স্থাপিত। খিলান সম্বলিত প্রবেশপথটি ৭.৯২ মিটার দীর্ঘ ও ২.৪৪ মিটার চওড়া। এটি ২.৪৪ মিটার পুরু এবং এর উপরিভাগ সুদৃশ্যভাবে বাঁকানো।

ভূমি নকশা,ষাটগম্বুজ মসজিদ

বিশাল আয়তাকার মসজিদ ভবনটি মূলত ইট নির্মিত। বাইরের দিক থেকে এর পরিমাপ চার কোণে অবস্থিত দ্বিতল টাওয়ারসহ উত্তর-দক্ষিণে ৪৮.৭৭ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৩২.৯২ মিটার। মসজিদ অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য রয়েছে খিলানপথ। পূর্ব প্রাচীরে এগারোটি, উত্তর এবং দক্ষিণ প্রাচীরে সাতটি করে। পশ্চিম প্রাচীরে একটি খিলানপথ রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেভ-এর ঠিক উত্তর পার্শ্বস্থ ‘বে’ বরাবর পশ্চিম প্রাচীরের খিলানপথটি অবস্থিত। মসজিদ অভ্যন্তরের পরিমাপ ৪৩.৮৯ মিটার × ২৬.৮২ মিটার। মসজিদ অভ্যন্তর ছয় সারি স্তম্ভ সহকারে উত্তর-দক্ষিণে সাতটি আইল এবং পূর্ব-পশ্চিমে এগারোটি ‘বে’তে বিভক্ত।

কেন্দ্রীয় বে-এর ঠিক উত্তর পাশেরটি ব্যতীত সব কয়টি ‘বে’ কিবলা প্রাচীরে অর্ধ গোলাকার মিহরাব কুলুঙ্গিতে শেষ হয়েছে। ফলে মসজিদটিতে রয়েছে মোট দশটি মিহরাব। কেন্দ্রীয় নেভ (nsve) বরাবর অবস্থিত কেন্দ্রীয় মিহরাবটি পার্শ্ববর্তী মিহরাবগুলি অপেক্ষা বড় এবং ছাদ পর্যন্ত উঁচু একটি অভিক্ষিপ্ত আয়তাকার কাঠামোর মধ্যে ন্যস্ত।

মসজিদের প্রবেশপথের খিলানগুলি দ্বিকেন্দ্রিক ধরনের এবং প্রাচীরের মাঝামাঝি থেকে উত্থিত। পূর্ব ফাসাদের সব কয়টি খিলানপথ এবং উত্তর ও দক্ষিণের কেন্দ্রীয় এবং পশ্চিমের একমাত্র খিলানপথ সামান্য কুলুঙ্গিত আয়তাকার কাঠামোর মধ্যে ন্যস্ত। বাকি খিলানপথগুলি পরপর দুটি খিলান সমন্বয়ে তৈরি, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ খিলানটি বাইরেরটির তুলনায় সামান্য বড়। পূর্ব দিকের দেয়াল ব্যতীত সমগ্র ভবনের বহিস্থ দেয়াল জুড়ে অনুভূমিক অভিক্ষেপ ও দ্বৈত কুলুঙ্গি নকশার অলঙ্করণ রয়েছে। ভবনের সরছিদ্র (battlements) ও কার্নিস বাঁকানো। তবে স্বাভাবিক বক্ররেখা দ্বারা বেষ্টিত না হয়ে পূর্ব ফাসাদের কেন্দ্রীয় খিলানপথের উপরের কার্নিসে একটি বিচিত্র ত্রিভুজাকার পেডিমেন্ট স্থাপিত। এ ধরনের বৈশিষ্ট্যের পুনরাবৃত্তি দেখা যায় কিশোরগঞ্জের  এগারোসিন্ধুর-এর  সাদী মসজিদ-এ (১৬৫২)।

ষাটগম্বুজ মসজিদ, বাগেরহাট

মসজিদের চার বহিঃস্থ কোণে স্থাপিত গোলাকার টাওয়ার বিশালাকৃতির এবং উপরের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে গেছে। প্রত্যেকটি টাওয়ারই ছাদ ছাড়িয়ে উপরে উঠে গেছে। এগুলি খোলা খিলান চেম্বার বিশিষ্ট ও ছোট গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। সম্মুখ ভাগের টাওয়ার দুটির উপরের চেম্বার চার দিকে স্থাপিত চারটি খিলান জানালা বিশিষ্ট। আর পেছনের টাওয়ার দুটিতে রয়েছে একজোড়া খিলান জানালা, একটি উত্তর দিকে অন্যটি দক্ষিণ দিকে। পিছনের দিকের টাওয়ার দুটির জানালাগুলি ঠিক একই অক্ষরেখায় অবস্থিত নয়। সম্মুখ ভাগের টাওয়ার দুটিতে ভেতরের দিক দিয়ে ২৬ ধাপের প্যাঁচানো সিড়ি রয়েছে। এই সিড়ির মাধ্যমে উপরের চেম্বারে উঠা যায়। সিড়ির প্রবেশপথ রয়েছে মসজিদের ভেতরের দিকে। সম্প্রতি এই প্রবেশপথগুলি ইটের প্রাচীর দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পেছনের টাওয়ার দুটি সামনের টাওয়ার দুটির মতো নয়। পেছনের টাওয়ার দুটি নিচ্ছিদ্র এবং এগুলির চেম্বারে শুধু উপরের ছাদ দিয়েই প্রবেশ করা যায়।

পূর্ব থেকে পশ্চিম দৈর্ঘ্য বরাবর প্রসারিত বিশাল কেন্দ্রীয় নেভ মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। ৪.৮৮ মিটার × ৩.৯৬ মিটার আয়তাকার স্বতন্ত্র সাতটি ‘বে’ সম্বলিত এই নেভ মসজিদ অভ্যন্তরকে সমান দুটি অংশে বিভক্ত করেছে। উত্তর ও দক্ষিণ দিকের খিলানপথ দিয়ে এই অংশগুলিতে প্রবেশ করা যায়। এই অংশ দুটি আবার সর্বমোট সত্তরটি বর্গাকার ‘বে’ দ্বারা বিভক্ত। এই বর্গাকার ‘বে’গুলি ৩.৯৬ মিটার বাহু বিশিষ্ট এবং উপরে পেয়ালাকৃতির গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নেভের আয়তাকার ‘বে’গুলি চৌচালা ভল্ট দ্বারা আচ্ছাদিত। এই ভল্ট ও পেয়ালাকৃতির গম্বুজসমূহ পরষ্পর ছেদী খিলানের উপর স্থাপিত। খিলানগুলি মসজিদ অভ্যন্তরের স্তম্ভ থেকে উত্থিত। আর খিলানের কোণগুলি ভরাট করা হয়েছে বাংলা পেন্ডেন্টিভ দ্বারা। ফলে মসজিদটি সর্বমোট একাশিটি গম্বুজ সমৃদ্ধ- চারটি কর্ণার টাওয়ারের উপর, সত্তরটি পাশের দুই অংশের উপর এবং সাতটি চৌচালা ভল্ট কেন্দ্রীয় নেভের উপর।

অসংখ্য গম্বুজ সমৃদ্ধ মসজিদের বিশাল ছাদটির ভারবহন করছে মসজিদ অভ্যন্তরীস্থ স্তম্ভসারি। মসজিদে উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত ছয়টি স্তম্ভসারি বিদ্যমান। প্রতিটি সারিতে রয়েছে দশটি করে স্তম্ভ। সুতরাং মসজিদটিতে সর্বমোট ষাটটি স্তম্ভ রয়েছে যার বেশিরভাগই সরু প্রস্তর নির্মিত। তবে এর মধ্যে ছয়টি বিশালাকার। স্তম্ভগুলি হয় ইট, নতুবা পাথরের ব্লক দ্বারা বেষ্টিত। দেখে মনে হয় প্রথম থেকেই এগুলি এরকম। সবগুলি প্রস্তর স্তম্ভই দুই অথবা তিনটি পাথরের ব্লক একটির উপর আরেকটি স্থাপন করে প্লাগ-হোল পদ্ধতিতে এবং লোহার দন্ড প্রবিষ্ট করে নির্মিত। সরু প্রস্তর স্তম্ভগুলির স্তম্ভ শীর্ষ (capitals) ও ভিত্তি (pedestals) বর্গাকার এবং এদের মধ্যবর্তী অংশ অষ্টভুজাকার। সম্প্রতি ইটের একটি বাড়তি স্তর তৈরি করে এগুলিকে আদি রূপে সংস্কার করা হয়েছে।

জে ওয়েস্টল্যান্ডের (১৮৭৪) মতানুযায়ী মসজিদ অভ্যন্তরে ইট নির্মিত দুটি অনুচ্চ প্লাটফর্ম ছিল। একটি কেন্দ্রীয় মিহরাবের নিকটবর্তী এবং অন্যটি কেন্দ্রীয় নেভের উত্তর পার্শ্বস্থ ‘বে’র সর্ব পূর্ব প্রান্তে। তবে বর্তমানে এদুটি প্লাটফর্ম অনুপস্থিত। প্লাটফর্ম দুটি যদি আদি নকশায় থেকে থাকে তাহলে নিশ্চই এর সুনির্দিষ্ট কোন ব্যবহার ছিল। এর ব্যবহার সম্পর্কে পরে ব্যাখ্যা দেওয়া হবে।

অলঙ্করণ  মসজিদের অলঙ্করণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পোড়ামাটির ফলক ও ইট সংযোগে সাধিত হয়েছে। তবে হালকা রিলিফের খোদাইকৃত বিরল প্রস্তর অলঙ্করণও এতে রয়েছে। কালপরিক্রমায় যদিও এই অলঙ্করণের বহু অংশই হারিয়ে গেছে, তথাপি খিলানপথ, মিহরাব, গম্বুজের নিচে খিলানগুলির সংযোগস্থল, চৌচালা ভল্টের অভ্যন্তরভাগ, কর্নার টাওয়ারের উত্থিত বন্ধনী, মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশপথের কার্নিস ও মসজিদের কার্নিসে এসবের বেশ কিছু এখনও অক্ষত অবস্থায় বিদ্যমান। সমস্ত মসজিদ ভবনের কার্নিস, অভিক্ষিপ্ত উত্থিত বন্ধনী এবং কর্নার টাওয়ারের কার্নিস লজেন্স নকশা দ্বারা সজ্জিত। ঈষৎ কুলুঙ্গিত আয়তাকার কাঠামোর ভেতর ন্যস্ত খিলানপথের উপরের অংশ অলঙ্কৃত ইট দ্বারা সজ্জিত। খিলানপথের স্প্যান্ড্রেল ও অন্যান্য অংশ অভ্যন্তর ও বহিস্থ উভয় দিকেই বিভিন্ন নকশায় অলঙ্কৃত। পূর্ব ফাসাদের কেন্দ্রীয় খিলানপথের স্প্যান্ড্রেলে এখনও সম্পূর্ণ প্রস্ফুটিত জোড়া গোলাপ বিদ্যমান এবং খিলানের কেন্দ্র বিন্দুতে একটি বৃহৎ অনুভূমিক লজেন্স স্থাপিত। যদিও এটি এখন সেখানে নেই, তথাপি মনে হয় মসজিদ অভ্যন্তরে এখনও যে কয়টি বিদ্যমান, ঠিক সে রকম ভাবেই এটি খিলানপথে সংযোজিত ছিল।

খিলানপথের উপরে সামান্য অভিক্ষিপ্ত তিনটি অনুভূমিক বন্ধনী রয়েছে। এগুলির নিচেরটিতে রয়েছে ঝুলানো ফুল নকশা, মাঝেরটি লজেন্স ও ছোট গোলাপ নকশার মিশ্রিত নকশায় শোভিত এবং সর্ব উপরেরটিতে রয়েছে চারপত্র ফুলের অলঙ্করণ। এই বন্ধনীগুলির মাঝে ফাঁকা স্থানটিতে রয়েছে সামান্য ভেতরের দিকে ঢোকানো সংকীর্ণ প্যানেল। উপরের প্যানেলটি শিকলের (loop) মাঝে পদ্মফুল সমৃদ্ধ লতাপাতা নকশায় অলঙ্কৃত। অন্য প্যানেলটিতে রয়েছে ত্রি-খাঁজ খিলান কুলুঙ্গি নকশা। এগুলিও আবার তালগাছ সদৃশ ডিজাইন, কেন্দ্রস্থলে ক্ষুদ্রাকার গোলাপসহ পরষ্পর সংযুক্ত বর্গাকার নকশা এবং ফুলসহ পত্রযুক্ত গাছ নকশায় অলঙ্কৃত। একটি চমৎকার ত্রিভুজাকার পেডিমেন্ট সমস্ত কম্পোজিশনের শিরোমণি হিসেবে বিদ্যমান। যদিও বর্তমানে এর অলঙ্করণ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে। বাকি খিলানপথগুলি কম-বেশি একই রকম পোড়ামাটির নকশায় সজ্জিত ছিল। অভ্যন্তরভাগে খিলানের স্প্যান্ড্রেল ও খিলানপথের উপরের অংশ বেশিরভাগই পোড়ামাটির অলঙ্করণে সজ্জিত ছিল। প্রতিটি প্রবেশপথেই এই নকশা ভিন্ন ভিন্ন ধরনের।

ষাটগম্বুজ মসজিদ, অভ্যন্তর ভাগ

কিবলা প্রাচীর খাঁজ বিশিষ্ট অলঙ্কৃত দশটি খিলান মিহরাব দ্বারা সুশোভিত। ধূসর বেলেপাথরে নির্মিত কেন্দ্রীয় মিহরাবটি মুসলিম রীতির অগভীর ও নিচু রিলিফের খোদাইকর্মে অলঙ্কৃত, যা পার্শ্ববর্তী মিহরাব ও খান জাহানের সময়ে নির্মিত অন্যান্য ভবনের খোদাইকর্ম থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বেশিরভাগ অলঙ্কৃত মোটিফই নষ্ট হয়ে গেছে। এখনও কিছু টিকে আছে, তবে বেশ ক্ষতিগ্রস্থ অবস্থায়। বহুখাঁজ বিশিষ্ট বিশাল মিহরাব খিলানটি পলকাটা (faceted) অলঙ্কৃত দেয়াল সন্নিহিত প্রস্তর স্তম্ভ (pilaster) থেকে উত্থিত। খিলানের স্প্যান্ড্রেলে এখনও ফুলদানি থেকে উৎসারিত বৃক্ষ মোটিফ দৃশ্যমান। বৃক্ষ মোটিফটি তার শাখা ও ফুলসহ আরও বেশি বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। খিলান শীর্ষের ঠিক উপরে লজেন্স ও গোলাপ নকশার সারি-অলঙ্কৃত একটি অনুভূমিক বন্ধনী রয়েছে। অর্ধ-বৃত্তাকার মিহরাব কুলুঙ্গিটি লজেন্স ও গোলাপের ফ্রিজ নকশায় সজ্জিত সামান্য উত্থিত বন্ধনী দ্বারা দ্বিধা বিভক্ত। মিহরাব কুলুঙ্গির অর্ধ-গম্বুজাকার উপরের অংশ গোলাপ, জালি নকশা ও পদ্মপাপড়ি নকশা দ্বারা অলঙ্কৃত। কুলুঙ্গির অর্ধ-বৃত্তাকার নিচের অংশ আয়তাকার প্যানেল সম্বলিত অনুভূমিক দু-সারি খোদাইকর্ম সমৃদ্ধ। প্রত্যেক সারিতে নয়টি করে প্যানেল রয়েছে। প্রত্যেকটি প্যানেল মাঝের সূক্ষ্ম বন্ধনী দ্বারা পৃথকীকৃত। প্যানেলগুলিতে কেন্দ্রের গোলাপসহ বহুখাঁজ বিশিষ্ট খিলান নকশা রয়েছে। সেই সাথে আরও সংযুক্ত হয়েছে স্প্যান্ড্রেলের গোলাপের মতো ক্ষুদ্রাকৃতির বৃক্ষ মোটিফের প্যাঁচানো নকশা। মিহরাব কুলুঙ্গির মাঝখানের বন্ধনীটির ঠিক মাঝ বরাবর একটি ঝোলানো শিকল খোদিত, যা সমাপ্ত হয়েছে নিচের একটি আয়তাকার পেন্ডেন্টে গিয়ে। পেন্ডেন্টেটিতে বহুখাঁজ খিলান খোদিত। এর কেন্দ্রে ও স্প্যান্ড্রেলে গোলাপ নকশা রয়েছে। মিহরাবটি বিভিন্ন নকশা সম্বলিত একটি আয়তাকার ফ্রেমের মাঝে স্থাপিত। তবে আয়তাকার ফ্রেমের নকশাগুলি বর্তমানে অত্যন্ত জীর্ণ অবস্থায় বিদ্যমান। এই আয়তাকার ফ্রেমের ওপরে পদ্মপাপড়ি, লজেন্স ও গোলাপের ফ্রিজ নকশা সম্বলিত প্রকটভাবে অভিক্ষিপ্ত একজোড়া বন্ধনী (mouldings) রয়েছে। সমস্ত কম্পোজিশনটি এর মাঝ বরাবর খোদাই করে বসানো কালো বর্গাকার প্রস্তর প্যানেল দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হয়ে উঠেছে। প্যানেলটির কেন্দ্রে রয়েছে স্তরীকৃত বিশাল গোলাপ এবং একে ঘিরে আরও সাতটি গোলাপ খোদিত।

সম্পূর্ণ ইট নির্মিত বাকি নয়টি মিহরাবের সম্মুখভাগ খাঁজকাটা। যদিও তাদের বেশিরভাগ অলঙ্করণ বর্তমানে বিলীন, তবু এখনও যা কিছু টিকে আছে তাতে এটি প্রতীয়মান যে, আদিতে এগুলি চমৎকারভাবে পোড়ামাটি দ্বারা অলঙ্কৃত ছিল। তবে এই অলঙ্করণ কেন্দ্রীয় মিহরাবের মতো ছিল না। মোটিফ ও নকশা প্রাথমিকভাবে একই রকম হলেও মিহরাব থেকে মিহরাবে পার্থক্য সূচিত হয়েছে এদের ব্যবহারের অবস্থানগত দিক থেকে।

উত্তর ও দক্ষিণ দেয়াল অভ্যন্তরে নির্মিত খাঁজকাটা খিলান কুলুঙ্গি বৈশিষ্ট্য সূচক। প্রতিটি দেয়ালে বারোটি করে খিলান কুলুঙ্গি রয়েছে। প্রতিটি কুলুঙ্গির শীর্ষে এক জোড়া বন্ধনী রয়েছে। বন্ধনীগুলি গোলাপ ও বুটিদার মোটিফ অলঙ্কৃত। বন্ধনীদ্বয়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পোড়ামাটির প্যাঁচানো ফুলেল নকশা দ্বারা পূর্ণ।

কেন্দ্রীয় নেভের উপর স্থাপিত সাতটি চৌচালা ভল্টের অভ্যন্তরভাগ ঢালু ছাদ বরগা (rafters) ও অনুভূমিক সরু ইট নির্মিত বন্ধনীর পরষ্পর ছেদী নকশায় গঠিত নিপুণ প্যাটার্ন দ্বারা অলঙ্কৃত। এটি বাংলার জনপ্রিয় চৌচালা কুড়েঘরের বাঁশের ছাদ-কাঠামোর অবিকল উপস্থাপনা। ঢালু ছাদ-বরগা ও অনুভূমিক ইট-বন্ধনীগুলির ছেদবিন্দুতে পোড়ামাটি নির্মিত পদ্মফুলের নকশা ফ্রেমটিকে আরও বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করে তুলেছে। অনুভূমিক সারিতে যথাক্রমে কোণা ও পার্শ্ব দিক দিয়ে সজ্জিত ইটের বন্ধনীগুলি উপরের গম্বুজের ভারবহনকারী পেন্ডেন্টিভ হিসেবে কাজ করছে। স্বতন্ত্র এই বৈশিষ্ট্যটি উঁচু রিলিফের এক অপরূপ খোদাইকর্ম হিসেবে প্রতীয়মান। এই পদ্ধতিটি নির্মাণ প্রকৌশল ও অলঙ্করণ হিসেবে সমগ্র সুলতানি যুগ ধরে ব্যাপক হারে ব্যবহূত হয় এবং এমনকি মুগল আমলেও কিছু কিছু ভবনে এর ব্যবহার দেখা যায়।

পর্যবেক্ষণ  বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদটি খান জাহানের সর্বপ্রথম ও সর্বোৎকৃষ্ট স্থাপত্যিক নিদর্শন হিসেবে বিদ্যমান। বাইরের দিক থেকে বিশাল কর্ণার টাওয়ার ও সাতাত্তরটি গম্বুজসহ মসজিদটি যেমন দৃষ্টিনন্দন ভেতরের দিক থেকে তেমনিই ব্যাপক। স্থাপত্যিক দিক থেকে মসজিদটি বাংলায় ইতোমধ্যে শুরু হওয়া ভবন নির্মাণ রীতি অব্যাহত রাখে এবং স্থানীয় ও বাইরে থেকে নেওয়া নতুন কিছু বৈশিষ্ট্যের বিকাশে অবদান রাখে। প্রতিরক্ষা বুরুজের (bastion) আদলে নির্মিত উপরের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে যাওয়া কর্ণার টাওয়ারের গোলাকার ক্ষুদ্র গম্বুজ (cupola) ও ছাদ ছাড়িয়ে বেশ উপরে উঠে যাওয়া দ্বিতল রূপ সম্ভবত তুগলক রীতির খিরকি (আনু. ১৩৭৫) ও দিল্লির কালান মসজিদের (১৩৮০) প্রভাবে গড়ে উঠেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কর্ণার টাওয়ারের গোলাকার বৈশিষ্ট্য খলিফাতাবাদের খান জাহানী রীতির অন্যান্য ভবন থেকে ভিন্ন।

কেন্দ্রীয় বিশাল নেভ এবং সেই সাথে পার্শ্ববর্তী সংলগ্ন কাঠামোর অভ্যন্তর ভূমিনকশা বাংলায় প্রথম দেখা যায় আদিনা মসজিদ এ (১৩৭৫)। এই রীতিটিও সম্ভবত দামেস্কের জামে মসজিদের (৭০৫-১৫) অনুকরণে নির্মিত অন্যান্য প্রাচীন মসজিদ থেকে গৃহীত হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেভের উপর স্থাপিত চৌচালা ভল্ট রীতিটি সম্ভবত বাংলার চৌচালা কুড়েঘর রীতি থেকে নেওয়া হয়েছে। যদিও বাংলার স্থাপত্যে তখন পর্যন্ত এই রীতি ছিল অনুপস্থিত, কিন্তু পরবর্তীকালে ছোট সোনা মসজিদ (১৪৯৩-১৫১৯) ও গৌড়ের লট্টন মসজিদে (ষোল শতকের প্রথম দিকে) এ রীতি অনুসরণ করতে দেখা যায়।

পূর্ব ফাসাদের কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের উপর নির্মিত অপরূপ ত্রিভুজাকার পেডিমেন্টটিও সম্ভবত বাংলার দোচালা কুড়েঘরের ত্রিভুজাকার ছাদ পাশ (gable) থেকে নেওয়া। একইভাবে মসজিদের বহির্গাত্রের ভাসাভাসা কুলুঙ্গি নকশাও সম্ভবত বাংলার কুড়েঘরের কাঠ ও বেড়ার নকশার অনুকরণে করা হয়েছে।

এই মসজিদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো কেন্দ্রীয় মিহরাবের পাশে নির্মিত ক্ষুদ্র প্রবেশপথ। এটি উত্তর ভারতের কিছু মসজিদে দেখা যায়, তবে বাংলায় অপ্রচলিত। এই রীতিটি সম্ভবত আদি মুসলিম স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত মসজিদ থেকে ধার করা হয়েছে। আদি মুসলিম স্থাপত্যে মসজিদ পশ্চাতের এই প্রবেশপথটি ব্যবহূত হতো খলিফা, গভর্নর বা ইমাম কর্তৃক। তাই এটি খুব অপ্রাসঙ্গিক নয় যে, এই পথটি ব্যবহূত হতো খলিফাতাবাদের শাসক খান জাহান কর্তৃক, যার বাসস্থান মসজিদের উত্তর দিকে সামান্য দূরত্বেই অবস্থিত ছিল। উল্লিখিত ইট নির্মিত প্লাটফর্ম দুটির মধ্যে কেন্দ্রীয় মিহরাবের নিকটবর্তীটি সম্ভবত খান জাহান কর্তৃক প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের জন্য নির্মিত হয়েছিল। আর পূর্ব দিকের একটি প্রবেশপথের নিকটবর্তী স্থানে নির্মিত অপরটি জনগণ বা ছাত্রদের মাঝে ইসলাম সম্পর্কিত বাণী প্রচারের জন্য ধর্মীয় গুরু কর্তৃক ব্যবহূত হতো। তাই দেখা যাচ্ছে যে ষাটগম্বুজ মসজিদটি তিনটি কাজে ব্যবহূত হতো- উপাসনামূলক সমাবেশ হিসেবে, আদি মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত সংসদ ভবন হিসেবে এবং পারস্যের আর্দিস্তানের ইসপাহান জামি বা মসজিদ-ই-জামি মাদ্রাসা হিসেবে।

নামকরণ  আভিধানিকভাবে ‘ষাটগম্বুজ’ অর্থ হলো ষাটটি গম্বুজ সম্বলিত। তবে সাধারণভাবে মসজিদটিতে একাশিটি গম্বুজ পরিলক্ষিত হয়- মসজিদের ছাদে সাতাত্তরটি এবং বাকি চারটি চার কোণের কর্ণার টাওয়ারের উপর। এ ব্যাপারে দুটি ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে। কেন্দ্রীয় নেভের উপর স্থাপিত সাতটি চৌচালা ভল্ট মসজিদটিকে ‘সাতগম্বুজ’ মসজিদ হিসেবে পরিচিত করে, কিন্তু সময় পরিক্রমায় এই ‘সাতগম্বুজ’ই ‘ষাটগম্বুজ’ হিসেবে রূপান্তরিত হয়ে যায়। দ্বিতীয় ব্যাখ্যানুসারে, মসজিদের বিশাল গম্বুজ-ছাদের ভারবহনকারী মসজিদ অভ্যন্তরের ষাটটি স্তম্ভ সম্ভবত একে ‘ষাট খামবাজ’ (খামবাজ অর্থ স্তম্ভ) হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলে। এটি অসম্ভব নয় যে, এই ‘খামবাজ’ শব্দটিই পরবর্তীকালে বিকৃতরূপে ‘গম্বুজ’-এ পরিণত হয়ে মসজিদটিকে ষাটগম্বুজ হিসেবে জনপ্রিয় করে তুলেছে। শেষোক্ত ব্যাখ্যাটি সম্ভবত বেশি গ্রহণযোগ্য।  [এম.এ বারি]

গ্রন্থপঞ্জি  Archaeological Survey of India Annual Report, 1903-04, 1906-07, 1917-18, 1921-22, 1929-30, 1930-34; G Bysack, The Antiquities of Bagerhat, JASB, 36, Calcutta, 1867; J Westland, A Report on the District of Jessore, Calcutta, 1874;  List of Ancient Monuments in Bengal, Calcutta, 1896; AH Dani, Muslim Architecture in Bengal, Dhaka, 1961; G Michell (ed), The Islamic Heritage of Bengal, UNESCO, Paris, 1984.