শুঁটকি মাছ


শুঁটকি মাছ

শুঁটকি মাছ শুকিয়ে সংরক্ষণকৃত আহারযোগ্য মাছ। স্মরণাতীতকাল থেকে এ অঞ্চলে মাছ সংরক্ষণের জন্য শুঁটকি তৈরি হয়ে আসছে এবং এটি অনেক বাঙালির খাদ্য তালিকায় অন্যতম রসনারোচক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। মাছ শুকানোর মূলনীতি হলো পেশির উৎসেচক ও অণুজীবের কর্মকান্ড ন্যূনতম পর্যায়ে কমিয়ে আনার জন্য সনাতন পদ্ধতিতে রোদে মাছ থেকে পানি সরানো। বাংলাদেশের কতকগুলি নির্দিষ্ট সমুদ্রোপকূলীয় অঞ্চলে ও অভ্যন্তরীণ নিচু এলাকায় যেখানে আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা ও পরিবহণের সন্তোষজনক অবকাঠামোর অভাব রয়েছে সেখানেই মাছ শুকানো হয়। এগুলির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সুন্দরবনের দুবলারচর, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, রাঙাবালি, সোনাদিয়া দ্বীপ, মহেশখালি, কক্সবাজার, সুনামগঞ্জের ইব্রাহিমপুর, জামালগঞ্জের যশোমন্তপুর ইত্যাদি। মোহনা ও সমুদ্রে স্থায়িভাবে বসানো ব্যাগজালেই (বেহুন্দি) প্রধানত শুঁটকির জন্য মাছ ধরা পড়ে। জালে ধরা মাছ শুকানোর জায়গায় নেওয়ার পর ভাড়াটে মজুররা সেগুলি প্রজাতি অনুযায়ী বাছাই করে। সামুদ্রিক ও স্বাদুপানির শুঁটকিযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ মাছ ও চিংড়ির মধ্যে রয়েছে: লইট্যা (Harpodon neherius), ছুরি (Lepturacanthus savala), পুঁটি (Puntius sarana, P. stigma), চাপিলা (Gadusia chapra), লাখোয়া (Polynemus indicus), রূপচান্দা (Pampus chinensis) ও চিংড়ি (Metapenaeus ও Penaeus species)।

মাছের আকার ও প্রজাতির নিরিখে মাছ শুকাতে ২ থেকে ৮ দিন সময় লাগে। বাছাই করা মাছকে মাদুরের ওপর বিছিয়ে বা তাকে/রশিতে ঝুলিয়ে রাখা হয়। শুকানোর সময়, বিশেষত মেঘলা বা বৃষ্টির দিনে প্রায়শ বে­া-মাছি (Chrysomya species) ও এদের লার্ভা শুঁটকির ক্ষতি করে এবং বিটল (Necrobia species) ও মাইট (mite) গুদামে রাখা তৈরি শুঁটকির মারাত্মক আপদ। সংরক্ষণের অভাবে প্রতি বছর প্রচুর শুঁটকি মাছ কীটপতঙ্গ ও অণুজীবের আক্রমণে নষ্ট হয়। এ কারণে শুঁটকি ব্যবসায়ীরা অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহার করে। বিকিরণের সাহায্যে জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা থাকলে তা পরিবেশগত দূষণ হ্রাস করতে পারত।

বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের খাদ্য ও বিকিরণ জীববিদ্যা প্রতিষ্ঠানে সীমিত আকারে এ ধরনের খাদ্য সংরক্ষণের উপর গবেষণা চলছে।

২০০৬-০৭ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ কোটি ৩৪ লক্ষ টাকা মূল্যের ৭৭ মে টন শুঁটকি মাছ এবং ১২ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা মূল্যের ৪৪১ মে টন লবণে সংরক্ষিত ও চ্যাপা শুঁটকি বিদেশে রপ্তানি করা হয়। এ পণ্যের উৎপাদনের পরিমাণ আগের বছরগুলির তুলনায় যথেষ্ট কমে গেছে।

কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, সিলেট, কুমিল­া ও নারায়ণগঞ্জ জেলায় পচানো বা গাঁজানোর মাধ্যমে চ্যাপা শুঁটকি তৈরি করা হয়। তবে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর, লালপুর এবং নরসিংদীর মাধবদীতে সবচেয়ে বেশি হয়। ছোটজাতের পুঁটিমাছ থেকে এ ধরনের শুঁটকি তৈরি হয়। এই পদ্ধতিতে প্রথমে মাছের অাঁশ ফেলে, মাছের অন্ত্র ও তেল বের করে রেখে দিয়ে মাছগুলি ধুয়ে নিতে হয়। তারপর এই মাছ রৌদ্রে ১২-১৪ দিন শুকাতে হয়। ভাল করে শুকানো মাছ বস্তা বা প্যাকেটের ভিতর এক মাস রেখে দিতে হয়। ইতোমধ্যে রেখে দেওয়া মাছের তেল চুলায় জ্বাল দিয়ে মাটির পাত্র বা মটকার ভিতরের অংশে মাখিয়ে রৌদ্রে শুকাতে হয়। এরপর মাছগুলি ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। এর ৮-১০ ঘণ্টা পর মাছ নরম হলে মাটির বড় পাত্রে বা মটকায় চেপে ভরতে হয়। এভাবে চেপে ভরার কারণেই এর নাম হয়েছে চ্যাপা শুঁটকি। মটকাটি মাটির নিচে গর্তে বসিয়ে নিতে হয় অন্যথায় মটকা ভেঙে যাবার সম্ভাবনা থাকে। মাছ ভরা শেষে প্রয়োজনমতো (০.৫-১ কেজি) শুঁটকি গুঁড়া (চূর্ণ) করে ভিতরের মাছের উপর ছিটিয়ে মটকার মুখ চট বা পলিথিন দিয়ে বেঁধে মাটির প্রলেপ দিতে হয় যাতে বাতাস প্রবেশ করতে না পারে। এর ৩-৪ মাস পর এগুলি চ্যাপা শুঁটকিতে পরিণত হয়। এই শুঁটকি এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। বাজারে এই শুঁটকির দাম তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

[ননীগোপাল দাস ও মোঃ মুকবিল হোসেন]