শিক্ষাঙ্গন সহিংসতা


NasirkhanBot (আলোচনা) কর্তৃক ০৫:০২, ৫ মে ২০১৪ পর্যন্ত সংস্করণে (Added Ennglish article link)

(পরিবর্তন) ←পুর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ→ (পরিবর্তন)

শিক্ষাঙ্গন সহিংসতা  পাকিস্তান আমলে শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ ছিল এবং ১৯৭৩ সাল থেকে বিষয়টি জাতীয় উৎকণ্ঠায় পরিণত হয়। ব্রিটিশ আমলে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থনপুষ্ট ছাত্রসংগঠনের অস্তিত্ব এবং চরম সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সত্ত্বেও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া শিক্ষাঙ্গনে কোনো সহিংসতা ছিল না। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক তৎপরতায় ছাত্রসমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল শুধু রাজনৈতিক প্রশ্নে, এবং তা ছিল একদিকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ এবং অন্যদিকে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদী চেতনায় গড়ে ওঠা উপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলন। পাকিস্তান আমলে জাতীয়তাবাদী চেতনার স্থলে উদ্ভব ঘটে আঞ্চলিক চেতনার। এ সময়ে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সমর্থন জানায়।

সম্ভবত আইয়ুব খানের শাসনামল থেকেই শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের সূচনা হয়। ওই সময়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন (এনএসএফ) নামে একটি ছাত্রসংগঠন গঠিত হয়। আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থায় আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের দাবিতে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলন নস্যাৎ করার লক্ষ্যেই এই সংগঠনের জন্ম। এনএসএফ-এর ক্যাডাররা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে দেশের প্রধান শিক্ষাঙ্গন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। সন্ত্রাসের রাজনীতির প্রথম শিকার হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনএসএফ-এর সন্ত্রাসী ক্যাডার সাইদুর রহমান ওরফে পাঁচ পাত্তুর। ১৯৬৮ সালে সে নিহত হয়। এর আগে এধরনের হত্যাকান্ড ঘটে ১৯৪২ সালে। ওই সময়ে এক সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রনেতা নাজির আহমদ নিহত হন। একই সময়ে আমেরিকার শিক্ষাঙ্গনে সহিংস ঘটনার রেকর্ডের সঙ্গে তুলনা করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২ বছরের ইতিহাসে দুটি খুনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, আমেরিকার অধিকাংশ শিক্ষাঙ্গনের চেয়ে এদেশের  শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ ভাল ছিল।

কিন্তু ১৯৭৩ সালের পর দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। পাকিস্তানি শাসনের অবসান এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ছাত্রকর্মীদের প্রত্যাবর্তনের পর নতুন করে ছাত্রদের মধ্যে রাজনৈতিক ও আদর্শগত মেরুকরণের ফলে শিক্ষাঙ্গন দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও সহিংসতার ক্ষেত্রে পরিণত হয়। মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী সংগঠন ছাত্রলীগ যুদ্ধপরবর্তী আদর্শ ও স্বার্থ-দ্বন্দ্বে জড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসিন হলে সংঘটিত হয় সাত জন ছাত্র হত্যার মতো নারকীয় ঘটনা। এর পর থেকে শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতার রাজনীতি চলতে থাকে অবাধ গতিতে। জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা এমনি ভয়াবহ রূপ নেয় যে, তা বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯৯৩ সালে নিউইয়র্ক টাইমস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘বিশ্বের সর্বাধিক সংঘাতপূর্ণ  শিক্ষাঙ্গন’ বলে চিহ্নিত করে। ‘তিন দশকব্যাপী শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা’ শিরোনামে দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত (৪ মে ২০০১) একটি জরিপে দেখা গেছে যে, ১৯৭৪ সাল থেকে তিন দশকে শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতায় খুন হয়েছে ১২৮ জন, মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে ৪২৯০ জন। নিহতদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭২, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে  ২৫, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ জন। উল্লেখযোগ্য সবগুলো ছাত্রসংগঠন ভয়াবহ এই সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে ছাত্রলীগ। বিগত ৩০ বছরে এই সংগঠনের ৭৫ জন সদস্য সহিংসতার বলি হয়েছে। শিক্ষাঙ্গনে ভয়াবহ সহিংসতার কারণ হচ্ছে উপদলীয় কোন্দল, বিরোধী ছাত্রসংগঠন ও উপদলকে হঠানোর উদ্যোগ, আধিপত্য বিস্তারের জন্য  আবাসিক হল দখল, টেন্ডার ব্যবসা, ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি।

সব বড় রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তিগতভাবে  অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাই সশস্ত্র ক্যাডার পোষে এবং এদের যোগান দেয়া হয় ছাত্রসংগঠন ও উপদল থেকে। এধরনের সশস্ত্র ক্যাডারদের অভিভাবক বা ‘গডফাদার’ রয়েছে। প্রশাসনে গডফাদারদের ক্ষমতা ও প্রভাব থাকায় ক্যাডারদের আইনের  আওতায় আনা সম্ভব হয় না। কাজেই এদের শাস্তি দেয়ার জন্য বিভিন্ন সময়ে সরকার অনেক আইন পাস করলেও কোন সরকারই শিক্ষাঙ্গনে শান্তি পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয় নি।

১৯৭৪ সাল থেকে শিক্ষাঙ্গনে খুন, জখম ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সহিংসতা চরম রূপ ধারণ করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে  ছাত্রীদের উপর হামলা শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ধর্ষণ, সম্ভ্রমহানি, অপহরণ, উত্যক্ত করা এবং  জোরপূর্বক বিয়ে করা এখন শিক্ষাঙ্গন সহিংসতার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে বলপূর্বক আবাসিক হল দখল, আবাসিক হলে বসবাসকারী বিরোধী ছাত্রদের হল থেকে বিতাড়িত করা, সাধারণ আবাসিক ছাত্রদের তাদের কক্ষে ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের নিয়ে সহাবস্থানে বাধ্য করা এবং দলীয় মিছিল ও আন্দোলনে অংশগ্রহণে তাদের বাধ্য করার মতো সহিংস তৎপরতা।

শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা সহিংসতার পরিকল্পনা করলেও সাধারণত তা বাস্তবায়িত হয় সশস্ত্র ক্যাডারদের মাধ্যমে। এরা লুকিয়ে বা অনেক সময় প্রকাশ্যে ঘরে তৈরি বোমা, পটকা, চাকু, ছোরা ও আগ্নেয়াস্ত্র বহন করে। ক্যাডাররা সবাই ছাত্র নয়। এদের অধিকাংশই স্কুল থেকে ঝরে-পড়া, বস্তিবাসী ও ভাঙা সংসারের কিশোর যুবক। অর্থের বিনিময়ে এদের এ কাজে নিয়োগ করা হয়। এদের আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার এবং বোমা তৈরি ও লক্ষ্যবস্ত্ততে তা নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ছাত্রসংগঠনের মধ্যে শুধু যে রাজনৈতিক বিশ্বাস ও চর্চার পার্থক্য রয়েছে এমনটি নয়, শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা সৃষ্টির ক্ষেত্রেও এদের মধ্যে ভিন্নতা আছে বলে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কোনো দল লক্ষ্যবস্ত্তর উপর বোমা নিক্ষেপে অভ্যস্ত, কোনো দলের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা বেশি, আবার কোনো কোনো দল প্রতিপক্ষের অঙ্গচ্ছেদ করে পঙ্গু করার কাজে তৎপর। শিক্ষাঙ্গনে দীর্ঘমেয়াদী সহিংস প্রবণতায় দেখা গেছে যে, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন দাপটের সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে; প্রধান বিরোধী ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা বোমা নিক্ষেপের পথ বেছে নেয় এবং আদর্শগতভাবে চিহ্নিত একটি তৃতীয় দল একদিকে পুলিশ ও বিরোধী পক্ষকে কাবু করার জন্য অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার এবং অন্যদিকে ছুরি ও ছোরা দিয়ে প্রতিপক্ষের হাত-পায়ের রগ কেটে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।

শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতার পদ্ধতি ও ধরনে মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে। বিশ শতকের সত্তরের দশক এবং আশির দশকের প্রথমদিকে সহিংসতার ধরন ছিল ওই সময়ের রাজনৈতিক ও  আদর্শগত চরিত্রের। আশির দশকের শেষে এই সহিংসতা মুক্তিপণের জন্য অপহরণ, বলপূর্বক চাঁদা আদায়, অস্ত্রের মুখে প্রশাসনকে প্রভাবিত করা, ধর্ষণ, আবাসিক হল দখল, টেন্ডার ব্যবসা প্রভৃতি ধরনের সাধারণ অপরাধের পর্যায়ে নেমে আসে। নববইয়ের দশকে এ জাতীয় সহিংসতা স্থায়ী রূপ পরিগ্রহ করে। এ অবস্থা সৃষ্টির একটি নিশ্চিত কারণ হলো সুষ্ঠ প্রশাসনের অভাব। পত্রিকার রিপোর্ট মতে, শিক্ষাঙ্গনে সর্বাধিক সহিংস শক্তি হলো ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বের প্রশ্রয়ে লালিত ছাত্রদের দল ও উপদল। নির্বাচনের বিধান থাকা সত্ত্বেও শিক্ষাঙ্গনের প্রধান নির্বাহী নিয়োগ করা হয় ক্ষমতাসীন দলের সমর্থন ও আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিদের। একারণে তারা শাসকগোষ্ঠীর ক্যাডারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন না। শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাঙ্গন ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও পরোক্ষভাবে সহিংসতা জড়িত।  [সিরাজুল ইসলাম]