শাহ ইসমাইল গাজী (রঃ)


শাহ ইসমাইল গাজী (রঃ)  বারবক শাহের আমলের (১৪৫৯-১৪৭৪ খ্রি) একজন দরবেশ যোদ্ধা। একটি ফারসি পান্ডুলিপি ও বাংলার বিভিন্ন স্থানে প্রচলিত লোককাহিনীগুলির মাধ্যমে শাহ ইসমাইল গাজীর আধ্যাত্মিক গৌরবময় কীর্তি জানা যায়।  রিসালাত-উস-শুহাদা নামক এই ফারসি পান্ডুলিপি ১০৪২ হিজরি/১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে পীর মুহম্মদ সত্তরী রচনা করেন। এতে বাংলায় শাহ ইসমাইল গাজীর জীবনী ও কার্যাবলির বিবরণ রয়েছে। শাহ ইসমাইল গাজী ছিলেন রসুল (সঃ)-এর বংশধর এবং তিনি মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। সেখানেই তিনি বড় হন এবং শিক্ষক ও ধর্মপ্রচারক হন। জীবনের এক পর্যায়ে এসে তিনি শহীদ হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন। তাঁর কয়েকজন শিষ্যকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রাচ্যের উদ্দেশে যাত্রা করেন এবং শেষ পর্যন্ত লখনৌতি পৌঁছেন। তখন প্রতিবছর বাংলার রাজধানী বন্যায় প্লাবিত হতো। সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহ বন্যা নিয়ন্ত্রণের উপায় বের করার জন্য তাঁর সব প্রকৌশলী ও কারিগরকে নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। শাহ ইসমাইল গাজী সুলতানকে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী চুটিয়া-পুটিয়া বিলের উপর একটি সেতু নির্মাণের পরামর্শ দেন এবং শহরটিকে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করেন। দরবেশ তখন সুলতানের অনুগ্রহ লাভ করেন এবং সুলতান দরবেশকে বিভিন্ন সীমান্তে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োগ করেন। এভাবে দরবেশের জিহাদে অংশগ্রহণ ও শাহাদাত লাভের উদ্দেশ্য সফল হয়।

শাহ ইসমাইল গাজীকে প্রথমে বাংলার দক্ষিণ সীমান্তে উড়িষ্যার রাজা গজপতির আগ্রাসী পরিকল্পনার মোকাবিলা করার জন্য নিযুক্ত করা হয়। তিনি গজপতিকে পরাজিত করে তাঁর কাছ থেকে সীমান্ত-ফাঁড়ি মান্দারণ দখল করে নেন। সফল এই সেনানায়ককে এরপর কামরূপের রাজা কামেশ্বরের বিরুদ্ধে পাঠানো হয়। কামেশ্বর পরাজিত হয়ে সুলতানকে করদানে বাধ্য হন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই ঘোড়াঘাট সীমান্ত-ফাঁড়ির সেনাপতি ভান্দসী রায় ইসমাইলের জনপ্রিয়তা ও খ্যাতিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে, ইসমাইল গাজী কামরূপের রাজার সহযোগিতায় নিজের জন্য একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার চিন্তা করছেন এই মর্মে সুলতানের কাছে মিথ্যা অভিযোগ প্রেরণ করেন। রাগান্বিত হয়ে সুলতান দরবেশের শিরশ্ছেদের আদেশ দান করেন।

রিসালাত-উস-শুহাদার ভাষ্যানুযায়ী ৮৭৮ হিজরি/১৪৭৪ খ্রিস্টাব্দে শাহ ইসমাইল গাজীকে হত্যা করা হয়। কিন্তু আবদুল লতীফের ভ্রমণ বৃত্তান্ত অনুসারে তিনি আরও কিছুদিন বেঁচে ছিলেন এবং সুলতান শামসুদ্দীন মুজাফফর শাহের রাজত্বকালে (১৪৯০-১৪৯৩ খ্রি) মৃত্যুবরণ করেন। ইসলাম খান চিশতির দলের সঙ্গে আবদুল লতীফ বাংলায় এসেছিলেন এবং ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ঘোড়াঘাটে এসেছিলেন। ঘোড়াঘাটে শাহ ইসমাইল গাজীর মাযার সম্পর্কেও তিনি বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন। রিসালাত-উস-শুহাদা রচিত হওয়ার প্রায় সিকি শতক আগে তিনি তাঁর রোজনামচা লিখেছিলেন। কাজেই সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহের আদেশে শাহ ইসমাইল গাজীর শিরচ্ছেদ করা হয়েছিল এই বিবরণ সঠিক হতে পারে না। অনুরূপভাবে শাহ ইসমাইল গাজী বাংলার সুলতানের প্রতি বিশ্বসঘাতকতা করেছিলেন এরূপ ধারণাও সঠিক নয়।

লোককাহিনী অনুসারে শিরচ্ছেদের পর শাহ ইসমাইলের মাথা রংপুরের কান্তদুয়ারে এবং দেহ হুগলি জেলার মান্দারণে সমাধিস্থ করা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে দরবেশের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত ছয়টি দরগাহ রয়েছে। এগুলির একটি মান্দারণে, একটি ঘোড়াঘাটে এবং চারটি রংপুর জেলার পীরগঞ্জে অবস্থিত, যার মধ্যে কান্তদুয়ারের দরগাহটিই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। [আবদুল করিম]

গ্রন্থপঞ্জি Shamsuddin Ahmed, Inscriptions of Bengal, IV, Rajshahi, 1960; Muhammad Enamul Haq, A History of Sufism in Bengal, Dhaka, 1975; Abdul Karim, Social History of the Muslims in Bengal, (2nd ed), Chittagong, 1985; Abdul Latif’s Diary, Journal of the Institute of Bangladesh Studies, XIII, 1990.