শাকুর, আবদুশ: সংশোধিত সংস্করণের মধ্যে পার্থক্য

("'''শহীদ, আনোয়ার উল আলম''' (১৯৪৭-২০২০) ষাটের দশকের ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বিখ্যাত কাদেরিয়া বাহিনীর বেসামরিক প্রধান, জাতীয় রক্ষীবাহিনীর উপপ্রধান, সাবেক রাষ্ট্রদূত..." দিয়ে পাতা তৈরি)
 
সম্পাদনা সারাংশ নেই
 
১ নং লাইন: ১ নং লাইন:
'''শহীদ, আনোয়ার উল আলম''' (১৯৪৭-২০২০ষাটের দশকের ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বিখ্যাত কাদেরিয়া বাহিনীর বেসামরিক প্রধান, জাতীয় রক্ষীবাহিনীর উপপ্রধান, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও লেখক। ডাকনাম- শহীদ। পুরো নাম আনোয়ার উল আলম শহীদ। তিনি ১৯৪৭ সালে টাঙ্গাইল জেলা শহরের থানাপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী উপজেলার ইছাপুর গ্রামে। তাঁর পিতার নাম মৌলবী আব্দুর রাহীম ইছাপুরী এবং মাতার নাম মোছাম্মৎ ইদন্নেছা রাহীম। আনোয়ার উল আলম শহীদ ১৯৬৪ সালে টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী হাইস্কুল থেকে এস.এস.সি পাস করেন। ১৯৬৬ সালে করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে এইচ.এস.সি এবং ১৯৬৮ সালে একই কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন। তিনি ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৬৭ সালে টাঙ্গাইল মহকুমা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৯-৭০ ও ১৯৭০-৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এসময় তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্য ছিলেন।
[[Image:ShakurAbdush.jpg|right|thumbnail|200px|আবদুশ শাকুর]]
'''শাকুর, আবদুশ''' (১৯৪১-২০১৩কথাসাহিত্যিক, গল্পকার ও উপন্যাসিক। তিনি ছিলেন সংগীত বিশেষজ্ঞ, রবীন্দ্র গবেষক নিসর্গ লেখক। পড়াশোনা করেন বিবিধ বিষয় এবং নানান ভাষায়। আবদুশ শাকুর নোয়াখালী জেলার সুধারাম থানার রামেশ্বরপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৪১ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মকবুল আহমাদ এবং মাতার নাম ফায়জুন্নিসা। পারিবারিক রীতি অনুযায়ী আরবি-ফার্সি-উর্দু এবং কোরান-হাদিসের শিক্ষা দিয়ে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। তিনি ঢাকা আলিয়া মাদরাসা থেকে আলিম, ফাজিল এবং কামিল ডিগ্রি অর্জন করেন। মাদরাসার প্রধান মুফতি আমীমুল এহসান তাঁর অসামান্য প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ ‘মুম্তাযুল্ মুহাদ্দেসীন’ সনদ প্রদান করেন। পিতার ইচ্ছায় মাদরাসায় পড়াশুনা করলেও তিনি ১৯৫৬ সালে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক এবং ১৯৬০ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচ.এস.সি পাশ করেন। তিনি ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বি.এ (সম্মান) এবং ১৯৬৪ সালে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। এছাড়াও তিনি ১৯৮০ সালে হল্যান্ডের আই.এস.এস থেকে উন্নয়ন অর্থনীতিতে এম.এস ডিগ্রি অর্জন করেন। আবদুশ শাকুর ঢাকার শাহীন স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ঢাকা কলেজ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনা করেন। তিনি সি.এস.পি (সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৬৭ সালে সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেন। বাংলাদেশ সরকারের সচিব পদে উন্নীত হয়ে ১৯৯৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন।


বিন্দুবাসিনী হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় আনোয়ার উল আলম শহীদ ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। তিনি ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত বাঙালির মুক্তির সনদ ‘আমাদের বাঁচার দাবী’ ৬ দফার আন্দোলন, ছাত্র সমাজের ১১ দফার আন্দোলন ও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি কাদেরিয়া বাহিনীর বেসামরিক প্রধান হিসেবে টাঙ্গাইলের মুক্ত এলাকায়  প্রশাসন পরিচালনা করেন। এসময় তিনি ‘রণদূত’ ছদ্মনামে কাদেরিয়া বাহিনীর মুখপত্র ‘রণাঙ্গন’ সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ১৯৭২ সালে তিনি জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনীতে যোগদান করেন এবং পরবর্তীকালে জাতীয় রক্ষীবাহিনীর উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ) নিযুক্ত হন।
ব্যক্তিগত জীবনে আবদুশ শাকুর মামাত বোন লায়লার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই কন্যা ও দুই পুত্র সন্তান রয়েছে। চার সন্তানই উচ্চ-শিক্ষিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত। তাঁর প্রথম সন্তান শাকিলা কানাডার টরেন্টো, দ্বিতীয় সন্তান শামীমা যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া এবং কনিষ্ঠ সন্তান ইমতিয়াজ ডালাসের বাসিন্দা। তৃতীয় সন্তান ইশতিয়াক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট।


১৯৭৫ সালের অক্টোবর মাসে জাতীয় রক্ষীবাহিনীকে সেনাবাহিনীতে একত্রিকরণ করা হলে আনোয়ার উল আলম শহীদ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদায় সেনাসদরে জেনারেল স্টাফ অফিসার গ্রেড-১ হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ১৯৭৮ সালে তাঁকে কর্নেল পদে পদোন্নতি দেয়া হয় এবং একই বছর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক নিযুক্ত করা হয়। তিনি ১৯৮১ সালে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে কাউন্সিলর হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। ১৯৯১ সালে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক নিযুক্ত হন। ১৯৯৪ সালে কানাডার অটোয়ায় বাংলাদেশ হাই কমিশনে ডেপুটি হাই কমিশনার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি বাহরাইনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পান। ২০০১ সালে তাঁকে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয় এবং অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়। ২০০৩ সালে তিনি স্পেনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন এবং এসময় তিনি জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থায় বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালে অবসর গ্রহণের মাধ্যমে তাঁর কূটনৈতিক জীবনের অবসান ঘটে।
আবদুশ শাকুরের লেখালেখি শুরু উর্দুতে। দিল্লী থেকে প্রকাশিত ‘বিসভী সদী’ সাহিত্যপত্রিকায় উর্দু কবিদের ‘মিষ্টি-উইট’ পত্রাবলি পাঠে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন তরুণ শাকুর। তাঁর প্রথম গল্প ‘সাহিত্যিক’ প্রকাশিত হয় শহীদ কাদরীর সম্পাদিত ‘শতদল’ শতগল্প সংকলনের দ্বিতীয় খণ্ডের। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজিতে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রাবস্থায় নির্বাচিত দশটি গল্প নিয়ে প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ক্ষীয়মাণ’ প্রকাশিত হয়। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘ক্রাইসিস’। পরবর্তীতে ‘ক্রাইসিস’ নামে একটি উপন্যাস লেখায় ‘ক্রাইসিস’ গল্পটির নাম পরিবর্তন করে ‘এপিটাফ’ রাখেন। এরপর একে একে লেখেন ‘ধস’, ‘বিচলিত প্রার্থনা’, ‘আঘাত’ (২০০৬), ‘শারীর’ (২০১১), ‘ঘোর’ (২০১৩) গল্পগ্রন্থ। ২০০২ সালে ‘গল্পগ্রন্থ সমগ্র’ প্রকাশিত হয়। গল্পকার হিসেবে খ্যাতিমান আবদুশ শাকুর ‘সংলাপ’ (২০০৭), ‘ক্রাইসিস’ (২০১০), ‘উত্তর-দক্ষিণ সংলাপ’(২০১০), ‘ভালোবাসা’ (২০১১) শিরোনামে উপন্যাস রচনা করেন। রম্যলেখক হিসেবেও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দী। সত্তরের দশকে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ‘আবদুশ শাকুরের কড়চা’ ও ব্যক্তিগত রম্যরচনা নিয়মিত প্রকাশিত হত। সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক নানা বৈষম্য ছিল তাঁর রম্য রচনার বিষয়। তাঁর রচিত ‘চুয়াত্তরের কড়চা’, ‘আবদুশ শাকুরের কড়চা’ ও ‘মধ্যবিত্তের কড়চা’ রম্য সাহিত্যের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আবদুল্লাহ আবু সাইয়িদ সম্পাদিত ‘আবদুশ শাকুর: সেরা রম্য রচনা’ (১৯৯৬) গ্রন্থটি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র থেকে চিরায়ত গ্রন্থ সিরিজের বই হিসেবে প্রকাশিত হয়। তাঁর সমগ্র রম্যরচনার বই-এর নাম ‘রম্যসমগ্র’ (২০০৩)। এছাড়াও ‘ভেজাল বাঙালি’ (২০০৯), ‘নির্বাচিত রম্যরচনা’ (২০১০) ও ‘নির্বাচিত কড়চা’ (২০১০) নামে রম্যসংকলন এবং ‘রসিক বাঙালি’ (২০০৯) নামে রম্যলেখকদের সম্পর্কে লেখা একটি প্রবন্ধের বই রচনা করেন। সম্পাদিত গ্রন্থগুলো হলোÑ ‘বাংলা সাহিত্যে নির্বাচিত রমণীয় রচনা’ (দুই খণ্ড, ২০০৩), ‘বাংলা সাহিত্যের নির্বাচিত রম্যরচনা ও গল্প’ (দুই খণ্ড, ১৯৯০), ‘পরশুরামের সেরা হাসির গল্প’ (১৯৮৯), ‘আসহাব উদ্দীন আহমদ: সেরা রম্যরচনা’ (১৯৯৮), ‘ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়: সেরা রম্যগল্প’ (২০০৪), ‘নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়: সেরা রম্যরচনা’ (২০০৬), ‘সৈয়দ মুজতবা আলী: শ্রেষ্ঠগল্প’ (২০০৬), ‘সৈয়দ মুজতবা আলী: শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ’ (২০০৬), ‘পরশুরামের শ্রেষ্ঠগল্প’ (২০০৭), ‘শিবরাম চক্রবর্তীর শ্রেষ্ঠগল্প’ (২০০৯),‘শিবরাম চক্রবর্তী ও মজার গল্প’ (২০০৯), ‘বাংলা সাহিত্যের সেরা রম্যরচনা’ (২০১০) ও ‘হাস্যশিল্পী সুকুমার রায়’ (২০০৯)।


আনোয়ার উল আলম শহীদ খেলাধুলা সাহিত্যকর্মে উৎসাহী ছিলেন। তিনি ১৯৬১ সালে সিলেটের মুরারী চাঁদ কলেজ মাঠে, ১৯৬২ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক স্কাউট জাম্বুরিতে এবং ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান দলের সদস্য হয়ে গ্রিসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্কাউট জাম্বুরিতে অংশ নেন। বিন্দুবাসিনী হাইস্কুলে অধ্যয়নকালে ‘মুকুল’, করটিয়া সা’দত কলেজে অধ্যয়নকালে পাক্ষিক ‘আয়না’, ‘সূর্য্যের গান’ প্রভৃতি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেন। তিনি একজন সুলেখক ছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে ‘গ্রীস ঘুরে এলাম’ (১৯৬৪), ‘একাত্তর আমার শ্রেষ্ঠ সময়’ (২০০৯), ‘রক্ষীবাহিনীর সত্যি-মিথ্যা’ (২০১৪), ‘আজীবন সংগ্রামী মৌলবী আব্দুর রাহীম ইছাপুরী’ (২০১৪) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তিনি টাঙ্গাইলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ‘শহীদ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা করেন। আনোয়ার উল আলম শহীদ ২০২০ সালের ১০ই ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ডা. সাঈদা খান। এ দম্পতির সাঈদ আনোয়ার রিশাদ নামে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী) ১ পুত্র ও সারা র‌্যামোনা আনোয়ার নামে (সুইডেন প্রবাসী) ১ কন্যা সন্তান রয়েছে।  [শফিউদ্দিন তালুকদার]
পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথের লেখা সৃষ্টিতে তিনি নিমগ্ন হয়েছিলেন। ‘মহামহিম রবীন্দ্রনাথ’(১৯৯৭) এবং ‘চির নতুন রবীন্দ্রনাথ’ বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হবার পর কথাসাহিত্যিক ও রম্যলেখক পরিচিতির পাশাপাশি রবীন্দ্রপ্রেমী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এর পর ‘পরম্পরাহীন রবীন্দ্রনাথ’ (২০০৯),‘মহাগদ্যকবি রবীন্দ্রনাথ’ (২০১২),‘রবীন্দ্রনাথ:স্বদেশভাবনা’, ‘রবীন্দ্রনাথকে যতটুকু জানি’ (২০১২) ‘রবীন্দ্রনাথ মানুষই ছিলেন’(২০১২)- এসব গ্রন্থে আবদুশ শাকুরের রবীন্দ্র ভাবনার গভীরতা পাঠক সমাজকে বিষ্মিত করে। ‘মহামহিম রবীন্দ্রনাথ’(২০১১), ‘রবীন্দ্রনাথকে যতটুকু জানি’ এবং ‘রবীন্দ্রনাথ মানুষই ছিলেন’ গ্রন্থগুলো পশ্চিমবঙ্গে প্রকাশিত হবার পর পশ্চিমবঙ্গেও পাঠক সমাজে সেগুলো সমাদৃত হয়। তবে, রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ হলো বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ড ‘রবীন্দ্রজীবনী’। প্রথম দুটো খ- তিনি লিখে যেতে পেরেছিলেন। তৃতীয় খণ্ডে কাজও অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। এটি অসমাপ্ত রয়ে যায়। আবদুশ শাকুর বেশকিছু মননশীল গদ্য রচনা করেছিলেন। গদ্যগ্রন্থগুলো হলো ‘ভাষা ও সাহিত্য’ (২০০৮), ‘সমাজ ও সমাজবিজ্ঞান’ (২০০৮), ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ (২০১০), ‘আবদুশ শাকুরের শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ’ (২০১১)


'''তথ্যসূত্র''' আনোয়ার উল আলম শহীদ, ''একাত্তর আমার শ্রেষ্ঠ সময়'', (ঢাকা : সাহিত্য প্রকাশ, ২০০৯); শফিউদ্দিন তালুকদার, ''একাত্তরের বয়ান'' তৃতীয় খণ্ড, (ঢাকা : কথাপ্রকাশ, ২০১৬); জুলফিকার হায়দার সবুজ মাহমুদ (সম্পা.), ''চতুর্মাসিক যমুনা'', মার্চ-জুলাই, ২০১৫।
আবদুশ শাকুরের পরিবারে সংগীত চর্চার প্রচলন ছিল। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সংগীত চর্চা করতেন। রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল সংগীত, দ্বিজেন্দ্রগীতি, রজনীকান্ত সেনের গান, অতুল প্রসাদ সেনের গান, ভজন, কীর্তন, গজল, পুরাতনী বাংলা গান প্রভৃতি বিভিন্ন ধারার সংগীত তিনি চর্চা করেন। ২০০৪ সালে সাউন্ডটেক অডিও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁর রবীন্দ্র সংগীতের একটি এবং দ্বিজেন্দ্র লাল রায়, রজনীকান্ত সেনের গান, অতুল প্রসাদ সেন ও কাজী নজরুল ইসলামের গান নিয়ে মোট দুটি সিডি প্রকাশিত হয়। আবদুশ শাকুরের সংগীত বিষয়ক গবেষণা, আলোচনা ও চিন্তা ‘সংগীত সংগীত’ (২০০৫), ‘সংগীত সংবিৎ’, ‘মহান শ্রোতা’ (২০০৬), ‘সংগীত বিচিত্রা’ (২০০৯), ‘বাঙালির মুক্তির গান’ (২০০৭), ‘সাংগীতিক সাক্ষরতা’(২০১২), ‘শ্রোতার কৈফিয়ত’, ‘স্বর সুর শব্দ সংগীত’ (২০১২), ‘হিন্দুস্থানীয় যন্¿সংগীতের পঞ্চপ্রদীপ’ গ্রন্থগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে।


[[en:Shaheed, Anwar Ul Alam]]
আবদুশ শাকুর নিসর্গপ্রেমিক ছিলেন। গোলাপ নিয়ে তাঁর অনুরাগ সর্বজনবিদিত। তিনি নিজ হাতে তাঁর বাসার ছাদে বিভিন্ন জাতের অসংখ্য গোলাপের চাষ করেন। তিনি ছিলেন ‘ফ্লোরিকালচারিস্ট’। বাংলাদেশ জাতীয় গোলাপ সমিতি তাকে ‘বেস্ট লন রোজ গার্ডেন’ ক্যাটাগরিতে স্বর্ণপদক (১৯৮৮) প্রদান করেন। তাঁর রচিত ‘গোলাপসংগ্রহ’ (২০০৪) বইটি ‘প্রথম আলো বর্ষ সেরা মননশীল বই’ হিসেবে পুরস্কৃত হয়। এই বইটি পরিবর্ধিত ও পুনর্বিন্যস্ত সংস্করণে কলকাতার প্রতিভাস প্রকাশনি থেকে ‘গোলাপনামা’ (২০১২) শিরোনামে প্রকাশিত হয়। নিয়মিত লিখতেন কলকাতার ‘সৃষ্টির একুশ শতক’ ও ‘মিলেমিশে’ নামের মাসিক পত্রে। তাঁর রচিত তিন খ-ে লিখিত আত্মজীবনীর নাম ‘আত্মকথনে আবদুশ শাকুর: কাঁটাতে গোলাপও থাকে’ (২০০৮)। তাঁর সৃষ্টির বিচিত্র ধারায় ‘আক্কেলগুড়–ম’ নামে একটি শিশু সাহিত্যর বই এবং ‘টোটকা ও ঝামেলা’ নামে একটি প্রহসনের বই লিখেছিলেন।
 
আবদুশ শাকুর ১৯৭৯ সালে ছোটগল্পের জন্য ‘বাংলা আ্যাকাডেমি আ্যাওয়ার্ড’ পান। গল্পসমগ্রর জন্য জলপাইগুড়ি থেকে ২০০৩ সালে ‘অমিয়ভূষণ পুরস্কার’ লাভ করেন। ‘আবদুশ শাকুরের রচনাবলী’ (১ম খণ্ড) ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে কিন্তু দ্বিতীয় খণ্ড আর প্রকাশিত হয়নি। আবদুশ শাকুর অর্ধশতাব্দির অধিককাল নিরন্তর লিখে গেছেন। মৃত্যুর পূর্বে শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত তিনি সৃষ্টিশীল ছিলেন। ২০০১ সালে স্ত্রী লায়লার প্রয়াণের পর থেকে তিনি ধানমন্ডির নিজের বাড়িতে জীবনযাপন করতেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বরেণ্য কথাসাহিত্যিক আবদুশ শাকুর ২০১৩ সালের ১৫ই জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।  [শাহনাজ নাসরীন ইলা]
 
[[en:Shakur, Abdush]]

১৮:১৪, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে সম্পাদিত সর্বশেষ সংস্করণ

আবদুশ শাকুর

শাকুর, আবদুশ (১৯৪১-২০১৩) কথাসাহিত্যিক, গল্পকার ও উপন্যাসিক। তিনি ছিলেন সংগীত বিশেষজ্ঞ, রবীন্দ্র গবেষক ও নিসর্গ লেখক। পড়াশোনা করেন বিবিধ বিষয় এবং নানান ভাষায়। আবদুশ শাকুর নোয়াখালী জেলার সুধারাম থানার রামেশ্বরপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৪১ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মকবুল আহমাদ এবং মাতার নাম ফায়জুন্নিসা। পারিবারিক রীতি অনুযায়ী আরবি-ফার্সি-উর্দু এবং কোরান-হাদিসের শিক্ষা দিয়ে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। তিনি ঢাকা আলিয়া মাদরাসা থেকে আলিম, ফাজিল এবং কামিল ডিগ্রি অর্জন করেন। মাদরাসার প্রধান মুফতি আমীমুল এহসান তাঁর অসামান্য প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ ‘মুম্তাযুল্ মুহাদ্দেসীন’ সনদ প্রদান করেন। পিতার ইচ্ছায় মাদরাসায় পড়াশুনা করলেও তিনি ১৯৫৬ সালে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক এবং ১৯৬০ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচ.এস.সি পাশ করেন। তিনি ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বি.এ (সম্মান) এবং ১৯৬৪ সালে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। এছাড়াও তিনি ১৯৮০ সালে হল্যান্ডের আই.এস.এস থেকে উন্নয়ন অর্থনীতিতে এম.এস ডিগ্রি অর্জন করেন। আবদুশ শাকুর ঢাকার শাহীন স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ঢাকা কলেজ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনা করেন। তিনি সি.এস.পি (সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৬৭ সালে সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেন। বাংলাদেশ সরকারের সচিব পদে উন্নীত হয়ে ১৯৯৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে আবদুশ শাকুর মামাত বোন লায়লার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই কন্যা ও দুই পুত্র সন্তান রয়েছে। চার সন্তানই উচ্চ-শিক্ষিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত। তাঁর প্রথম সন্তান শাকিলা কানাডার টরেন্টো, দ্বিতীয় সন্তান শামীমা যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া এবং কনিষ্ঠ সন্তান ইমতিয়াজ ডালাসের বাসিন্দা। তৃতীয় সন্তান ইশতিয়াক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট।

আবদুশ শাকুরের লেখালেখি শুরু উর্দুতে। দিল্লী থেকে প্রকাশিত ‘বিসভী সদী’ সাহিত্যপত্রিকায় উর্দু কবিদের ‘মিষ্টি-উইট’ পত্রাবলি পাঠে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন তরুণ শাকুর। তাঁর প্রথম গল্প ‘সাহিত্যিক’ প্রকাশিত হয় শহীদ কাদরীর সম্পাদিত ‘শতদল’ শতগল্প সংকলনের দ্বিতীয় খণ্ডের। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজিতে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রাবস্থায় নির্বাচিত দশটি গল্প নিয়ে প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ক্ষীয়মাণ’ প্রকাশিত হয়। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘ক্রাইসিস’। পরবর্তীতে ‘ক্রাইসিস’ নামে একটি উপন্যাস লেখায় ‘ক্রাইসিস’ গল্পটির নাম পরিবর্তন করে ‘এপিটাফ’ রাখেন। এরপর একে একে লেখেন ‘ধস’, ‘বিচলিত প্রার্থনা’, ‘আঘাত’ (২০০৬), ‘শারীর’ (২০১১), ‘ঘোর’ (২০১৩) গল্পগ্রন্থ। ২০০২ সালে ‘গল্পগ্রন্থ সমগ্র’ প্রকাশিত হয়। গল্পকার হিসেবে খ্যাতিমান আবদুশ শাকুর ‘সংলাপ’ (২০০৭), ‘ক্রাইসিস’ (২০১০), ‘উত্তর-দক্ষিণ সংলাপ’(২০১০), ‘ভালোবাসা’ (২০১১) শিরোনামে উপন্যাস রচনা করেন। রম্যলেখক হিসেবেও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দী। সত্তরের দশকে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ‘আবদুশ শাকুরের কড়চা’ ও ব্যক্তিগত রম্যরচনা নিয়মিত প্রকাশিত হত। সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক নানা বৈষম্য ছিল তাঁর রম্য রচনার বিষয়। তাঁর রচিত ‘চুয়াত্তরের কড়চা’, ‘আবদুশ শাকুরের কড়চা’ ও ‘মধ্যবিত্তের কড়চা’ রম্য সাহিত্যের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আবদুল্লাহ আবু সাইয়িদ সম্পাদিত ‘আবদুশ শাকুর: সেরা রম্য রচনা’ (১৯৯৬) গ্রন্থটি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র থেকে চিরায়ত গ্রন্থ সিরিজের বই হিসেবে প্রকাশিত হয়। তাঁর সমগ্র রম্যরচনার বই-এর নাম ‘রম্যসমগ্র’ (২০০৩)। এছাড়াও ‘ভেজাল বাঙালি’ (২০০৯), ‘নির্বাচিত রম্যরচনা’ (২০১০) ও ‘নির্বাচিত কড়চা’ (২০১০) নামে রম্যসংকলন এবং ‘রসিক বাঙালি’ (২০০৯) নামে রম্যলেখকদের সম্পর্কে লেখা একটি প্রবন্ধের বই রচনা করেন। সম্পাদিত গ্রন্থগুলো হলোÑ ‘বাংলা সাহিত্যে নির্বাচিত রমণীয় রচনা’ (দুই খণ্ড, ২০০৩), ‘বাংলা সাহিত্যের নির্বাচিত রম্যরচনা ও গল্প’ (দুই খণ্ড, ১৯৯০), ‘পরশুরামের সেরা হাসির গল্প’ (১৯৮৯), ‘আসহাব উদ্দীন আহমদ: সেরা রম্যরচনা’ (১৯৯৮), ‘ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়: সেরা রম্যগল্প’ (২০০৪), ‘নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়: সেরা রম্যরচনা’ (২০০৬), ‘সৈয়দ মুজতবা আলী: শ্রেষ্ঠগল্প’ (২০০৬), ‘সৈয়দ মুজতবা আলী: শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ’ (২০০৬), ‘পরশুরামের শ্রেষ্ঠগল্প’ (২০০৭), ‘শিবরাম চক্রবর্তীর শ্রেষ্ঠগল্প’ (২০০৯),‘শিবরাম চক্রবর্তী ও মজার গল্প’ (২০০৯), ‘বাংলা সাহিত্যের সেরা রম্যরচনা’ (২০১০) ও ‘হাস্যশিল্পী সুকুমার রায়’ (২০০৯)।

পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথের লেখা ও সৃষ্টিতে তিনি নিমগ্ন হয়েছিলেন। ‘মহামহিম রবীন্দ্রনাথ’(১৯৯৭) এবং ‘চির নতুন রবীন্দ্রনাথ’ বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হবার পর কথাসাহিত্যিক ও রম্যলেখক পরিচিতির পাশাপাশি রবীন্দ্রপ্রেমী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এর পর ‘পরম্পরাহীন রবীন্দ্রনাথ’ (২০০৯),‘মহাগদ্যকবি রবীন্দ্রনাথ’ (২০১২),‘রবীন্দ্রনাথ:স্বদেশভাবনা’, ‘রবীন্দ্রনাথকে যতটুকু জানি’ (২০১২) ‘রবীন্দ্রনাথ মানুষই ছিলেন’(২০১২)- এসব গ্রন্থে আবদুশ শাকুরের রবীন্দ্র ভাবনার গভীরতা পাঠক সমাজকে বিষ্মিত করে। ‘মহামহিম রবীন্দ্রনাথ’(২০১১), ‘রবীন্দ্রনাথকে যতটুকু জানি’ এবং ‘রবীন্দ্রনাথ মানুষই ছিলেন’ গ্রন্থগুলো পশ্চিমবঙ্গে প্রকাশিত হবার পর পশ্চিমবঙ্গেও পাঠক সমাজে সেগুলো সমাদৃত হয়। তবে, রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ হলো বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ড ‘রবীন্দ্রজীবনী’। প্রথম দুটো খ- তিনি লিখে যেতে পেরেছিলেন। তৃতীয় খণ্ডে কাজও অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। এটি অসমাপ্ত রয়ে যায়। আবদুশ শাকুর বেশকিছু মননশীল গদ্য রচনা করেছিলেন। গদ্যগ্রন্থগুলো হলো ‘ভাষা ও সাহিত্য’ (২০০৮), ‘সমাজ ও সমাজবিজ্ঞান’ (২০০৮), ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ (২০১০), ‘আবদুশ শাকুরের শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ’ (২০১১)।

আবদুশ শাকুরের পরিবারে সংগীত চর্চার প্রচলন ছিল। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সংগীত চর্চা করতেন। রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল সংগীত, দ্বিজেন্দ্রগীতি, রজনীকান্ত সেনের গান, অতুল প্রসাদ সেনের গান, ভজন, কীর্তন, গজল, পুরাতনী বাংলা গান প্রভৃতি বিভিন্ন ধারার সংগীত তিনি চর্চা করেন। ২০০৪ সালে সাউন্ডটেক অডিও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁর রবীন্দ্র সংগীতের একটি এবং দ্বিজেন্দ্র লাল রায়, রজনীকান্ত সেনের গান, অতুল প্রসাদ সেন ও কাজী নজরুল ইসলামের গান নিয়ে মোট দুটি সিডি প্রকাশিত হয়। আবদুশ শাকুরের সংগীত বিষয়ক গবেষণা, আলোচনা ও চিন্তা ‘সংগীত সংগীত’ (২০০৫), ‘সংগীত সংবিৎ’, ‘মহান শ্রোতা’ (২০০৬), ‘সংগীত বিচিত্রা’ (২০০৯), ‘বাঙালির মুক্তির গান’ (২০০৭), ‘সাংগীতিক সাক্ষরতা’(২০১২), ‘শ্রোতার কৈফিয়ত’, ‘স্বর সুর শব্দ ও সংগীত’ (২০১২), ‘হিন্দুস্থানীয় যন্¿সংগীতের পঞ্চপ্রদীপ’ গ্রন্থগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে।

আবদুশ শাকুর নিসর্গপ্রেমিক ছিলেন। গোলাপ নিয়ে তাঁর অনুরাগ সর্বজনবিদিত। তিনি নিজ হাতে তাঁর বাসার ছাদে বিভিন্ন জাতের অসংখ্য গোলাপের চাষ করেন। তিনি ছিলেন ‘ফ্লোরিকালচারিস্ট’। বাংলাদেশ জাতীয় গোলাপ সমিতি তাকে ‘বেস্ট লন রোজ গার্ডেন’ ক্যাটাগরিতে স্বর্ণপদক (১৯৮৮) প্রদান করেন। তাঁর রচিত ‘গোলাপসংগ্রহ’ (২০০৪) বইটি ‘প্রথম আলো বর্ষ সেরা মননশীল বই’ হিসেবে পুরস্কৃত হয়। এই বইটি পরিবর্ধিত ও পুনর্বিন্যস্ত সংস্করণে কলকাতার প্রতিভাস প্রকাশনি থেকে ‘গোলাপনামা’ (২০১২) শিরোনামে প্রকাশিত হয়। নিয়মিত লিখতেন কলকাতার ‘সৃষ্টির একুশ শতক’ ও ‘মিলেমিশে’ নামের মাসিক পত্রে। তাঁর রচিত তিন খ-ে লিখিত আত্মজীবনীর নাম ‘আত্মকথনে আবদুশ শাকুর: কাঁটাতে গোলাপও থাকে’ (২০০৮)। তাঁর সৃষ্টির বিচিত্র ধারায় ‘আক্কেলগুড়–ম’ নামে একটি শিশু সাহিত্যর বই এবং ‘টোটকা ও ঝামেলা’ নামে একটি প্রহসনের বই লিখেছিলেন।

আবদুশ শাকুর ১৯৭৯ সালে ছোটগল্পের জন্য ‘বাংলা আ্যাকাডেমি আ্যাওয়ার্ড’ পান। গল্পসমগ্রর জন্য জলপাইগুড়ি থেকে ২০০৩ সালে ‘অমিয়ভূষণ পুরস্কার’ লাভ করেন। ‘আবদুশ শাকুরের রচনাবলী’ (১ম খণ্ড) ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে কিন্তু দ্বিতীয় খণ্ড আর প্রকাশিত হয়নি। আবদুশ শাকুর অর্ধশতাব্দির অধিককাল নিরন্তর লিখে গেছেন। মৃত্যুর পূর্বে শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত তিনি সৃষ্টিশীল ছিলেন। ২০০১ সালে স্ত্রী লায়লার প্রয়াণের পর থেকে তিনি ধানমন্ডির নিজের বাড়িতে জীবনযাপন করতেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বরেণ্য কথাসাহিত্যিক আবদুশ শাকুর ২০১৩ সালের ১৫ই জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। [শাহনাজ নাসরীন ইলা]