শব্দ দূষণ


শব্দ দূষণ  মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মানবসৃষ্ট উচ্চ শব্দ। এক্ষেত্রে পরিবহণ যানবাহনগুলির রয়েছে সবচেয়ে মারাত্মক অনিষ্টকারী ভূমিকা। বিমান, রেলগাড়ি, ট্রাক, বাস ও অন্যান্য মটরগাড়ি, মটর সাইকেল সবই মাত্রাতিরিক্ত উচ্চ শব্দ সৃষ্টি করে। শব্দের তীব্রতা পরিমাপের একক ডেসিবেল (ডিবি)। শব্দের মাত্রা ৪৫ ডিবি হলেই সাধারণত মানুষ ঘুমাতে পারে না। ৮৫ ডিবিতে শ্রবণ শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে এবং মাত্রা ১২০ ডিবি হলে কানে ব্যথা শুরু হয়।

শব্দ দূষণ বাংলাদেশে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে একটি প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়। প্রকৃতপক্ষে শব্দ দূষণের কারণে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ বধিরতা থেকে শুরু করে হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়া পর্যন্ত বেশ কিছু মারাত্মক রোগের শিকার হচ্ছে। শব্দ দূষণ ঘটছে মূলত যানবাহনে ব্যবহূত হাইড্রোলিক ভেঁপু অথবা মাইক্রোফোন অথবা শ্রুতি বাদন যন্ত্র (ক্যাসেট পে­য়ার) দ্বারা। বাস, ট্রাক এবং স্কুটারে ব্যবহূত হাইড্রোলিক ভেঁপু শহরের জনপূর্ণ সড়কে চলমান নারী-পুরুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়। ঢাকা শহরের শব্দ দূষণ এভাবেই প্রতি মুহূর্তে হাজার হাজার শিশুর শ্রবণ ক্ষমতাকে ধ্বংস করছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যদি তিন বছরের কম বয়স্ক শিশু কাছাকাছি দূরত্ব থেকে ১০০ ডিবি মাত্রার শব্দ শোনে, তাহলে সে তার শ্রবণ ক্ষমতা হারাতে পারে। শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অন্যান্য উপাদানগুলো হলো বেতার, টেলিভিশন, ক্যাসেট পে­য়ার ও মাইক্রোফোনের উচ্চ শব্দ; কলকারখানার শব্দ এবং উচ্চ মাত্রার চিৎকার, হৈচৈ, গোলমাল। শব্দ স্পন্দনের একক হল হার্টজ। মানুষ সাধারণত ১৫ থেকে ২০ কিলোহার্টজ (কেএইচজেড) স্পন্দনের শব্দ শোনে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতানুসারে, সাধারণত ৬০ ডিবি শব্দ একজন মানুষকে সাময়িকভাবে বধির করে ফেলতে পারে এবং ১০০ ডিবি শব্দ সম্পূর্ণ বধিরতা সৃষ্টি করতে পারে। সেক্ষেত্রে হিসাব করে দেখা গেছে যে, ঢাকা শহরের যেকোন ব্যস্ত সড়কে সৃষ্ট শব্দের মাত্রা ৬০ থেকে ৮০ ডিবি, যানবাহনের শব্দ মিলে তা ৯৫ ডিবিতে দাঁড়ায়; লাউড স্পিকারের সৃষ্ট শব্দ ৯০ থেকে ১০০ ডিবি, কল কারখানায় ৮০ থেকে ৯০ ডিবি, রেস্তোরাঁ এবং সিনেমা হলে ৭৫ থেকে ৯০ ডিবি, মেলা-উৎসবে ৮৫ থেকে ৯০ ডিবি, স্কুটার বা মটরসাইকেলের ৮৭ থেকে ৯২ ডিবি এবং ট্রাক-বাসের সৃষ্ট শব্দ ৯২ থেকে ৯৪ ডিবি। কিন্তু শব্দের বাঞ্ছনীয় মাত্রা হলো: শয়নকক্ষে ২৫ ডিবি, বসবার ও খাবার ঘরে ৪০ ডিবি, কার্যালয়ে ৩৫-৪০ ডিবি, শ্রেণীকক্ষে ৩০-৪০ ডিবি, গ্রন্থাগারে ৩৫-৪০ ডিবি, হাসপাতালে ২০-৩৫ ডিবি, রেস্তোরাঁয় ৪০-৬০ ডিবি এবং রাত্রিকালে শহর এলাকায় ৪৫ ডিবি। যখন শব্দ এই সীমা অতিক্রম করে তখনই শব্দ দূষণ ঘটে। সীমার বাইরের শব্দ দূষণ শ্রবণ ক্ষমতা ধ্বংস করে, যা কারো মানসিক ভারসাম্যকেও বিনষ্ট করতে পারে। শব্দ দূষণ খিটখিটে মেজাজ সৃষ্টিরও কারণ, এছাড়া এর দ্বারা ফুসফুস আক্রান্ত হয়, শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বাধাগ্রস্ত হয় এবং তাদের লেখাপড়ায় উদাসীন করে তোলে।

বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিপ অনুসারে দেখা যায় উচ্চ শব্দ জনসাধারণের মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতার কারণ। এটি উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ  হূদস্পন্দন, মাথ্যাব্যথা, বদহজম ও পেপটিক আলসার সৃষ্টির কারণ, এমনকি গভীর ঘুমকেও ব্যাহত করছে। যেকোন ব্যক্তি যেকোন স্থানে আধঘণ্টা বা তার অধিক সময় ধরে ঘটা ১০০ ডিবি বা তার অধিক শব্দ দূষণের ফলে বধির হয়ে যেতে পারে। উচ্চমাত্রার শব্দের কর্ম পরিবেশে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করলে যেকোন ব্যক্তির সম্পূর্ণ বধিরতা দেখা দিতে পারে। যেকোন ধরনের শব্দ দূষণ গর্ভবতী মায়ের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দেখা গেছে বড় বিমান বন্দরের সন্নিকটে বসবাসকারী গর্ভবতী মায়েরা অন্যান্য স্থানে অবস্থানকারী মায়েদের তুলনায় অধিক সংখ্যক পঙ্গু, বিকৃত এবং অপরিণত শিশু জন্ম  দিয়ে থাকেন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিপ অনুসারে বাংলাদেশের জন্য যথার্থ শব্দমাত্রা শান্ত এলাকায় দিবাভাগে ৪৫ ডিবি ও রাত্রিকালে ৩৫ ডিবি, আবাসিক এলাকায় দিবাভাগে ৫০ ডিবি ও রাত্রিকালে ৪০ ডিবি, মিশ্র এলাকায় (আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা) দিবাভাগে ৬০ ডিবি ও রাত্রিকালে ৫০ ডিবি, বাণিজ্যিক এলাকায় দিবাভাগে ৭০ ডিবি ও রাত্রিকালে ৬০ ডিবি এবং শিল্প এলাকায় দিবাভাগে ৭৫ ডিবি ও রাত্রিকালে ৭০ ডিবি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অপর একটি জরিপে দেখা যায় ঢাকা শহরের বিভিন্ন অংশে শব্দ দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। জরিপে চিহ্নিত করা হয়েছে দিবাভাগে শাহীন স্কুল এলাকায় এ মাত্রা ৮৩ ডিবি ও রাত্রিকালে ৭৪ ডিবি, মতিঝিল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে দিবাভাগে ৮৩ ডিবি ও রাত্রিকালে ৭৯ ডিবি, ধানমন্ডি সরকারি বালক বিদ্যালয়ে দিবাভাগে ৮০ ডিবি ও রাত্রিকালে ৭৫ ডিবি, আজিমপুর মহিলা কলেজে দিবাভাগে ৮০ ডিবি ও রাত্রিকালে ৭৪ ডিবি, তেজগাঁও মহিলা কলেজে দিবাভাগে ৭৫ ডিবি ও রাত্রিকালে ৬৭ ডিবি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে দিবাভাগে ৮২ ডিবি ও রাত্রিকালে ৭৪ ডিবি, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দিবাভাগে ৮০ ডিবি ও রাত্রিকালে ৬৯ ডিবি, মিটফোর্ড হাসপাতালে দিবাভাগে ৭৫ ডিবি ও রাত্রিকালে ৭৩ ডিবি এবং শিশু হাসপাতালে দিবাভাগে ৭২ ডিবি ও রাত্রিকালে ৬৯ ডিবি।  [সিফাতুল কাদের চৌধুরী]

আরও দেখুন পরিবেশ